বগুড়া শহরের যানজট নিরসনে সমন্বিত উদ্যোগের সময় এখনই

বগুড়া শহরের যানজট নিরসনে সমন্বিত উদ্যোগের সময় এখনই

বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শহর বগুড়া আজ এক গভীর নগর সমস্যার মুখোমুখি-যানজট। একসময় যেখানে বগুড়া ছিল তুলনামূলকভাবে স্বস্তির শহর, সেখানে এখন প্রতিদিনের নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠেছে দীর্ঘ যানজট, ভোগান্তি এবং সময়ের অপচয়। শহরের অর্থনৈতিক কর্মকান্ড, শিক্ষা ব্যবস্থা, স্বাস্থ্যসেবা এমনকি নাগরিক জীবনের স্বাভাবিক ছন্দকেও এটি মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন সুপরিকল্পিত, বাস্তবসম্মত এবং সমন্বিত পদক্ষেপ। প্রথমেই বলতে হয়, বগুড়া শহরের সড়ক অবকাঠামো বর্তমান যানবাহনের চাপের তুলনায় অনেকাংশেই অপর্যাপ্ত। শহরের প্রধান সড়কগুলো যেমন সাতমাথা, নবাববাড়ি সড়ক, জলেশ্বরীতলা, বনানী প্রতিনিয়ত অতিরিক্ত যানবাহনের চাপে নাজুক অবস্থায় রয়েছে। সড়ক সম্প্রসারণ, বিকল্প বাইপাস সড়ক নির্মাণ এবং গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে ফ্লাইওভার বা আন্ডারপাস নির্মাণ এখন সময়ের দাবি। বিশেষ করে শহরের কেন্দ্রস্থল সাতমাথায় যানবাহনের চাপ কমাতে পরিকল্পিত ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত জরুরি। দ্বিতীয়ত, অবৈধ পার্কিং এবং ফুটপাত দখল যানজটের অন্যতম প্রধান কারণ। শহরের বিভিন্ন এলাকায় সড়কের দুই পাশে এলোমেলোভাবে গাড়ি পার্কিং করা হয়, যার ফলে সড়কের কার্যকর প্রস্থ কমে যায়। একইভাবে ফুটপাত দখল করে দোকান বসানো কিংবা হকারদের দখলে থাকা পথচারীদের সড়কে নামতে বাধ্য করে, যা যানজট বাড়ায়। তাই অবৈধ পার্কিং নিয়ন্ত্রণে কঠোর আইন প্রয়োগ এবং ফুটপাত দখলমুক্ত করা অত্যন্ত জরুরি। এ ক্ষেত্রে পৌর প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন এবং স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন। তৃতীয়ত, গণপরিবহন ব্যবস্থার দুর্বলতা যানজট বৃদ্ধির আরেকটি কারণ। বগুড়ায় এখনো একটি সুসংগঠিত, সময়নির্ভর এবং আধুনিক গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। ফলে মানুষ বাধ্য হয়ে ব্যক্তিগত যানবাহনের দিকে ঝুঁকছে, যা সড়কে যানবাহনের সংখ্যা বাড়াচ্ছে। শহরে নির্দিষ্ট রুটভিত্তিক বাস সার্ভিস চালু করা, বাসস্টপ নির্ধারণ এবং যাত্রী ওঠানামার জন্য নির্দিষ্ট স্থান নির্ধারণ করা হলে যানজট অনেকাংশে কমানো সম্ভব। চতুর্থত, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং নিয়ম না মানার প্রবণতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। ট্রাফিক সিগন্যালের যথাযথ ব্যবহার না থাকা, এবং চালকদের মধ্যে ট্রাফিক আইন সম্পর্কে অনীহা  সব মিলিয়ে একটি বিশৃঙ্খল অবস্থা সৃষ্টি করেছে। আধুনিক ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থা স্থাপন, সিসিটিভি মনিটরিং বৃদ্ধি এবং আইন লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য গণমাধ্যম ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রচার কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। পঞ্চমত, শহরে অটোরিকশা, ইজিবাইক ও রিকশার অনিয়ন্ত্রিত চলাচল যানজটের একটি বড় কারণ। এসব যানবাহনের জন্য নির্দিষ্ট লেন বা রুট নির্ধারণ করা যেতে পারে। লাইসেন্সবিহীন যানবাহন নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে