শত—সংকট মাঝেও ঈদ উৎসব আনন্দময় হোক

শত—সংকট মাঝেও ঈদ উৎসব আনন্দময় হোক

পবিত্র ঈদুল ফিতর দুয়ারে প্রায়। এক মাসের সিয়াম সাধনা শেষে খুশীর এই উৎসবে সকলকে জানাই ঈদ মোবারক। ধর্ম বিশ্বাস যাই হোক উৎসবের আনন্দ সবার। এই চেতনায় বাংলাদেশের মানুষ তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের সাথে প্রথমবারের মত ঈদ উদযাপন করবে। সবাই আনন্দের সাথে ঈদ করুক সেটাই আমাদের প্রার্থনা। কিন্তু কৃষিনির্ভর বাংলাদেশে এবারে কৃষকের ঈদ আনন্দ যেন খরায় শুকিয়ে গেছে। আলু, পেঁয়াজ, ডিম, সব্জি সবকিছুর দামই এবার তলানীতে। কৃষকের মাথায় হাত। ক্ষেতের ফসল বিক্রি করে মনের আনন্দে প্রিয় পরিবার—পরিজনের জন্য নতুন কাপড়, কিছু ভাল খাবার কেনার সামর্থ্য এবার সংকুচিত প্রায়। দেনার দায়ে ক্ষুদ্র কৃষকেরা আজ বিপর্যস্ত। তার উপর রয়েছে বোরো মৌসুমে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের অজুহাতে জ্বালানী তেলের কৃত্রিম সংকট। সব মিলিয়ে কৃষকের ঈদ আনন্দ এবার যেন ি¤্রয়মান। মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত রেমিট্যান্স যোদ্ধারা সংকটে, সেই কারণে ঈদ আনন্দ কমে গেছে প্রবাসী আয় নির্ভর পরিবারগুলোতেও। সৃষ্ট পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকার নিশ্চয় সচেতন এবং নগদ সহায়তা নিয়ে ভুক্তভোগীদের পাশে দাঁড়াবেন, সেই প্রত্যাশা রাখছি। 

ঈদের আগেই বর্তমান সরকার দেশের কৃষি ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় সারাদেশে খাল খনন কর্মসূচি শুরু করেছে। নিঃসন্দেহে এটা ভাল কাজ। এই খাল খনন কর্মসূচি উদ্বোধনকালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, দেশের প্রায় বিশ কোটি মানুষের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করতে হবে। তিনি প্রশ্ন রেখেছেন, এত মানুষের খাবার কি বিদেশ থেকে আনা সম্ভব? নিজেদের খাদ্য নিজেরাই ফলানোর উদ্যোগ নিতে হবে। সে লক্ষ্যকে সামনে রেখে দেশের নদ—নদী, খাল, হ্রদ, জলাভূমি প্রভৃতি প্রয়োজনমত খনন এবং দখলমুক্ত করে প্রাণপ্রবাহ ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নতুন সরকারের একটি অসামান্য প্রয়াস। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই। তবে সরকার প্রধান যেভাবে সকল ক্ষেত্রে কৃচ্ছতা সাধনের তাগিদ দিয়ে আসছেন, এই জনহিতকর কাজগুলিতেও যেন ব্যয় সংকোচন তথা কৃচ্ছতা সাধনের চেষ্টা থাকে সেই অনুরোধ রাখতে চাই। স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে স্বচ্ছতার সাথে অংশগ্রহণমূলক পরিকল্পনা ও উদ্যোগ নেয়া হলে নিজের উদ্যোগেই মানুষ মাটি সংগ্রহ করবে এবং তাতে সরকারের ব্যয় কমে আসবে। আর খালের পানি প্রবাহ সচল রাখার জন্য অবশ্যই খালগুলোকে নদীর সাথে সংযুক্ত করতে হবে। 

