অফিস চলবে সকাল নয়টা থেকে চারটা, মার্কেট বন্ধ সন্ধ্যা ছয়টায়
বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপটে অফিসের সময়সূচিতে পরিবর্তন আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী অফিস চলবে সকাল নয়টা থেকে বিকেলে চারটা পর্যন্ত। বর্তমানে সকাল নয়টা থেকে বিকেলে পাঁচটা পর্যন্ত অফিস চালু থাকে। এছাড়া দেশের সব দোকানপাট, বাণিজ্য বিতান ও শপিং মল সন্ধ্যা ছয়টার মধ্যে বন্ধ থাকবে।
গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে মন্ত্রিসভার বৈঠকে এসব সিদ্ধান্ত হয়। রাত পৌনে ৯টায় জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ কক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার বৈঠক শুরু হয়। রাত প্রায় পৌনে ১১টা পর্যন্ত প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে চলে এই বৈঠক। পরে সেখানে ব্রিফিংয়ে বৈঠকের সিদ্ধান্ত জানান মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি।
এদিকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিষয়ে আগামী রোববার সিদ্ধান্ত নেয়া হবে বলেও জানান নাসিমুল গনি। তিনি জানান, স্কুল-কলেজে অনেকেই ব্যক্তিগত গাড়িকে যাতায়াত করে থাকে। সরকার এটি নিরুৎসাহিত করার জন্য বিনা শুল্কে বিদ্যুৎচালিত বাস আমদানির অনুমতি দেয়া হবে। তবে বেসরকারিভাবে ব্যবসায়ীরা বিদ্যুৎচালিত বাস আমদানি করতে চাইলে তাদের ২০ শতাংশ শুল্ক দিতে হবে। এছাড়া বিয়ে ও সামাজিক অনুষ্ঠানে কোনো রকম আলোজসজ্জা করা যাবে না। ব্যাংক চলবে সকাল ৯টা থেকে দুপুর তিনটা পর্যন্ত। এছাড়া সরকারি খরচে কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে। আপাতত জলযান, আকাশযান ও কম্পিউটার সরকারি খরচে কেনাকাটা করা যাবে না।
জ্বালানি সংকট এখন নেই বলেও জানান মন্ত্রিপরিষদ সচিব। তবে সংকট যাতে না হয় সেজন্য সরকার বিভিন্ন দেশ থেকে তেল আমদানির চেষ্টা করছে। দেশে ৮০ ভাগ জ্বালানি তেল মধ্যপ্রাচ্য থেকে সংগ্রহ করা হয়। তবে বিকল্প ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে বলে জানান নাসিমুল গনি।
এর আগে সকালে দেশের সব দোকানপাট, বাণিজ্য বিতান ও শপিং মল রাত ৮টার মধ্যে বন্ধ করার ঘোষণা দিয়েছিল বাংলাদেশ দোকান মালিক ব্যবসায়ী সমিতি। মন্ত্রিসভায় তা কমিয়ে সন্ধ্যা ৬টা করা হয়েছে। তবে হোটেল, ফার্মেসি ও জরুরি প্রয়োজনীয় সেবার দোকান, কাঁচাবাজার এর আওতাবহির্ভূত থাকবে।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানান, বৈঠকটি বিশেষ পরিস্থিতিতে সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী দীর্ঘ ১৮ ঘণ্টা কাজ করেছেন এবং যাতায়াতের সময় বাঁচাতে ও যানজট এড়াতে এখানেই বৈঠকের আয়োজন করা হয়েছে।
অফিস ও ব্যাংকের নতুন সময়সূচি : আগামী কার্যদিবস থেকে সকল সরকারি ও বেসরকারি অফিস সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত চলবে। অর্থাৎ অফিসের সময় ১ ঘণ্টা কমিয়ে আনা হয়েছে। এছাড়া ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো চলবে সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত, তবে আনুষঙ্গিক কাজ শেষ করতে বিকেল ৪টায় ব্যাংক বন্ধ হবে।
বাজার ও বিপণিবিতান : জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে সন্ধ্যা ৬টার পর দেশের সকল মার্কেট, দোকানপাট ও শপিংমল বন্ধ রাখতে হবে। তবে কাঁচাবাজার, ওষুধের দোকান এবং খাবারের দোকানের মতো জরুরি সেবাগুলো এই নির্দেশনার আওতামুক্ত থাকবে। এটি কঠোরভাবে মনিটর করবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও পরিবহন : শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় পৃথক নির্দেশনা দেবে, যা আগামী রোববার থেকে কার্যকর হতে পারে। এছাড়া স্কুলগামী শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার কমাতে এবং যানজট নিরসনে শুল্কমুক্ত সুবিধায় ‘ইলেকট্রিক বাস’ আমদানির সিদ্ধান্ত হয়েছে। যে সব স্কুল এই উদ্যোগে অংশ নেবে তারা বিশেষ সুবিধা পাবে। বাণিজ্যিক ক্ষেত্রেও নতুন ইলেকট্রিক বাস আমদানিতে শুল্ক কমিয়ে ২০ শতাংশ করা হয়েছে। তবে কোনো পুরনো বাস আনা যাবে না।
ব্যয় সংকোচন ও কৃচ্ছ্রসাধন : সরকারের জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাস খাতের বাজেট থেকে ৩০ শতাংশ ব্যয় কমানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আগামী তিন মাস পর্যন্ত সরকারি কোনো নতুন গাড়ি (সড়ক, নৌ বা আকাশযান) এবং কম্পিউটার সামগ্রী কেনা যাবে না। এছাড়া সরকারি কর্মকর্তাদের সকল বিদেশ ভ্রমণ এবং অভ্যন্তরীণ প্রশিক্ষণের ৫০ শতাংশ বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। সভা-সেমিনারের আপ্যায়ন খরচও ৫০ শতাংশ কমানো হয়েছে।
আলোকসজ্জায় নিষেধাজ্ঞা : জ্বালানি সংকটের এই সময়ে কোনো ধরনের বেসরকারি বিয়ে বা উৎসব-অনুষ্ঠানে আলোকসজ্জা করা যাবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব।
আইন সংশোধন : বৈঠকে ‘পাবলিক এক্সামিনেশন অফেন্সেস অ্যামেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট’ এর খসড়া অনুমোদিত হয়েছে। ১৯৮০ সালের এই আইনটি সংশোধন করে পাবলিক পরীক্ষায় অপরাধের বিচার আরও কঠোর করার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
জ্বালানি সরবরাহ : মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে তেলের সরবরাহ লাইন কিছুটা ইনসিকিউর হয়ে পড়ায় সরকার বিকল্প উৎসের সন্ধান করছে। ইতোমধ্যে মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া এবং কাজাখস্তান থেকে তেল আমদানির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে সচিব জানান।
তিনি আরও বলেন, সরকার সাধারণ মানুষের কষ্ট লাঘবে জ্বালানি খাতে ভর্তুকি অব্যাহত রাখছে এবং এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/163528