যাহা বলিব সত্য বলিব
আমরা মির্জা গালিবের নাম অনেকেই জানি, যার আসল নাম মির্জা আসাদুল্লাহ বেগ খান, সংক্ষেপে মির্জা গালিব, অনেকে তাঁকে মির্জা আসাদ নামেও ডাকতেন। মির্জা গালিব ১৭৯৭ সালে ভারতের আগ্রায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন মুঘল দরবারের বিখ্যাত উর্দু ও ফার্সি কবি। তাঁর বিখ্যাত কিছু উক্তি আছে যা শের নামেও পরিচিত। তেমনি তাঁর একটি উক্তি “পৃথিবীতে বেশি মিথ্যা বলা হয় আদালতে, সেটা আবার ধর্মীয় গ্রন্থ ছুয়ে, আর সত্য বলে পানশালায় মদ হাতে।” পৃথিবীর বহু দেশে আদালতে সাক্ষী দেওয়ার সময়ে ধর্মগ্রন্থ ছুঁয়ে সাক্ষী দিতে হয়। আমাদের প্রতিবেশি দেশ ভারতেও আদালতে সাক্ষী দেওয়ার সময়ে ধর্মগ্রন্থ ছুঁয়ে সাক্ষী দিতে হয়। আমাদের দেশে ধর্মগ্রন্থ ছুঁয়ে সাক্ষী দেওয়ার রেওয়াজ না থাকলেও সাক্ষীকে এই মর্মে শপথ পড়ানো হয় যে, “যাহা বলিব সত্য বলিব, সত্য বৈ মিথ্যা বলিব না বা কোন কিছু গোপন করিব না”। মির্জা গালিবের কথায় ফিরে আসি। মানুষ আদালতে শপথ নিয়ে ডাহা মিথ্যা কথা বলে, অথচ মানুষ যখন নেশাগ্রস্থ থাকে তখন নির্বিচারে সত্য কথা বলে। কি অদ্ভুত নিয়ম, যেখানে সত্য কথা বলা দরকার সেখানে মানুষ সত্য কথা না বলে মানুষ মিথ্যার আশ্রয় নেয়। সাক্ষীর মিথ্যা কথা বলার জন্যে অনেক নিরপরাধ লোকের শাস্তি হয়ে যেতে পারে। আইনের স্পিরিট হচ্ছে সাক্ষী প্রমাণ অভাবে হাজারটা দোষী লোক খালাশ হলেও আইনে কিচ্ছু যায় আসে না, কিন্তু একটি নিরপরাধ লোক যেন এক মুহূর্তের জন্যেও জেলখানায় না যায়, সুতরাং একজন বিচারককে কি পরিমাণ সতর্কতার সাথে বিচার করতে হয় তা সহজেই অনুমেয়। আমি ব্যক্তিভাবে অনেক নেশাগ্রস্ত লোককে দেখেছি তাদের মন-মানসিকতা অনেক ভালো, তারা নেশা করতে পারে কিন্তু মানবিক গুনাবলী তাদের মধ্যে অত্যন্ত প্রখর। তবে একথা ঠিক মিথ্যাবাদী লোককে কেও পছন্দ করে না। রাজনীতির ক্ষেত্রেতো কথাই নাই। কিছুদিন পূর্বেও অধিকাংশ মানুষ মনে করতো রাজনীতিবিদরা মিথ্যা কথা বলে, মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে মানুষের কাছ থেকে ভোট নিয়ে পরবর্তী পাঁচ বছর জনগণের ধারে কাছে আসে না। রাজনীতিবিদদের সম্পর্কে মানুষ আগে যেভাবে নেতিবাচক অর্থে দেখতো বর্তমানে কিছুটা হলেও তার পরিবর্তন চোখে পড়ছে। এখন মানুষের ভুল ভাঙ্গতে শুরু করেছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি তাঁদের নির্বাচনী ইস্তেহার দেয় এবং নির্বাচনের তপশীল ঘোষণার অনেক আগেই তাঁরা রাষ্ট্র মেরামতের ৩১ দফার একটি রুপরেখা দেয়। তাঁরা ক্ষমতায় গেলে কি কি করবেন সে সম্পর্কে জনগণের কাছে আগেই তাঁরা তাঁদের কর্মসূচী তুলে ধরেন। অনেক রাজনৈতিক দল ও কতিপয় তথাকথিত বুদ্ধিজীবী নির্বাচনী প্রচারণার সময় বলেন, এটা বিএনপির ভোট নেওয়ার একটি অপকৌশল মাত্র, তাঁরা কোন কিছুই করবে না,তাঁরা শুধু ভাওতা দিয়ে জনগণের