মাঠজুড়ে হাহাকার, জয়পুরহাটের কালাইয়ে ঈদের আনন্দ নেই চাষি পরিবারে

মাঠজুড়ে হাহাকার, জয়পুরহাটের কালাইয়ে ঈদের আনন্দ নেই চাষি পরিবারে

কালাই (জয়পুরহাট) প্রতিনিধি : ‘আজ অন্তর কাল ঈদ, এখনও মাঠেই পড়ে আছি। জমি থেকে বৃষ্টির পানি বের করতে পারিনি। পানির নিচ থেকে উপরে আলু তুলে দেখছি সব আলু পঁচে গেছে। লজ্জা—শরম ত্যাগ করে ছেলে—মেয়েকে সাথে নিয়ে জমিতেই কাজ করছি। ইরি ধানের চারা রোপণের সময়ও চলে যাচ্ছে। জমিতে এখনও পঁচে যাওয়া আলু রয়েই গেছে। এ অবস্থায় ইরি ধানের চারা রোপণ করলে ফলন হবে কি না তা নিয়েই ভাবছি। আসলে আমার পরিবারে ঈদ বলতে কিছুই নেই। কারণ এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে ৬ বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছিলাম। সবই পানির নিচে ডুবে গেছে। আমার সবকিছু শেষ হয়ে গেছে। এখন কিস্তি দিবো কোথায় থেকে? আর ইরি ধানের চারা লাগাবো কী দিয়ে। তার ওপর ঈদ।’ গত মঙ্গলবার এসব কথা বলছিলেন জেলার কালাই উপজেলার উদয়পুর ইউনিয়নের তালোড়া বাইগুনী মাঠে চাষি মোশারফ হোসেন। 

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, এবার জেলায় ৩৯ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে আলুর চাষ হয়েছে। হঠাৎ করে বৃষ্টি ও ঝরের কারণে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। অনেক জমিতে বৃষ্টির পানি জমে থাকায় আলু পঁচে গেছে। 

টানা চারদিনের বৃষ্টিতে জমে থাকা পানির নিচে তলিয়ে গেছে জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার অধিকাংশ ফসলের মাঠ। আলু উত্তোলনের শেষ মহূর্তে বৃষ্টির পানি জমে তলিয়ে গেছে ক্ষেত। নিস্কাশনের ব্যবস্থা করতে না পেরে একহাঁটু পানিতে নেমে স্বপ্নের ফসল খঁুজে বের করছেন চাষি। কিন্তু ‘বিধির বাম’ পানির নিচ থেকে আলু ওঠানোর পর বাঁশের ডালিতে রাখতেই দেখেন অধিকাংশ আলুই পঁচে গেছে। পানি পারাপারের সব পথ ভরাট হয়ে যাওয়ায় ওপর থেকে পানি নিচে এসে ক্ষেত তলিয়ে গেছে বলে অভিযোগ চাষিদের। এ অবস্থায় পুরো জেলাজুরে কমপক্ষে এক হাজার একশ’ হেক্টর জমিতে আলু নষ্ট হয়েছে। তবে কৃষি বিভাগ বলছে, পাঁচশ’ হেক্টরের বেশি নয়।  

মঙ্গলবার কালাই উপজেলার আঁওড়া, হাতিয়র, তালোড়া বাইগুনি, ধুনট, কালিমহুর, ঝামুটপুর, বানিহারাসহ বিভিন্ন মাঠে গিয়ে দেখা যায়, একহাঁটু পানিতে নেমে চাষিরা আলু তুলছেন। এসময় তাদের চোখে অশ্রম্ন ঝরতে দেখা গেছে। দুইদিন পর ঈদ, এখনও পরিবারের কেনাকাটা করতে পারেননি অনেকেরই। আলুতো পঁচে গেছেই, তার ওপর জমিগুলোতে ইরি—বোরো রোপণ করতে হবে। পঁচে যাওয়া আলু জমি থেকে সরাতে অনেক খরচও হবে। তা না হলে ইরি ফসলেরও ক্ষতির শঙ্কা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে কৃষি অফিস বলছেন, এসব জমিতে ইরি রোপণ করতে হলে অবশ্যই পঁচে যাওয়া আলু জমি থেকে সরাতে হবে। অন্যথায় ইরি ফসলের ক্ষতি হবে।   

চাষি ও কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, গত সপ্তাহে টানা চারদিনের বৃষ্টির পানির নিচে পরে পঁচে গেছে ক্ষেত। ওপর থেকে পানি নিচে আসছেন। দীর্ঘদিন ধরে যে পথ হয়ে এসব মাঠের পানি পারাপার হতো, বর্তমানে সেইসব পথ ভরাট হয়ে যাওয়ার কারনে বন্ধ হয়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা ফসল রক্ষার্থে বিভিন্ন কৌশলে জমিতে জমে থাকা পানি সেচ দিচ্ছেন। তারপরও রক্ষা পাচ্ছেন না। তারা বলছেন, এমনিতেই বাজারে আলুর দাম কম, তার ওপর মাঠে পানি জমে ফসল তলিয়ে গেছে। এবার লোকসান গুনতে হবে পুরোদমে।

গত বছরের লোকশান মাথায় নিয়ে এবারও ধারদেনা করে আলু রোপণ করেছিল চািষিরা। হঠাৎ টানা বৃষ্টি ও ঝড়ের কারণে সব স্বপ্ন বিলিন হয়ে গেছে তাদের। তলিয়ে যাওয়া ফসল রক্ষা করতে পারেননি তারা। পরিবার—পরিজন নিয়ে এখনও তারা মাঠেই পরে আছেন। তাদের ভাষ্য, আলুতো পঁচেই গেছে, ইরি ধান রোপণ করে আবার কোন বিপদে পরতে হয় বুঝি। কারন পঁচে যাওয়া আলু জমি থেকে অন্যত্র ফেলে দিতে গেলে আরও খরচ হবে, আবার আলুসহ চাষ দিয়ে ইরি রোপণ করলে পঁচে যাওয়া আলুর কারণে ইরির আবাদে ফলন কী হবে তাও ভাবনার বিষয়। এসব নিয়ে এখন তাদের বিপদ কাটেনি। 

তালোড়া বাইগুনী আরেক কৃষক একরাম হোসেন বলেন, আলুর বয়স বেশি হয়েছে, পানি জমে থাকলে কিছুই হবে না। তাই একহাঁটু পানিতে নেমে আলু তুলে দেখি সব পঁচে গেছে। আসলে কপাল না আগালে যা হয় তাই হয়েছে। আর কখনও আলুর আবাদ করবো না। গত দুই বছরের লোকশানে অনেক ক্ষতি হয়েছে।  

কালাই উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা হারুনুর রশিদ বলেন, বৃষ্টির পানিতে এ উপজেলায় ক্ষতির পরিমাণ বেশি হয়েছে। ধারনা করা হচ্ছে ৫শ’ হেক্টরের বেশি না। তিনি আরও জানান, এ অবস্থায় বোরো রোপণ করলে জমিতে গ্যাস তৈরি হবে, ফসফটিক পরিবেশ বেড়ে যাবে। এসিটিক কনডিশন তৈরি হবে, যাতে পরবর্তী ফসলের জন্য ক্ষতিকর। আলুসহ চাষ করে জমিতে ৭—১০ দিন পর যদি বোরো রোপণ করা হয়, তাহলে তেমন একটা ক্ষতি হবে না। তার চেয়ে পঁচে যাওয়া আলু সরিয়ে বোরো রোপণ করা উত্তম।    

 

পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/161725