বাংলাদেশের কৃষি অমিত সম্ভাবনাময়। সঠিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে আমাদের উৎপাদনশীলতা আরও কয়েকগুণ বাড়ানো সম্ভব। এটা কোন রকেট সায়েন্স নয়, এক সমন্বিত ব্যবস্থাপনা উদ্যোগ। নদী—খাল—জলাভূমি সংরক্ষণ অর্থাৎ মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখার ব্যবস্থা সেই সমন্বিত ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আমাদের ভূগর্ভের পানি খুব দ্রুত নীচে নেমে যাচ্ছে। ভূপৃষ্ঠের মিঠা পানি ধরে রাখার পরিমাণ বৃদ্ধির মাধ্যমে সেই ভূগর্ভ থেকে তোলা পানিশূন্যতা যেমন পূরণ হবে, তেমনি জমিতে লবণাক্ততা বৃদ্ধির পরিমাণ কমবে। লবণাক্ততা বৃদ্ধি একটি দীর্ঘমেয়াদী ও বহুমাত্রিক জলবায়ূ পরিবর্তনজনিত পরিবেশ সমস্যা। আমাদের উন্নয়ন পরিকল্পায় তাই পরিবেশ সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে, পরিবেশসম্মত কৃষি ও খাদ্য ব্যবস্থাপনায় মনোনিবেশ করতে হবে। অগ্রাধিকারের বিবেচনায় রাখতে হবে স্বাদু পানি ও মাটির সুরক্ষাকে। পানি ও মাটি ধ্বংস করে আমরা যে বাঁচতে পারব না সে বিষয়ে সর্বস্তরে সচেতনতা বৃদ্ধিতে সরকারকেই মনযোগ দিতে হবে। 

মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশে বছরে জনসংখ্যা বাড়ছে প্রায় ১.১২ শতাংশ হারে, যদিও আবাদী জমি বাড়ছে না, কমছে প্রায় ১ শতাংশ হারে। নগরায়ন, শিল্পায়ন, ইত্যাদির প্রভাবে শুধু জমিই কমছে না, অবিশ্বাস্য হারে কমে যাচ্ছে কৃষিতে নিয়োজিত শ্রমশক্তির সংখ্যা। কৃষি শ্রমিকের অভাবে বাংলাদেশের অনেক এলাকাতে জমি অব্যবহৃত থাকছে, গড়ে তোলা হচ্ছে ফল ও কাঠের গাছের বাগান। ফল বাগান অবশ্য খাদ্য নিরাপত্তার সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত এবং বাণিজ্যিক কৃষির এক গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। 

আমাদের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এখনও পর্যন্ত বেশ কয়েকটি কৃষি ও কৃষক বান্ধব পদক্ষেপ নিয়েছেন যা আমাদের আশাবাদী করে। দশ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি ঋণ মওকুফ, ফ্যামিলি কার্ড, স্মার্ট কৃষক কার্ড ও খাল খনন তার মধ্যে অন্যতম। অতীতেও সরকারগুলো সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচী’র আওতায় নানা ধরনের সেবামূলক বা ‘সেফটি নেট’ কার্যক্রম চালু করেছিল এবং মানুষ তার সুফল পেয়েছে। যদিও সেই সময় উপকারভোগী নির্বাচনে দলীয়করণের ব্যাপক অভিযোগ উঠেছিল, যার পুনরাবৃত্তি বর্তমান সরকারের আমলে কাম্য নয়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মহান জাতীয় সংসদে প্রথমদিনের বক্তব্যে বলেছেন যে তিনি কেবল দলের নন, সবার সরকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। আমরা তাঁর সেই শুভচিন্তাকে স্বাগত জানাই। আমরা তাঁর কথায় ভরসা রাখতে চাই। তিনি সরকারের সেবা সুবিধাগুলি সঠিক ব্যক্তি বা পরিবার নির্বাচনের মাধ্যমে প্রদান নিশ্চিত করবেন সেটা বিশ্বাস করতে চাই। সরকার প্রধানকে মাথায় রাখতে হবে, বিদ্যমান ঘুণেধরা সিষ্টেমের কারণে তিনি একা সবকিছু ঠিক করে ফেলতে পারবেন না। তাকে ঘিরে থাকা মানুষগুলোর দল নিরপেক্ষতা, সততা ও কর্মদক্ষতা এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক। শেষ পর্যন্ত এদের দৌরাত্ম্যের কারণেই সরকার প্রধানের বদনাম হয়, তাঁর ভাল কাজগুলোর উদাহরণ ভেসে যায় নিন্দুকের নোনা জলে। আমরা এর পরিবর্তন চাই। 

শত—সংকট মাঝেও ঈদ উৎসব আনন্দময় হোক। হিংসা—বিদ্বেষ ভুলে সকলে মিলে, কোলাকুলির গভীর তাৎপর্য মেনে একটি সুন্দর সমাজ বিনির্মাণের জন্য সবাই সচেষ্ট হই। সকল নারী, শিশু ও বয়স্কদের জন্য নিরাপদ ও আনন্দময় ভবিষ্যত নিশ্চিত করি। দৈনিক করতোয়া পরিবারের পক্ষ থেকে সকলকে আবারও জানাই ঈদ মোবারক। 


আতাউর রহমান মিটন

পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/161717