ভোট নিয়ে তাঁদের আখের গোছাবে। ১২ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ তারিখে জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়, আর বিএনপি সরকার গঠন করে ১৭ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ তারিখে। বিএনপির নির্বাচনী ইস্তেহারে ছিলো তাঁরা ক্ষমতায় গেলে কৃষকের ১০ হাজার টাকা কৃষিঋণ মওকুফ করবে, দুঃস্থ অসহায়দের ফ্যামিলি কার্ড দিবে, কৃষকদের কৃষি কার্ড দিবে, মসজিদ, মন্দির, গীর্জার প্রধানদের ভাতা দিবে, খাল খনন সহ আরও অনেক জনকল্যাণকর কাজ করবে। বিএনপি সরকার গঠন করার পরপরই তাঁদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কৃষকদের ১০ হাজার টাকা কৃষিঋণ মওকুফ করে দিয়েছেন। ইংরেজীতে একটি কথা আছে মর্নিং শোজ দি ডে অর্থাৎ সকালের সূর্য দেখলে দিন বোঝা যায়। মাত্র ২১ দিনের একটি শিশু সরকার দুঃস্থ অসহায় পরিবারের মাঝে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ করেছেন। ঈদের আগেই সরকার ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের পাইলট স্কীমের আওতায় কতিপয় উপজেলায় ভাতা প্রদান করেছেন। যতদূর জানি এই সরকার ইতিমধ্যেই কৃষিকার্ড কৃষকদের মাঝে বিতরণের জন্যে প্রস্তুত করেছে এবং তা পহেলা বৈশাখে কৃষকদের মাঝে বিলি করবে। ইতিমধ্যেই খাল খনন শুরু হয়েছে। জনগণের সরকার হলে এই কাজগুলো সরকারের সদিচ্ছার উপর নির্ভর করবে। একটা গল্প মনে পড়ে গেল। এক লোক অত্যন্ত ধুমপান করতো, এক সময় ধুমপান করার কারণে তার শারীরিক অনেক সমস্যা দেখা দিলো। লোকটা ডাক্তারের কাছে গেল এবং সমস্ত কিছু খুলে বললো। ডাক্তার সব শুনে বললো ধুমপান ত্যাগ করতে হবে। লোকটি বললো স্যার ধুমপান ত্যাগ করলে আমি বাঁচবো না, ধুমপানের পরিবর্তে আমাকে অলটারনেটিভ কিছু দিতে হবে, অগত্যা ডাক্তার পরামর্শ দিলো আপনি সিগারেটের পরিবর্তে পান খেতে পারেন। লোকটি পান খাওয়ার অভ্যাস করলো, কিছুদিন পর লোকটির রোগ ভালো হয়ে গেল, রোগ ভালো হওয়ার পর লোকটি পুনরায় সিগারেট ধরলো, পানের সঙ্গে জর্দ্দা, শেষে দেখা গেল, পান সিগারেট একসাথে শুরু করলো। সে আবার কঠিন অসুখে পড়লো। পরের বার ডাক্তারের কাছে গিয়ে সব খুলে বললো, ডাক্তার শুনে তার আর কোন চিকিৎসা না দিয়ে লোকটিকে ফিরে দিলো। লোকটি আবার বিমারে পড়লো। বাঁচার আশা ক্ষীণ হয়ে গেলো। লোকটি তখন মনে মনে ভাবলো আরতো বাঁচবো না, মরার আগে না হয় বদঅভ্যাসগুলো বাদ দেই। প্রবল ইচ্ছা শক্তি নিয়ে নেশাগুলো বাদ দিলো, দেখা গেল লোকটি কিছু দিনের মধ্যেই সুস্থ হয়ে উঠলো। প্রবল ইচ্ছে শক্তি মানুষকে অনেক দূর নিয়ে যায়। এই সরকারের প্রবল ইচ্ছে শক্তির কারণেই এই কাজগুলো সহজেই করতে পারছে, আর বিএনপি জনগণের কাছে কথা দিয়েছে, যাহা বলিব সত্য বলিব।
লেখক :
এড. মোঃ মোজাম্মেল হক
আইনজীবী, বগুড়া।
পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/162339