শব্দের কারিগরি ও আগামীর শৈশব: ধনী—গরিব পিতামাতার আচরণের ব্যবচ্ছেদ
একটি শিশুর ভবিষ্যৎ কেবল তার বাবার ব্যাংকের ব্যালেন্স দিয়ে নির্ধারিত হয় না, বরং নির্ধারিত হয় শৈশবে তার কানে আসা শব্দগুলোর গঠন দিয়ে। সা¤প্রতিক সময়ে সমাজবিজ্ঞানী ও মনোবিজ্ঞানীদের গবেষণায় উঠে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। অধ্যাপক জিয়াং—এর মতো বিশেষজ্ঞরা দেখিয়েছেন, ধনী ও গরিব পরিবারের মধ্যে আসল পার্থক্যটা কেবল জীবনযাত্রায় নয়, বরং সন্তানদের সাথে কথা বলার ‘বাক্য গঠনে’। এই ভাষাগত ও আচরণগত পার্থক্যই নির্ধারণ করে দেয় একটি শিশু ভবিষ্যতে নেতৃত্বের আসনে বসবে, নাকি কেবল আজ্ঞা পালনকারী হবে।
চীনে শিক্ষা সংস্কারের সাথে যুক্ত ছিলেন অধ্যাপক জিয়াং (জিয়াং জুয়েকিন) । তিনি একজন চীনা—কানাডিয়ান শিক্ষাবিদ, ভাষ্যকার এবং ইউটিউবার । ২০২২ সাল থেকে বেইজিংয়ের মুনশট একাডেমি হাই স্কুলে শিক্ষকতা করছেন । তাঁর ইউটিউব চ্যানেল “প্রেডিক্টিভ হিস্ট্রি”—এর জন্য পরিচিত, যেখানে স্ট্রাকচারাল হিস্টোরিক্যাল অ্যানালাইসিস এবং গেম থিওরি ব্যবহার করে ভূ—রাজনৈতিক ভবিষ্যদ্বাণী করে থাকেন । স¤প্রতি চলমান ইরান—ইসরায়েল—আমেরিকার যুদ্ধ, ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়া এসব কিছুই তিনি বিশ্ববাসীকে জানিয়েছিলেন। তিনি “প্রফেসর জিয়াং” নামে পরিচিত ।
অধ্যাপক জিয়াং—এর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, নিম্নবিত্ত বা মানসিকভাবে দরিদ্র পরিবারগুলোতে বাবা—মায়ের ভাষা সাধারণত হয় ‘আদেশমূলক’ ও ‘নেতিবাচক’। সেখানে কথোপকথন শুরু হয় ‘না’ দিয়ে। যেমন— “এটা করো না”, “ওখানে যেও না”, “চুপ করো”, কিংবা “জেদ করো না, আমাদের টাকা নেই”। এই ধরনের ছোট ও সরাসরি আদেশমূলক বাক্যগুলো শিশুর সৃজনশীলতাকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করে। যখন একটি শিশু বারবার কেবল ‘নিষেধ’ শোনে, তখন তার অবচেতন মনে এই ধারণা গেঁথে যায় যে, তার চারপাশের জগতটা সীমাবদ্ধ এবং সেখানে তার নিজের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। ফলে বড় হওয়ার পর এই শিশুরা ঝুঁকি নিতে ভয় পায় এবং তাদের মধ্যে এক ধরনের হীনম্মন্যতা তৈরি হয়।
বিপরীত চিত্রটি দেখা যায় সচেতন বা উচ্চবিত্ত মানসিকতার পরিবারগুলোতে। সেখানে বাবা—মায়েরা ‘আদেশ’ দেওয়ার বদলে ‘জিজ্ঞাসা’ করতে পছন্দ করেন। তারা শিশুকে সরাসরি ‘না’ না বলে বিকল্প প্রস্তাব দেন। অধ্যাপক জিয়াং উদাহরণ দিয়ে দেখিয়েছেন, কোনো শিশু খেলনা চাইলে ধনী বাবা—মা হয়তো বলেন না যে “টাকা নেই”, বরং তারা বলেন— “তুমি কি মনে করো এই খেলনাটি তোমার বর্তমান খেলনাগুলোর চেয়ে ভালো? কেন ভালো বলো তো?” এই যে ‘কেন’ বা ‘কীভাবে’—এই প্রশ্নবোধক বাক্যগুলো শিশুর মস্তিষ্কের যৌক্তিক অংশকে সক্রিয় করে তোলে। তারা ছোটবেলা থেকেই যুক্তি দিয়ে চিন্তা করতে শেখে, প্রশ্ন করতে শেখে এবং নিজের মত প্রকাশের সাহস পায়।
ধনী ও গরিব বাবা—মায়ের আচরণের আরেকটি বড় পার্থক্য হলো ‘ভুল’ মোকাবিলা করার ধরন। কোনো কিছু ভেঙে ফেললে বা পরীক্ষায় খারাপ করলে গরিব পরিবারের বাবা—মায়েরা সাধারণত তিরস্কার বা শাস্তিমূলক বাক্য ব্যবহার করেন, যা শিশুর আত্মবিশ্বাস ধুলোয় মিশিয়ে দেয়। অন্যদিকে, সচেতন বাবা—মায়েরা সেই ভুলকে একটি ‘শিক্ষণীয় মুহূর্ত’ হিসেবে ব্যবহার করেন। তারা শিশুকে জিজ্ঞেস করেন, “এই ভুলটা থেকে আমরা কী শিখলাম?” বা “পরের বার আমরা এটা কীভাবে আরও ভালোভাবে করতে পারি?” এই যে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি, এটাই একটি শিশুকে ভবিষ্যতে সমস্যা সমাধানের দক্ষতায় পারদর্শী করে তোলে।
পারিবারিক সম্প্রীতি মানে কেবল একসাথে থাকা নয়, বরং একে অপরের সাথে সম্মানজনক ও গঠনমূলক যোগাযোগ। অনেক সময় দেখা যায়, অঢেল টাকা থাকা সত্ত্বেও কোনো বাবা—মায়ের আচরণ ‘দরিদ্র’ হতে পারে যদি তাদের ভাষায় যুক্তি ও সহমর্মিতার অভাব থাকে। আবার অতি সাধারণ আয়ের বাবা—মাও তাদের সন্তানকে ‘ধনী’ মানসিকতা দিয়ে বড় করতে পারেন যদি তারা কেবল আদেশের বদলে সংলাপে বিশ্বাস করেন।
পরিশেষে, আমাদের মনে রাখতে হবে যে শব্দগুলো বীজের মতো। আমরা আজ আমাদের সন্তানদের সাথে যে ধরনের বাক্য ব্যবহার করছি, কাল তারা ঠিক সেই মানসিকতার ফল দেবে। অভাব বা প্রাচুর্য যা—ই থাকুক না কেন, বাবা—মায়ের উচিত তাদের ভাষাগত আচরণে পরিবর্তন আনা। সন্তানের সাথে আদেশ নয়, বরং যুক্তি ও সহমর্মিতার ভাষায় কথা বলাই হোক সুখী ও সফল পরিবার গড়ার মূল মন্ত্র।
হাসান মো: শাব্বির
সাংবাদিক-প্রাবন্ধিক ।