পরিশুদ্ধতায় সাম্যের অনন্য দৃষ্টান্ত ঈদুল ফিতর
সৃষ্টির সেরা জীব মানুষকে সৃষ্টি করার অন্যতম উদ্দেশ্য হল সৃষ্টিকর্তা তার ইচ্ছাকে মানুষের মাঝে প্রতিফলন ঘটাতে চান। তাইতো যুগে যুগে ঐশীবানির মাধ্যমে মানবজাতিকে পরিশুদ্ধতায় খাঁটি করতে সৃষ্টিকর্তা তার বিধান প্রদান করেছেন। সেই ধারাবাহিকতায় আম্বিয়া কুল শিরোমণি হযরত মুহাম্মদ (সা) এর ওপর পবিত্র কোরআন মাহে রমজানে অবতীর্ণ করেন। যে পবিত্র কোরআনকে বলা হয় কমপ্লিট কোড অফ লাইফ। দৈনন্দিন জীবনের প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে সফলতা ও পরিপূর্ণতা লাভের অনন্য রক্ষাকবচ এই পবিত্র গ্রন্থ । মাহে রমজানের গুরুত্ব তাৎপর্য ও মহামান্বিত সম্মান পবিত্র গ্রন্থ আল কোরআন অবতীর্ণ হওয়ার মাঝে নিহিত। যে পবিত্র মাসে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের রেজান্দী লাভ অনেক সহজতর করা হয়েছে। স্বাভাবিকভাবে আমরা খুব ভালোভাবে জানি যে যিনি মেশিন তৈরি করেন তিনিই ভাল বোঝেন সেই মেশিনটির গতিপ্রকৃতি, চলাচল, মেরামত এবং সঠিকভাবে কর্মক্ষম রাখার কৌশল। মানুষের শরীর একটি অত্যন্ত জটিল মেশিন। মহান আল্লাহ পাক এর সৃষ্টিকর্তা। তিনিই ভাল বোঝেন এই মেশিনের মধ্যে যে বস্তুগুলি রয়েছে সে বস্তুগুলি কিভাবে কর্মক্ষম থাকবে। বৈজ্ঞানিক ভাষায় বলতে গেলে মানুষের মস্তিষ্ক থেকে শুরু করে অন্যান গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ—প্রত্যঙ্গগুলো যেমন হার্ট, কিডনি রক্ত সংবহনতন্ত্র ও অন্যান্য গ্রন্থসমূহ যথাযথভাবে কর্মক্ষম রাখতে ১২ মাসের মধ্যে অবশ্যই কিছু সময় না খেয়ে থাকাটা খুবই জরুরী। একই সাথে এ পৃথিবীতে অনেক গরিব ও হতদরিদ্র মানুষ রয়েছে যারা কখনোই পেট ভরে খেতে পারেনা, তাদের কেমন অনুভূতি তা অনুভবের জন্য অবশ্যই সকল শ্রেণী—পেশার মানুষের না খেয়ে এবং অন্যান্য ভোগ বিলাসিতা থেকে বিরত থেকে নিজেকে শুধু মানুষ হিসাবে অনুভবে এক অনন্য সুযোগ এই মাহে রমজান। তাইতো সাম্য স্থাপনের এর চেয়ে আর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হতে পারে না। একই সাথে মহান আল্লাহর বিধান মোতাবেক ঈদুল ফিতরের নামাজের পূর্বেই ফিদিয়া বা ফেতরা আদায় করতে হয়। কারণ ঈদুল ফিতরের আনন্দ শুধু ধনিরাই অনুভব করবে না অনুভব করবে হতদরিদ্র মানুষরাও। একইভাবে আল্লাহ পাকের ভীতি অন্তরে ধারণ করতে পারলে আল্লাহর রেজাবন্দি হাসিল হয়। সেই প্রেক্ষাপটে যাকাতের গুরুত্ব অনুভব করে সঠিকভাবে যাকাত আদায়ের মাধ্যমে ধনী গরিবের বৈষম্য যেমন দূর হয় ঠিক তেমনি সমাজে ও রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠিত