জাতির মাথার উপরে এখানো ফ্যাসিবাদের কালো ছায়া

জাতির মাথার উপরে এখানো ফ্যাসিবাদের কালো ছায়া

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘ফ্যাসিবাদ বিদায় নেয়নি, ফ্যাসিবাদের একটি বড় স্টেকহোল্ডার বিদায় নিয়েছে। কিন্তু ফ্যাসিবাদের কালো ছায়া এখনো জাতির মাথার উপর রয়ে গেছে।’

তিনি বলেছেন, ‘জাতীয় সংসদের বাইরেও চলমান গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ইস্যু নিয়ে পরিবেশ সৃষ্টি হলে বিরোধীদল প্রধানমন্ত্রীর সাথে আলোচনায় বসতে পারে।’

আজ রোববার (২২ মার্চ) সকালে সিলেটে সাংবাদিকদের সাথে মতবিনিময়কালে তিনি এ কথা বলেন।

সিলেট সার্কিট হাউজে আয়োজিত এই মতবিনিময় সভায় তিনি দেশের রাজনীতি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, গণভোট, সংবিধান সংস্কার, সংসদের ভূমিকা, ঈদযাত্রায় ভাড়া নৈরাজ্য ও সিলেটের উন্নয়ন-বঞ্চনাসহ নানা বিষয়ে কথা বলেন।

ডা: শফিকুর রহমান বলেন, ‘দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরও দেশ এখনো পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। সমাজের সর্বত্র অনিয়ম, বিশৃঙ্খলা, প্রতিহিংসা ও সংকীর্ণতা রয়ে গেছে। রাজনীতিবিদরা কথার সাথে কাজের মিল রাখতে না পারায় মানুষের মধ্যে রাজনীতির প্রতি অশ্রদ্ধা ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।

রাষ্ট্রপতির প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিকে আলাদা করে দেখতে হবে জানিয়ে ডা: শফিকুর রহমান বলেন, ‘রাষ্ট্রপতির প্রতিষ্ঠানের ব্যাপারে আমাদের কোনো নেতিবাচক কথা নেই। কিন্তু ব্যক্তি সম্পর্কে আমাদের কথা আছে। এই রাষ্ট্রপতি দীর্ঘদিন কার্যতঃ ফ্যাসিবাদের দোসর ও সহযোগী হিসেবে কাজ করেছেন। জুলাই রক্তের উপর দাঁড়িয়ে যে সংসদ সেই জাতীয় সংসদে এমন ব্যক্তির ভাষণ আমরা শুনতে চাইনি।’

গণভোট ও সংস্কার পরিষদ প্রসঙ্গে ডা: শফিকুর রহমান বলেন, গণভোটে ৬৮ ভাগ ভোটার সংস্কারের পক্ষে মত দিয়েছেন। কিন্তু সেই রায়ের পূর্ণ বাস্তবায়ন হয়নি।

তিনি অভিযোগ করেন, ‘সরকারি দলের সদস্যরা সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ না নেয়ায় জটিলতা তৈরি হয়েছে।

এ বিষয়ে সংসদে নোটিশ দেয়া হবে এবং সংসদের ভেতরে-বাইরে তারা বিষয়টি উত্থাপন করবেন বলে জানান তিনি।

সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকা নিয়ে তিনি বলেন, বিরোধী দলের দু’টি প্ল্যাটফর্ম- একটি সংসদের ভেতরে, অন্যটি রাজপথে। সংসদের ভেতরে যেমন গঠনমূলক রাজনীতি হবে, তেমনি প্রয়োজনে রাজপথেও গঠনমূলক কর্মসূচি দেয়া হবে।

তবে রমজান মাসের প্রতি সম্মান জানিয়ে তারা মাঠের কর্মসূচি থেকে বিরত ছিলেন বলে উল্লেখ করেন তিনি।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে জামায়াত আমির বলেন, ‘বিভিন্ন স্থানে প্রকাশ্যে গুলি, হত্যা ও সহিংসতার ঘটনা দুঃখজনক।

তিনি জানান, এসব ঘটনায় তারা প্রতিবাদ ও আপত্তি জানিয়েছেন। মানুষের জীবন, সম্পদ ও সম্মান রক্ষার প্রশ্নে তারা নীরব থাকবেন না বলেও জানান তিনি।

