দ্বিতীয় যমুনা সেতু বগুড়া-জামালপুর নৌরুটেই চায় বগুড়াবাসী

দ্বিতীয় যমুনা সেতু বগুড়া-জামালপুর নৌরুটেই চায় বগুড়াবাসী

সারিয়াকান্দি (বগুড়া) প্রতিনিধি: সম্প্রতি যমুনা সেতুর উপর চাপ কমাতে দ্বিতীয় যমুনা সেতুর চিন্তা করছে সেতু মন্ত্রণালয়। সেতু মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে দ্বিতীয় যমুনা সেতুটি বগুড়া-জামালপুর নৌরুটেই চায় বগুড়া এবং জামালপুরবাসী।

সেতুটি বাস্তবায়ন হলে এ এলাকাবাসীর শতবছরের আশা আকাক্সক্ষার প্রতিফলন হবে, বগুড়া থেকে ময়মনসিংহের দূরত্ব কমবে প্রায় ৮০ কিলোমিটার, ব্যবসা বাণিজ্যের প্রসার হবে, কৃষক তাদের উৎপাদিত কৃষিফসলের ন্যায্য মূল্য পাবে এবং যাত্রীদের অর্থ এ সময় দুটোই সাশ্রয় হবে।

সম্প্রতি সেতু বিভাগ এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে একটি উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৈঠকে ৩ টি মেগা প্রকল্পের তথ্য পাওয়া গেছে। সেতু বিভাগের মাস্টার প্লান অনুযায়ী ২০৩২ সালের মধ্যে পাটুরিয়া-দৌলদিয়া নৌরুটে ৪.৯ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের দ্বিতীয় পদ্মা সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে।

এছাড়া যমুনা সেতুর উপর চাপ কমাতে ২০৩৩ সালের মধ্যে যমুনা নদীর উপর দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মাণের পরিকল্পনাও করা হয়েছে।

এ লক্ষ্যে বর্তমানে ৩ টি সম্ভাব্য রুটের উপর সমীক্ষা চলছে। এগুলো হলো বগুড়া থেকে জামালপুর করিডোর, গাইবান্ধার বালাসী ঘাট থেকে জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ ঘাট অথবা অন্য কোনও উপযুক্ত রুট। সেতুটির চূড়ান্ত স্থান নির্ধারণের পর এর দৈর্ঘ্য এবং নির্মাণ ব্যায় প্রাক্কলন করা হবে।

সারিয়াকান্দি উপজেলার যমুনা নদীর ওপর সেতু নির্মিত হলে উত্তরের মানুষের সঙ্গে আবার বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলার যোগাযোগ নিরবচ্ছিন্ন হবে। কৃষিপণ্যের দ্রুত সরবরাহ, ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার এবং ঢাকার সড়ক-মহাসড়কে যানজট কমবে। তাই সেতু নির্মাণের পরিকল্পনার খবর পেয়ে দুই পাড়ের বাসিন্দারা আনন্দিত।

সারিয়াকান্দি এলাকাবাসীর সূত্রে জানা গেছে, ১৯১২ সালে ব্রিটিশ শাসনামলে জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জের বাহাদুরাবাদ রেলঘাট চালু হয়। পরে ১৯৩৮ সালে তিস্তামুখ থেকে জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জের বাহাদুরাবাদ রেলঘাট পর্যন্ত নৌপথে ফেরি চলাচল শুরু হয়। এই নৌপথে রংপুর, দিনাজপুর, রাজশাহী ও বগুড়া জেলার বাসিন্দারা বাহাদুরাবাদ স্টেশন থেকে ট্রেনে ঢাকা, চট্টগ্রাম এবং বৃহত্তর ময়মনসিংহের জামালপুর, শেরপুর, নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জ যাতায়াত করতেন।

পরে সত্তর দশকেও সারিয়াকান্দি থেকে জামালপুর নৌরুটে ফেরি সার্ভিস চলমান ছিল। তখন এ নৌপথেই উত্তরবঙ্গের লোকজন বৃহত্তর ময়মনসিংহ বিভাগে চলাচল করতেন। সময়ের পরিক্রমায়, ৮৮ সালের বন্যায় এবং যমুনা নদীর ভাঙনে যমুনা তার গতিপথ পরিবর্তন করে। ফলে এ নৌরুট থেকে ফেরি সার্ভিস প্রত্যাহার করে তা গাইবান্ধার বালাসি ঘাটে স্থানান্তর করা হয়।

এরপর থেকেই বগুড়া সারিয়াকান্দির কালিতলা নৌঘাট থেকে জামালপুরের মাদারগঞ্জ নৌরুটে নৌকা দিয়েই যাত্রীরা চলাচল করতে শুরু করেন। বর্তমানেও এ নৌপথে প্রতিদিন হাজারো যাত্রী চলাচল করছেন। প্রতিদিন তারা নানা ধরণের সমস্যার সম্মুখীন হয়ে যাতায়াত করছেন।

এতে তাদের একদিকে সময় অপচয় হচ্ছে এবং অপরদিকে অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে যাতায়াত করতে হচ্ছে। অপরদিকে কেউ বিকল্প পথে বাসযোগে সিরাজগঞ্জ হয়ে ১৮৩ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে ময়মনসিংহ যাতায়াত করছেন। এদিকে সারিয়াকান্দি থেকে জামালপুরের দূরত্ব মাত্র ১৬ কিলোমিটার।

