একাত্তরের এইদিনে ‘আর সময় নেই’ শিরোনামে ঢাকার পত্রিকাগুলোর যৌথ সম্পাদকীয় প্রকাশ
স্টাফ রিপোর্টার : একাত্তরের ১৪ মার্চ ছিলো রোববার। অন্যদিকে দ্বিতীয় পর্যায়ের অসহযোগ আন্দোলনের সপ্তম দিন। ১৯৭১ সালের এই দিনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কাছ থেকে আসে ৩৫ দফা নতুন নির্দেশনা। এদিন সকালে ধানমণ্ডির বাসভবনে ন্যাপ নেতা আবদুল ওয়ালী খানের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠক করেন শেখ মুজিবুর রহমান। বৈঠক শেষে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমাদের সংগ্রাম স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিক হিসেবে বেঁচে থাকার সংগ্রাম। জনগণের সার্বিক স্বাধীনতা অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত এই সংগ্রাম চলবে।’
রাতে এক বিবৃতিতে সবাইকে অসহযোগ আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে ৩৫ দফা নির্দেশনা দেন তিনি। আগের দিন জারি করা ইয়াহিয়া খানের সামরিক ফরমানের প্রতিবাদে ঢাকায় মিছিল করেন প্রতিরক্ষা দফতরের বেসামরিক কর্মচারীরা। সম্পদ পাচার রোধের অংশ হিসেবে ঢাকার কয়েকটি স্থানে চেকপোস্ট বসায় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ।
চট্টগ্রাম সংগ্রাম পরিষদ সারা শহরে মিছিল করে। হাজার হাজার মুক্তিকামী মানুষের এই মিছিল প্রকম্পিত করে সারা চট্টগ্রাম শহর। আর ঢাকার পত্রিকাগুলো একটি যৌথ সম্পাদকীয় প্রকাশ করে, যার শিরোনাম ছিল- ‘আর সময় নেই’।
একাত্তরের এইদিনে স্বাধিকার আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করে ঢাকার কবি সাহিত্যিকরা লেখক সগ্রাম শিবির নামে একটি কমিটি গঠন করেন। হাসান হাফিজুর রহমানকে আহবায়ক এবং সিকান্দার আবু জাফর, আহমদ শরীফ, শওকত ওসমান, শামসুর রাহমান, বদরুদ্দিন উমর, রণেশ দাশগুপ্ত, সাইয়িদ আতীকুল্লাহ, বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, রোকনুজ্জামান খান, আবদুল গাফফার চৌধুরী, সুফিয়া কামাল, জহির রায়হান, আবদুল গনি হাজারীকে ওই কমিটির সদস্য করা হয়। মূলত: ওই কমিটি কয়েকদিন আগেই গঠিত হয় ১৪ মার্চ বিকেল পাঁচটায় বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে আহমদ শরীফের সভাপতিত্বে এক জরুরী সভা করে কমিটি প্রকাশ করা হয়। ওই সভায় বক্তৃতা করেন রণেশ দাশগুপ্ত, আলাউদ্দিন আল-আজাদ, বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, হাসান হাফিজুর রহমান, রাবেয়া খাতুন, আহমদ ছফা ও আরো কয়েকজন।
শুধু কবি সাহিত্যিক নন শিল্পীরাও পিছিয়ে ছিলেন না। মার্চের প্রথম থেকেই বেতার, টেলিভিশন, চলচ্চিত্র সব মাধ্যমের শিল্পীরাই অসহযোগ আন্দোলনে অংশ নিয়ে মিটিং, মিছিল, গণসঙ্গীতের অনুষ্ঠান করে আসছিলেন। ১৪ মার্চ বিভিন্ন শিল্পী সংস্থা থেকে প্রতিনিধি নিয়ে বিক্ষুব্ধ শিল্পী সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়। ওই পরিষদের সভাপতি হন আলী মনসুর, সম্পাদক সৈয়দ আবদুল হাদী, কোষাধ্যক্ষ লায়লা আর্জুমান্দ বানু। সদস্য হন মোস্তফা জামান আব্বাসী, জাহেদুর রহিম, ফেরদৌসী রহমান, বশির আহমেদ, খান আতাউর রহমান, বারীন মজুমদার, আলতাফ মাহমুদ, গোলাম মোস্তফা, কামরুল হাসান, অজিত রায়, হাসান ইমাম, কামাল লোহানী জি. এ. মান্নান, আবদুল আহাদ, সমর দাস, গহর জামিল, রাজ্জাক ও আরো অনেকে। বেতার ও টিতি কেন্দ্রে মিলিটারি কেন মোতায়েন করা হয়েছে এই প্রতিবাদে সোচ্চার হন বিক্ষুব্ধ শিল্পী সংগ্রাম পরিষদের সদস্যবৃন্দ।
১৯৭১ সালের ১৪ মার্চ প্রকাশিত দৈনিক ইত্তেফাকের প্রথম পাতার মূল খবরের শিরোনাম ছিল, ‘উস্কানিমূলক কার্যকলাপ বন্ধ করুন’। সামরিক কর্তৃপক্ষের নতুন নির্দেশের জবাবে ১৩ মার্চ সংবাদমাধ্যমে দেওয়া বিবৃতিতে শেখ মুজিবুর রহমান এই কথা বলেন।
একাত্তরের এইদিনে বঙ্গবন্ধুর অসহযোগ আন্দোলনের সমর্থনে সংবাদপত্র প্রেস কর্মচারী ফেডারেশনের উদ্যোগে সকালে বায়তুল মোকাররম প্রাঙ্গণে সমাবেশ শেষে মিছিলসহ বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে গিয়ে তার হাতে একটি আবেদনপত্র দেয়া হয়। তাতে নেতারা যে কোন নির্দেশ পালনের অঙ্গিকার ব্যক্ত করে অবিলম্বে একটি জাতীয় সরকার গঠন ও স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ ঘোষণার জন্য তার প্রতি অনুরোধ জানান।
এদিন করাচি নিশতার পার্কে আয়োজিত এক জনসভায় বক্তৃতাকালে পিপলস পার্টির চেয়ারম্যান জুলফিকার আলী ভুট্টো বলেন, ‘শেখ মুজিবুর রহমানের দাবি অনুযায়ী পার্লামেন্টের বাইরে সংবিধান সম্মত সমঝোতা ছাড়া ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হলে পশ্চিম ও পূর্ব পাকিস্তানের পৃথকভাবে দুইটি সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের কাছে হস্তান্তর করা হোক।’
জাতীয় লীগ নেতা আতাউর রহমান খান অস্থায়ী সরকার গঠনের জন্যে শেখ মুজিবুর রহমানকে আহ্বান জানান।
পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/161216