হয় সাম্য ও সৌহাদ্যর্পূর্ণ ভ্রাতৃত্ব। একবার একটু স্থিরভাবে ভাবুন আজকে উত্তপ্ত বিশ্বের যেভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘন করছে সে ক্ষেত্রে রোজার মাহাত্ম্য ও গুরুত্ব একটু অনুধাবন করি। সিয়াম সাধনাকারী কখনোই নিজের হাতে অন্যের অন্যায় করতে পারে না, অন্যকে গালি বা কটু কথা বলতে পারেনা অন্যের কোন জিনিস চুরি করতে বা অন্যায় ভাবে নিতে পারে না, কখনোই ঘুষ খেতে পারে না, অন্যকে ঠকাতে পারে না। তাহলে অন্যের শরীরে বোমা কিভাবে মারবে। অন্যকে ধ্বংস করার জন্য কিভাবে পরমাণু বোমা নিক্ষেপ করবে। মিছাইল নিক্ষেপ করে বিশ্ব মানবতাকে কিভাবে ধ্বংস করবে। এটা এমনি এক বাস্তবতা যেখানে সেহরি খাওয়ার সময় শেষ হয়ে যাওয়ার পরে এক বিন্দু পানি পর্যন্ত রোজাদার ব্যক্তি পান করতে পারে না, আবার ইফতারের ঠিক এক সেকেন্ড আগেও রোজাদার ব্যক্তি এক বিন্দু পানি পান করতে পারেনা। কত সুন্দর নীতিমালার আলোকে কত চমৎকার প্রশিক্ষণ। বিশ্ব মানবতায় স্বর্গীয় সুখ অনুভবে এই অনন্য দৃষ্টান্ত আর কোথাও নেই। প্রচন্ড পানির পিপাসায় যখন একজন রোজাদার অত্যন্ত কাতর তখন মানুষের অগোচরে সহজেই তৃপ্তি সহকারে পানি পান করতে পারে, সেখানে শুধুমাত্র আল্লাহ পাককে রাজি এবং খুশি করার জন্য এক বিন্দু পানীয় পান করে না। এই একই ব্যক্তি দ্বারা কিভাবে অন্যের অলক্ষে অন্যায় কোন কিছু ঘটবে? রমজানের সিয়াম সাধনার প্রকৃত শিক্ষা এই আল্লাহর জমিনে প্রতিষ্ঠিত হলে কখনোই হানাহানি মারামারি কাটাকাটি, অন্যের সম্পদ লুণ্ঠন, অন্যকে আক্রমণ, অন্যায়ভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘন কোনোটিই থাকবে না। পৃথিবী হয়ে উঠবে এক অনন্য সুখের বাসযোগ্য ভূমি। প্রতিফলিত হবে সৃষ্টিকর্তার মূল উদ্দেশ্য।
দুনিয়ার জীবন অত্যন্ত ক্ষণস্থায়ী জীবন। দীর্ঘ পরিক্রমায়া সামান্য বিরতি মাত্র। আমাদের বুঝতে হবে যেখানে আমরা বিরতি নিয়েছি সেখানে চলাচলের জন্য অবশ্যই নির্দিষ্ট নিয়ম—কানন ও আইন মেনে চলতে হবে। এর বাইরে গেলে অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্ত হবো। যেমন আমরা অনেক দূরের পথ পাড়ি দেয়ার জন্য প্লেনে একটু সময় কোন এয়ারপোর্টে ট্রানজিশন নেই, তখন অবশ্যই আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ওই নির্দিষ্ট এয়ারপোর্টের নিয়ম—কানুন কঠোরভাবে মেনে চলতে হয়। আমাদের মূল উদ্দেশ্য থাকে গন্তব্যে পেঁৗছা। ট্রানজেকশন নেয়া এয়ারপোর্টে নিয়ম—কানুন ভঙ্গ করে গন্তব্যে পেঁৗছা থেকে বিরত থাকা কখনোই বুদ্ধিমানের কাজ নয়। ঠিক তেমনিভাবে