এবং একটি সুশৃঙ্খল নিবন্ধন ব্যবস্থা চালু করতে হবে। এতে করে সড়কে যানবাহনের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হবে। বগুড়া শহরের প্রধান রাস্তা মাটিডালি বিমান মোড় থেকে বনানী সড়কে টাউন সার্ভিস বাস নামানো অতীব জরুরি। বগুড়ার থেকে তুলনামূলক ছোট শহর ফেনী শহরে প্রায় দেড় দশক আগে টাউন সার্ভিস প্রবর্তন করে ফেনী শহরের যানজটকে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করেছে। ফেনী শহরের ন্যায় বগুড়ার প্রধান প্রধান সড়কে টাউন র্সাভিস চালু করলে রিকশার দাপট কমে আসবে,ফলে শহরবাসী কিছুটা হলেও স্বাচ্ছন্দে চলাফেরা করতে পারবে। ষষ্ঠত, শহরের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান যেমন স্কুল-কলেজ, হাসপাতাল এবং মার্কেটগুলোর সামনে যানজট বেশি দেখা যায়। এসব প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব পার্কিং ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং নির্দিষ্ট সময়ে যানবাহনের চাপ নিয়ন্ত্রণে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। স্কুলের সময়সূচি কিছুটা ভিন্ন করা বা পর্যায়ক্রমে ক্লাস শুরুর ব্যবস্থা চালু করলেও যানজট কমানো সম্ভব। সপ্তমত,  দীর্ঘমেয়াদে নগর পরিকল্পনার অভাবও এই সমস্যার মূল কারণ। অপরিকল্পিতভাবে শহরের বিস্তার, সড়কের সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন স্থাপনা এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধি সব মিলিয়ে একটি অচলাবস্থার সৃষ্টি করেছে। তাই একটি সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করে তার বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, পৌর প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট সকল সংস্থার মধ্যে সমন্বয় ছাড়া এটি সম্ভব নয়। অষ্টমত, প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো সময়ের দাবি। স্মার্ট ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম, মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে যানজটের তথ্য প্রদান, ডিজিটাল পার্কিং সিস্টেম এসব উদ্যোগ গ্রহণ করলে পরিস্থিতির উন্নতি ঘটতে পারে। উন্নত শহরগুলোর অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে বগুড়ায় তা প্রয়োগ করা যেতে পারে। সবশেষে, নাগরিকদের সচেতনতা ও অংশগ্রহণ ছাড়া কোনো উদ্যোগই সফল হবে না। ট্রাফিক আইন মেনে চলা, অপ্রয়োজনীয় যানবাহন ব্যবহার কমানো এবং শৃঙ্খলা বজায় রাখা এসব বিষয়ে প্রত্যেক নাগরিককে দায়িত্বশীল হতে হবে। একটি শহরের উন্নয়ন শুধু অবকাঠামোর উপর নির্ভর করে না, বরং তার নাগরিকদের আচরণ ও মানসিকতার উপরও নির্ভরশীল। বগুড়া শহরের যানজট সমস্যা এখন আর শুধুমাত্র একটি নগর সমস্যা নয়, এটি একটি অর্থনৈতিক ও সামাজিক চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। তাই সময়ক্ষেপণ না করে এখনই সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি। পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন এবং সচেতনতার সমন্বয়ে বগুড়াকে আবারও একটি বাসযোগ্য, গতিশীল ও আধুনিক শহরে পরিণত করা সম্ভব যদি আমরা সবাই মিলে উদ্যোগ নেই।

লেখক :

মুহাম্মাদ মাছুদুর রহমান

পিএইচডি গবেষক 
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় 

পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/162816