বিপজ্জনক রাসায়নিক থেকে খাদ্যপণ্য সুরক্ষা জরুরি
বাংলাদেশে খাদ্য নিরাপত্তা দীর্ঘদিন ধরেই একটি বড় ধরনের সমস্যা। বাংলাদেশ ফুড সেফটি অথরিটি (বিএফএসএ)-এর সর্বশেষ তথ্য হতে প্রমাণ মিলে যে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমরা এখনও ঠিক কতটা পিছিয়ে! বিএফএসএ-এর (২০২৪-২৫) অর্থবছরের তথ্য অনুযায়ী, পরীক্ষিত ১,৭১৩টি খাদ্য নমুনার মধ্যে ৫৭১টি, অর্থাৎ প্রায় ৩৩.৩ শতাংশ, ভেজাল, দূষিত অথবা পুষ্টিগুণে মানহীন বলে শনাক্ত হয়েছে। দৈনন্দিন ব্যবহৃত খাদ্যপণ্যের এত বড় একটি অংশ মৌলিক নিরাপত্তা ও গুণগত মানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হতে পারা নীতিনির্ধারক ও সাধারণ মানুষের জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়। সমীক্ষা অনুযায়ী, আচার, সস, চিপস, মুড়ি, ফলের পানীয়, ভোজ্যতেল, ডালডা ও মধু এসব নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য অনিরাপদ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। যার মধ্যে অনেক পণ্যই শিশুদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়, যা পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তোলে।
পরীক্ষায় দেখা গেছে, বাজারে পাওয়া চিপসের প্রায় ৬৫ শতাংশে বিপজ্জনক রাসায়নিক অ্যাক্রিলামাইড রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই রাসায়নিক দীর্ঘমেয়াদে মানবদেহে ক্যান্সারসহ গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। উদ্বেগজনক ব্যাপার হলো বেশ কয়েকটি নমুনায় অ্যাক্রিলামাইডের মাত্রা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার মান অতিক্রম করেছে। এছাড়াও ভোজ্যতেলে প্রয়োজনীয় ভিটামিন ‘এ’-এর ঘাটতি এবং সরিষার তেলে সয়াবিন তেল মেশানোর মতো ভেজাল প্রমাণ করে যে ভোক্তারা শুধু প্রতারিতই হচ্ছেন না, বরং গুরুতর ঝুঁকির মধ্যেও এগিয়ে যাচ্ছেন। বিএফএসএ-এর তথ্য বলছে, অনিরাপদ খাদ্য নমুনার হার দ্রুত বেড়েছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে যেখানে এটি ছিল ৮.৫ শতাংশ আর ২০২৩-২৪ সালে ছিল ১৫.৪ শতাংশে, আর এখন তা বেড়ে দ্বিগুণেরও বেশি হয়ে ৩৩ শতাংশ ছাড়িয়েছে। ফসল উৎপাদনে অতিরিক্ত সার ও কীটনাশকের ব্যবহার, গবাদিপশুতে হরমোন প্রয়োগ এবং নিরাপত্তার চেয়ে উৎপাদন বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া এসবই মূলত এর জন্য দায়ি।
গত বছর কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা সংক্রান্ত প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে উৎপাদিত ফসল ও সবজিতে ব্যাপকভাবে অত্যন্ত ক্ষতিকর কীটনাশক ব্যবহারের তথ্য উঠে আসে। যার মধ্যে FAO ও WHO কর্তৃক বিপজ্জনক হিসেবে চিহ্নিত করা ১৭টি কীটনাশকের ব্যবহার দেখা যায় যেগুলোর অনেকগুলো ক্যান্সার, স্নায়বিক সমস্যা ও দীর্ঘমেয়াদি অঙ্গহানির মতো সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে। এই ক্ষতিকর কীটনাশকগুলো বহু দেশে নিষিদ্ধ। তবে আমাদের দেশে এগুলোর অবাধ ব্যবহার স্পষ্টভাবে নিয়ন্ত্রক দুর্বলতা ও প্রয়োগে ব্যর্থতার দিকটি তুলে ধরে যার চূড়ান্ত মূল্য দিতে হচ্ছে জনস্বাস্থ্যকে। জনগণের চাহিদা পূরণের জন্য উৎপাদন বৃদ্ধিতে প্রযুক্তিগত উদ্যোগ প্রয়োজন হলেও, মানুষের স্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরি করে এমন কোন উদ্যোগ কখনো গ্রহণ যোগ্য নয়।
তাই সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত দেশের বাজারে প্রচলিত সব ধরনের খাদ্যপণ্য নিরাপদ কি না, তা নিশ্চিত করতে কঠোর ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা। খাদ্য নিরাপত্তা সংকট মোকাবিলায় পরিদর্শন ব্যবস্থার সক্ষমতা বৃদ্ধি, আইন লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রয়োগ এবং বিদ্যমান নিরাপত্তা মান বাস্তবে কতটা কার্যকর হচ্ছে তা নিবিড়ভাবে তদারক করা জরুরি। কেবল নীতিমালা প্রণয়ন নয়, মাঠপর্যায়ে তার কঠোর বাস্তবায়নই পারে কাক্সিক্ষত পরিবর্তন আনতে।
লেখক :
মিথিলা খাতুন
শিক্ষার্থী, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ,
সরকারি আজিজুল হক কলেজ।