ঈদযাত্রায় অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ তুলে ডা: শফিকুর রহমান বলেন, ‘নির্বাচিত সরকারের সময় মানুষ স্বস্তিতে যাতায়াত করতে পারেনি, বাড়তি ভাড়া গুনতে হয়েছে।’

এ বিষয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত করে ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানান তিনি। তার ভাষ্য, জনগণের অর্থ কোনো দলের নয়; সরকার কেবল তার ব্যবস্থাপক।

দেশের অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন জামায়াত আমির। তিনি বলেন, চলমান বৈশ্বিক যুদ্ধপরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশ জ্বালানি, রেমিট্যান্স ও বৈদেশিক বাণিজ্যে বড় ধরনের চাপে পড়তে পারে। এ সঙ্কট মোকাবিলায় সরকার উদ্যোগ নিলে জাতীয় স্বার্থে তা বিবেচনা করবে বিরোধী দল।

স্থানীয় সরকার নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সব স্তরে গণতন্ত্রের চর্চা ও জবাবদিহিমূলক নেতৃত্ব তৈরির জন্য দ্রুত স্থানীয় সরকার নির্বাচন হওয়া উচিত। জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমেই স্থানীয় পর্যায়ে জনগণের কাজ পরিচালিত হওয়া প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি।

সাংবাদিকদের ভূমিকার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘মিডিয়া জাতির দর্পণ, আর সাংবাদিকেরা জাতির বিবেক। সমাজের অসংগতি, দুর্নীতি ও অনিয়ম তুলে ধরার মাধ্যমে সাংবাদিকেরা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন।’

তবে বেশিভাগ ক্ষেত্রে সাংবাদিকতায় সমাজ ও বিবেকের প্রতিধ্বনি আগের মতো দেখা যাচ্ছে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

সিলেটের উন্নয়ন প্রসঙ্গে ডা: শফিকুর রহমান বলেন, দীর্ঘদিন ধরে সিলেট উন্নয়ন-বঞ্চনার শিকার। সিলেটের ন্যায্য পাওনা যাতে বঞ্চিত না হয়, সে দাবিতে তারা সোচ্চার থাকবেন। তবে বাস্তবায়নের মূল দায়িত্ব সরকারের হাতে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

মতবিনিময় সভার শুরুতে ডা. শফিকুর রহমান দেশবাসী, প্রবাসী বাংলাদেশী ও সারা বিশ্বের মুসলমানদের ঈদের শুভেচ্ছা জানান।

একইসাথে সিলেটের সাংবাদিক সমাজের ঐতিহ্য, সামাজিক সহমর্মিতা ও পেশাগত ভূমিকার প্রশংসা করেন। অতীতে সিলেটের সাংবাদিকরা জাতির অপরিহার্য প্রয়োজনে যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করেছেন বলেও উল্লেখ করেন এক সময় সিলেটের আলোচিত এই রাজনৈতিক নেতা।

সিলেট মহানগর জামায়াতের আমির ও দলের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য মুহাম্মদ ফখরুল ইসলামের সভাপতিত্বে মতবিনিময় সভায় অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, সিলেট জেলা আমির মাওলানা হাবিবুর রহমান,

সিলেট মহানগর সেক্রেটারি মুহাম্মদ শাহজাহান আলী, জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মুহাম্মদ জয়নাল আবেদীন, সিলেট মহানগর জামায়াতের নায়েবে আমির মাওলানা নুরুল ইসলাম বাবুল, সাবেক মহানগর জামায়াতের সেক্রেটারি হাফিজ মাওলানা আবদুল হাই হারুন,মহানগর নায়েবে আমির হাফিজ মাওলানা মিফতাহ উদ্দিন, মহানগর জামায়াতের এসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি মুহাম্মদ জায়েদুর রহমান চৌধুরী, জামায়াতে জেলা শাখার নেতা মাওলানা ইসলাম উদ্দিন ও সিলেট সদর উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান জইন উদ্দিনসহ জেলা ও মহানগরীর শীর্ষ স্থানীয় নেতৃবৃন্দ।

পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/162109