বগুড়ায় ঈদের ছুটিতে বিএনপি কর্মীসহ তিন খুন
স্টাফ রিপোর্টার : বগুড়ায় ঈদের ছুটিতে পৃথক ঘটনায় বিএনপি কর্মীসহ তিনজনকে খুন করা হয়েছে। এরমধ্যে বগুড়া সদরে বিএনপি কর্মী, আদমদিঘী ও সান্তাহারে দুই নারী খুন হন।
গত সোমবার ২৩ মার্চ দিবাগত রাত সোয়া ১২ টার দিকে বগুড়া শহরতলীর ফাঁপোড় খন্দকার পাড়ায় প্রতিপক্ষের ছুরিকাঘাতে আরিফুল ইসলাম মুন্না (৫১) নামের এক বিএনপি কর্মী খুন হন। টাকা লেনদেন সংক্রান্ত মামলা নিয়ে বিরোধের জের ধরে এই খুনের ঘটনা ঘটে। নিহত আরিফুল ইসলাম মুন্না একই এলাকার মৃত ডা. ইয়াছিন আলীর ছেলে এবং ফাঁপোড় ইউনিয়ন বিএনপি’র সক্রিয় কর্মী ছিলেন।
ফাঁপোড় ইউনিয়ন বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদক কামাল হোসেন এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, একই এলাকার আব্দুল আজিজের ছেলে আব্দুল সায়েমের সাথে টাকা লেনদেন সংক্রান্ত মামলা নিয়ে মুন্নার বিরোধ চলছিল। মামলার জের ধরে কিছুদিন আগে মুন্নার বাড়িতে হামলা করে ভাঙচুর করা হয়। সোমবার রাত ১২টার দিকে মুন্না স্থানীয় একটি ক্লাবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান দেখে বাড়ি ফেরার পথে সায়েমের সাথে তার দেখা হয়।
এসময় মুন্নাকে একটি রড হাতে নিয়ে সায়েম ধাওয়া করে। এক পর্যায় দু’জনের মধ্যে ধস্তাধস্তি শুরু হলে সায়েম তার কাছে থাকা ছুরি বের করে মুন্নার পেটে আঘাত করে। পরে তাকে বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসাপাতালে ভর্তি করা হলে রাত ১টার দিকে মুন্না মারা যান।
নিহত মুন্নার স্ত্রী নিলুফা ইয়াসমিন জানান, রাত সাড়ে ১০টার দিকে ছেলের জন্য রুটি কিনতে ফাঁপোর স্কুলের পাশে দোকানে যান মুন্না। সেখান থেকে ফেরার পথে ৫-৬ জন তাকে ঘিরে ধরে ছুরিকাঘাত করে। এসময় মুন্না দৌড়ে বড় ভাই মাহিদুল ইসলাম বাড়িতে গিয়ে ঘটনা জানালে তাকে বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ (শজিমেক) হাসপাতালে ভর্তি করে দিলে রাত ১টার দিকে তিনি মারা যান।
বগুড়া সদর থানার নবাগত ওসি ইব্রাহীম আলী বলেন, খুনের ঘটনার সাথে জড়িত সায়েম ও তার পরিবারের লোকজন ঘটনার পরপরই পালিয়ে গেছে। সায়েমকে ধরতে অভিযান চলছে। ওসি আরো বলেন, একই এলাকার আব্দুল আজিজের ছেলে সায়েমের সাথে টাকা লেনদেন সংক্রান্ত মামলা নিয়ে মুন্নার বিরোধ চলছিল। এই বিরোধের জের ধরে মুন্নাকে খুন করা হয় বলে প্রাথমিক তথ্যে জানা গেছে।
আমাদের আদমদীঘি (বগুড়া) প্রতিনিধি জানান, আদমদীঘিতে মামলা প্রত্যাহার না করায় ক্ষিপ্ত হয়ে আসামি ও তার লোকজন দেশিয় ধারালো অস্ত্র দিয়ে বাদি তার স্বামী-সন্তান ও বোনকে কুপিয়ে জখম এবং বসতবাড়িতে ভাঙচুর করেছে। হামলায় বাদি উম্মে হাফিজার বাড়িতে বেড়াতে আসা তার ছোট বোন উম্মে হাবিবা উর্মিকে (৩৬) ধাওয়া করে কুড়াল দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।
এ ঘটনায় নারীসহ পাঁচজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। গত শুক্রবার ঈদের আগের দিন সন্ধ্যায় আদমদীঘি উপজেলার উজ্জলতা গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় আগের মামলার বাদি উম্মে হাফিজা বাদি হয়ে একই গ্রামের ১৩ জনের বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করলে-একই গ্রামের দেলোয়ার হোসেন ওরফে কহির ফকির, তার স্ত্রী আরজিনা বেগম, দুলালী বেগম, আইয়ুব হোসেন ও এখলাস হোসেনকে পুলিশ গ্রেফতার করে।
পুলিশ ও স্থানীয়রা জানান, উপজেলার উজ্জলতা গ্রামে গত বছরের ২৬ আগস্ট পূর্বশক্রতার জেরে বীর মুক্তিযোদ্ধা মজিবর রহমানের ছেলে ফয়সাল তালুকদার লিটনের ছেলে ফারসিদ তালুকদারকে একই গ্রামের এখলাস হোসেন, সিরাজুল ইসলাম, একরাম ফকির, দুলালী বেগম ও কহির ফকিরসহ কয়েকজন মিলে পথরোধ করে কুপিয়ে হত্যার চেষ্টা করে।
এ ঘটনায় ফারসিদ তালুকদারের মা উম্মে হাফিজা বাদি হয়ে আদমদীঘি থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। পুলিশ মামলাটি তদন্ত করে আদালতে চার্জশিট দাখিল করলে আদালত আসামির বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন। এদিকে মামলা তুলে নেয়ায় জন্য আসামি দেলোয়ার ওরফে কহির ফকির, সিরাজুল ইসলাম ও তার লোকজন বাদি উম্মে হাফিজা ও তার স্বামীসহ পরিবারের লোকজনকে নানাভাবে হুমকি দিয়ে আসছিল।