এ নৌপথে দ্বিতীয় যমুনা সেতু হলে সড়কপথে বগুড়া থেকে ময়মনসিংহের দূরত্ব কমবে ৮০ কিলোমিটার। বগুড়া থেকে সারিয়াকান্দি হয়ে ময়মনসিংহ শহরের দূরত্ব মাত্র ১০০ কিলোমিটারের কিছু বেশি। তাই এ নৌপথে দ্বিতীয় যমুনা সেতুর দাবি এলাকাবাসীর দীর্ঘদিনের। এ নৌরুটে গত সরকারের সময় ধুমধাম করে সি ট্রাক সার্ভিস চালু করলেও তা পরে নাব্যতা সংকটের কারণে সরিয়ে নেয়া হয়েছে।

এদিকে গত ২০২২ সালের মার্চ মাসে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের ১৯ সদস্যের জরিপ দল সারিয়াকান্দির কালিতলা ঘাট থেকে জামালপুরের মাদারগঞ্জের জামথল ঘাট পর্যন্ত যমুনা নদীতে সেতু নির্মাণের জন্য ট্রাফিক সার্ভে শেষ করেছে।

এই জরিপে মূলত সারিয়াকান্দির কালিতলা নৌ ঘাট থেকে নৌকাযোগে যমুনা পারাপারে যানবাহন বিশেষ করে মোটরসাইকেল চালকদের কাছে সেতু নির্মাণের গুরুত্ব, নদী পারাপারে টোল হার, সময় ও খরচ নিয়ে প্রশ্নের উত্তর জানতে চাওয়া হয়।

সেতু নির্মাণ হলে টোল হার নিয়েও তখন প্রশ্ন রাখা হয়েছে স্থানীয় লোকজনের কাছে। ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী বগুড়ার তানভীর হাসান বলেন, বগুড়া থেকে সারিয়াকান্দি হয়ে ময়মনসিংহ বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়া আমার জন্য খুবই কষ্টকর ছিল।

আমার একমাত্র প্রতিবন্ধকতা ছিল মাঝখানের যমুনা নদী। যে নদীটি নৌকায় পার হতে আমি নানা ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হয়েছি। তবে নদী পার হতে পারলে সিএনজি যোগেই ময়মনসিংহ শহরে যাওয়া যায়। অপরদিকে সিরাজগঞ্জ হয়ে বাসযোগে ময়মনসিংহ যেতে সময় এবং অর্থ দুটোই বেশি খরচ হয়।

সারিয়াকান্দি উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমান বলেন, সেতুটি বাস্তবায়ন হলে বগুড়ার সাথে ময়মনসিংহ বিভাগের একটি মেলবন্ধন সৃষ্টি হবে। তাছাড়া কৃষকরা তাদের কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য পাবে, ব্যবসা বাণিজ্যের প্রসার হবে, এলাকাবাসীর ভাড়া এবং সময় সাশ্রয় হবে, যমুনা নদীর নানা ধরনের দুর্ঘটনা থেকে রেহাই পাবে।

সারিয়াকান্দি পৌর বিএনপির সভাপতি শাহাদাৎ হোসেন সনি বলেন, আমাদের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে বগুড়াবাসীর আকুল আবেদন দ্বিতীয় যমুনা সেতু যেনো আমাদের বগুড়াতেই হয়। এটা আমাদের এ অঞ্চলের মানুষের শতশত বছরের প্রত্যাশা। এটি বাস্তবায়ন হলে আমরা সিএনজিতেই ময়মনসিংহ বিভাগে যেতে পারবো।

জামালপুর-৫ সদর আসনের জাতীয় সংসদ সদস্য এড. শাহ মো: ওয়ারেছ আলী মামুন বলেন, জামালপুর এবং বগুড়ার মধ্যে সরাসরি সংযোগ এলাকাবাসী দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা। এ প্রত্যাশা পূর্ণ হলে উত্তরবঙ্গের সাথে ময়মনসিংহ বিভাগের সংযোগ স্থাপন হবে এবং মানুষের দুর্ভোগ লাঘব হবে। এ বিষয়ে আমি জাতীয় সংসদে কথা বলার চেষ্টা করবো।

এ বিষয়ে বগুড়া-১ আসনের জাতীয় সংসদ সদস্য আলহাজ কাজী রফিকুল ইসলাম বলেন, সেতুটি বাস্তবায়ন হলে লাখো মানুষের সময় সাশ্রয় হবে, অর্থের সাশ্রয় হবে, ব্যবসা বাণিজ্যের প্রসার হবে এবং কৃষকদের ভাগ্যের উন্নয়ন হবে। সেতুটি বাস্তবায়ন করতে আমি সেতু মন্ত্রণালয়ের সাথে সার্বক্ষনিক যোগাযোগ রক্ষা করবো এবং এ বিষয়ে আমি জাতীয় সংসদে কথা বলবো।

সেতু বিভাগ, সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ আব্দুর রউফ বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে যমুনা সেতুর উপর চাপ কমাতে মন্ত্রণালয় দ্বিতীয় যমুনা সেতুর পরিকল্পনায় কাজ শুরু করেছে। ইতিমধ্যেই এ বিষয়ে সেতু জরিপের কাজ চলমান রয়েছে।

তাদের রিপোর্ট অনুযায়ী স্থান নির্ধারণ করা হবে। জরিপের রিপোর্টের ভিত্তিতে জনগুরুত্বপূর্ণ এলাকায়, যেদিক দিয়ে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর চলাচলের সুবিধা হবে এক্ষেত্রে সেই রুটকেই বেছে নেয়া হবে। তবে বগুড়া এবং জামালপুরের মধ্যে সেতু নির্মাণের পরিকল্পনাও আমাদের রয়েছে।

পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/163016