আমাদের যে ফাইনাল গন্তব্য সেই গন্তব্যে পেঁৗছার পূর্বেই যদি আমরা পথচ্যুত হয়ে যাই তাহলে সৃষ্টিকর্তার উদ্দেশ্য পূরণ হবে না। তাইতো মহান সৃষ্টিকর্তা বিভিন্ন ধরনের কঠোর কিন্তু মানানসই নিয়ম—কানুন দিয়ে ঐশী বাণীর মাধ্যমে মহান ব্যক্তিদের পাঠিয়ে আমাদের সতর্ক করেছেন। ঈদুল ফিতরের আনন্দ ঠিক চূড়ান্ত গন্তব্যে পেঁৗছার আনন্দের মতই। এই আনন্দের মাধ্যমে দীর্ঘ একমাস প্রশিক্ষণের যে সনদ প্রাপ্তি ঘটে তার সফল বাস্তবায়ন সারাটি জীবনে করার প্রস্তুতি গৃহিত হয়। এক্ষেত্রে যেমন পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ আসে নিজের শরীরের ওপরে, ঠিক তেমনি এর বাস্তবায়ন ঘটে সমাজের প্রতিটি স্তরে। প্রত্যাহিক জীবনে ধনী, গরিব, নিম্নস্তর, উচ্চস্তর, বংশীয় দাম্ভিকতা, ক্ষমতা, অসহায়ত্ব প্রভৃতি থেকে একটি জিনিসই প্রতিষ্ঠিত হয় তা হল মানবতা। এই মানবিক পরিশুদ্ধতায় মানুষ হয়ে ওঠে সৃষ্টির সেরা। প্রতিফলিত হতে থাকে সৃষ্টিকর্তার আকাক্সক্ষা। মানুষ বুঝতে পারে পুরো কায়ানাত সৃষ্টিকর্তা মানুষের জন্যই তৈরি করেছেন। আর মানুষকে তৈরি করেছেন সৃষ্টিকর্তার জন্য। তাইতো আল্লাহ পাক পবিত্র কুরআনে সুরা আয—যারিয়াতের ৫৬ নম্বর আয়াত এ বলেছেন “আমি জিন ও মানুষকে আমার ইবাদতের জন্যই সৃষ্টি করেছি”। অর্থাৎ রমজানের সিয়াম সাধনার মাধ্যমে মানব জাতি এমন একটি পরিশুদ্ধতায় রূপান্তরিত হয় যেখানে তার প্রত্যেকটি কর্মকান্ডই আল্লাহপাকের এবাদত হিসাবে গণ্য হয়। আর এজন্যই রমজানের শেষে পবিত্র ঈদের একটি মহা আনন্দ উদযাপিত হয়। এ আনন্দ শুধু আনুষ্ঠানিক ও সাময়িক নয়, এ আনন্দ মহান আল্লাহ পাকের ইচ্ছার প্রতিধ্বনি। তবে তা অবশ্যই পরিপূর্ণভাবে আল্লাহপাকের অনুশাসনের মধ্যেই হতে হবে। আমার প্রতিটি কাজই যখন আল্লাহর ইবাদত হবে, তখন অবশ্যই আমি কোন খাদ্যে ভেজাল দিতে পারবো না। আমার দ্বারা কখনোই ধনী গরিবের বৈষম্য তৈরি হবে না। আমার হাত দিয়ে কখনো কোন অন্যায় ফাইল সিগনেচার হবে না। আমার কর্মপরিকল্পনায় কখনোই কোন ধরনের অন্যায় হবে না। আমি কখনো ই সিন্ডিকেট করে কোন জিনিসপত্রের দাম বাড়াবো না। তাই আমার হাত, আমার পা, আমার চোখ, আমার জবান, আমার মস্তিষ্ক সমস্ত কিছুই আল্লাহপাকের স্মরণে থাকবে এবং আল্লাহ পাকের রেজাবন্দি হাসিলের জন্য সদা প্রস্তুত থাকবে, কোন অন্যায় কাজের জন্য নয়। এমনি মহৎ শিক্ষায় উদ্ভাসিত হোক ঈদের আনন্দ। ঈদ মোবারক।
লেখক :
অধ্যাপক ড. মো: গোলাম ছারোয়ার
শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট
পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/161320