মামলার জের ধরে ঘটনার দিন গত শুক্রবার সন্ধ্যায় ইফতারের পর আগের মামলার বাদির স্বামী ফয়সাল তালুকদার লিটন ঈদ মার্কেট করার জন্য আদমদীঘি বাজারে যাবার পথে দেলোয়ার হোসেন কহির ফকিরের বাড়ির সামনে পৌঁছামাত্র ওঁৎ পেতে থাকা একই গ্রামের আগের মামলার আসামি দেলোয়ার ওরফে কহির ফকির, দুলালী বেগম, আইয়ুব আলী, এখলাস হোসেন, সিরাজুল ইসলামসহ বেশ কয়েকজন কুড়াল, কোদাল, হাসুয়াসহ দেশিয় ধারালো অস্ত্র দিয়ে বাদির স্বামী ফয়সাল তালুকদার লিটনের পথরোধ করে মারপিটে গুরুতর জখম করে।
এ খবর পেয়ে তাকে রক্ষা করতে আসা লিটনের স্ত্রী উম্মে হাফিজা, ছেলে ফারসিদ তালুকদার মেয়ে নুসরাত জাহান নিহা ও বেড়াতে আসা ছোট বোন রানীনগর উপজেলার ভেবড়ার উম্মে হাবিবা উর্মিকে আসামিরা ধাওয়া করে। তারা আত্মরক্ষার জন্য জনৈক শফিকুল ইসলামের বাড়িতে আশ্রয় নিলে হামলাকারীরা সেখানে গিয়ে ধারালো অস্ত্রে দিয়ে কুপিয়ে রক্তাক্ত জখম করে।
এসময় এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয়রা আহত চারজনকে উদ্ধার করে বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল হাসপাতালে নেয়ার পর উম্মে হাবিবা উর্মি মারা যান। আহতরা হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসার সুযোগে হামলাকারীরা বাদির বসতবাড়িতে হামলা চালিয়ে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটায়।
এ ঘটনায় পরদিন শনিবার ২১ মার্চ দুপুরে নিহতের বোন উম্মে হাফিজা বাদি হয়ে থানায় উল্লেখিত ব্যক্তিসহ ১৩ জনকে আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। পুলিশ হামলাকারী নারীসহ পাঁচজনকে গ্রেফতার করেছে। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা উপপরিদর্শক আব্দুর রহমান জানান, অপর আসামিদের গ্রেফতারে তৎপরতা চলছে।
অপরদিকে আদমদীঘি ও সান্তাহার প্রতিনিধি জানান, আদমদীঘির সান্তাহারে রিমু বেগম (১৯) নামের এক নারীকে শয়ন ঘরে শ্বাসরোধে হত্যার অভিযোগে স্বামী মজিবর রহমান সাদ্দামের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। গত সোমবার বিকেলে সান্তাহার মায়া বিড়িকারখানার শান্তিনগর এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় এ ঘটনা ঘটে। নিহত রিমু বেগম সান্তাহার সাহেবপাড়ার আইয়ুব আলীর মেয়ে।
এ ঘটনায় নিহতের মা রেখা বেগম বাদি হয়ে ওইদিন রাতে আদমদীঘি থানায় নিহতের স্বামী সান্তাহার পশ্চিম লকু কলোনির সামছুল আলমের ছেলে মজিবর রহমান ওরফে সাদ্দাম হোসেনকে (৪৮) আসামি করে এ মামলা দায়ের করেন।
মামলা সূত্রে ও স্থানীয়রা জানান, মজিবর রহমান ওরফে সাদ্দাম হোসেন চারমাস আগে রিমু বেগমকে দ্বিতীয় বিয়ে করে সান্তাহার মায়া বিড়ি কারখানার পাশে শান্তিনগর এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় নিয়ে বসবাস করে আসছিল। বিয়ের পর থেকে পারিবারিক কলহ চলছিল। ঘটনার দিন গত সোমবার দুপুরে ওই ভাড়া বাসায় স্বামী-স্ত্রী শয়ন ঘরে ঘুমিয়ে পড়ে।
বিকেলে ঘরের মধ্যে স্বামী সাদ্দাম হোসেন ও স্ত্রী রিমুর মধ্যে ঝগড়া হয়। রিমুর মা বিষয়টি জানতে চাইলে সাদ্দাম ঘরের দরাজ বন্ধ করে পালিয়ে যায়। রিমুর মায়ের সন্দেহ হলে ঘরের মধ্যে প্রবেশ করে দেখেন রিমুর নিথর দেহ পড়ে রয়েছে। খবর পেয়ে সন্ধ্যায় পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে রিমুর লাশ উদ্ধার ও পাশে থাকা একটি রশি জব্দ করে।
নিহতের মা রেখা বেগম জানান, তার মেয়েকে জামাই মজিবর রহমান ওরফে সাদ্দাম হোসেন ঘরের ভিতর শ্বাসরোধে হত্যা করে পালিয়ে যায়। আদমদীঘি থানার অফিসার ইনচার্জ কামরুজ্জামান মিয়া বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, লাশ উদ্ধার করে ময়না তদন্তের জন্য মর্গে প্রেরণ করা হয়েছে। আসামি গ্রেফতারে তৎপরতা চলছে।
পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/162276