তৃণমূল থেকে রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণী উচ্চতায়  মীর শাহে আলমের বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক পরিক্রমা

তৃণমূল থেকে রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণী উচ্চতায়  মীর শাহে আলমের বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক পরিক্রমা

বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে অনেক সময় দেখা যায়, অনেক নেতা আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা নিয়ে আবির্ভূত হন, আবার অনেকে নীরবে নিভৃতে কাজের মাধ্যমে নিজেদের অপরিহার্যতা প্রমাণ করেন। তবে যারা একেবারে তৃণমূলের ধূলিকণা মেখে, সাধারণ মানুষের সুখ—দুঃখের সাথী হয়ে ধাপে ধাপে জাতীয় রাজনীতির উচ্চাসনে আসীন হন, তাদের লড়াইটা হয় ভিন্নতর এবং অত্যন্ত অনুপ্রেরণামূলক। বাংলাদেশের বর্তমান রাজনীতিতে তেমনই এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের নাম মীর শাহে আলম। বর্তমানে তিনি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় (এলজিআরডি) মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তার এই রাজনৈতিক উত্থান কেবল একজন ব্যক্তির সাফল্য নয়, বরং এটি তৃণমূল রাজনীতিকদের মেধা, শ্রম ও জনঘনিষ্ঠতার এক সার্থক স্বীকৃতি। মীর শাহে আলমের রাজনৈতিক জীবনের শুরুটা ছিল একেবারেই সাধারণ মানুষের মধ্য থেকে। তিনি যখন শিবগঞ্জের আটমূল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে নিজের যাত্রা শুরু করেন, তখন তার বয়স ছিল মাত্র ২৩ বছর। তৎকালীন সময়ে দেশের অন্যতম কনিষ্ঠ জনপ্রতিনিধি হিসেবে তিনি যে দূরদর্শিতা এবং কর্মনিষ্ঠার পরিচয় দিয়েছিলেন, তা আজও বগুড়াবাসীর মুখে মুখে ফেরে। ইউনিয়ন পরিষদের একজন চেয়ারম্যান থেকে শুরু করে আজ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রতিমন্ত্রী হওয়ার মাঝখানের এই দীর্ঘ সময়টি ছিল নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রাম এবং সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জনের এক মহাকাব্য। একজন তৃণমূলের নেতা যখন রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আসেন, তখন তার মধ্যে বাস্তবতার প্রতিফলন অনেক বেশি থাকে। কারণ, তিনি জানেন গ্রামের মেঠো পথের সমস্যা কী, একজন সাধারণ কৃষকের হাহাকার কোথায় এবং স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে গেলে কোন কোন জায়গায় সংস্কার প্রয়োজন।

মীর শাহে আলমের রাজনৈতিক সফলতার অন্যতম চাবিকাঠি হলো তার অদম্য ধৈর্য এবং সংগঠনের প্রতি অবিচল আনুগত্য। তিনি কেবল একজন জনপ্রতিনিধিই নন, বরং একজন দক্ষ সংগঠক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। শিবগঞ্জ উপজেলা এবং বগুড়া জেলা পর্যায়ে রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিভিন্ন স্তরে কাজ করার সময় তিনি বারবার প্রমাণ করেছেন যে, জনগণের ভালোবাসা আর দলের প্রতি সততা থাকলে কোনো বাধাই স্থায়ী হয় না। তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা কেবল সভা—সেমিনারে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তিনি তা প্রয়োগ করেছেন প্রশাসনিক ক্ষেত্রেও। অতীতে বিআরটিসি এবং বিসিক এর পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করার সময় তার স্বচ্ছতা ও ত্বরিত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা ছিল চোখে পড়ার মতো। সে সময় তিনি দেখিয়েছিলেন কীভাবে একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানকে জনবান্ধব এবং লাভজনক করা সম্ভব। বগুড়া—২ (শিবগঞ্জ) আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়া এবং পরবর্তীতে এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়া মীর শাহে আলমের ক্যারিয়ারে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় এমন একটি বিভাগ, যা সরাসরি এদেশের গ্রামীণ অবকাঠামো, স্যানিটেশন, সুপেয় পানি এবং সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। মীর শাহে আলমের নিজের অতীত অভিজ্ঞতা যেহেতু ইউনিয়ন পরিষদ এবং উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে ছিল, তাই তিনি এই মন্ত্রণালয়ের অলিগলি খুব ভালোভাবেই চেনেন। তিনি জানেন যে, গ্রামীণ অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে হলে স্থানীয় সরকারকে আরও শক্তিশালী এবং স্বায়ত্তশাসিত করা প্রয়োজন। প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই তিনি সারা দেশের গ্রামীণ উন্নয়ন প্রকল্পের তদারকিতে ব্যক্তিগতভাবে মনোনিবেশ করেছেন, যা প্রশাসনের কার্যকারিতা বাড়াতে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে।

মীর শাহে আলমের রাজনীতির একটি বড় দিক হলো তার মানবিক গুণাবলি। তিনি কেবল একজন আদেশদাতা নেতা নন, বরং তিনি একজন ভালো শ্রোতাও। শিবগঞ্জের সাধারণ মানুষ তাকে ‘আপন মানুষ’ হিসেবে জ্ঞান করেন। ক্ষমতার কেন্দ্রে থেকেও তিনি তার শিকড়কে ভুলে যাননি। প্রতি সপ্তাহে তিনি নিজ নির্বাচনী এলাকায় যান, সাধারণ মানুষের কথা শোনেন এবং ব্যক্তিগত উদ্যোগেও অনেকের পাশে দাঁড়ান। একজন রাজনীতিবিদের সার্থকতা সেখানেই, যখন সাধারণ মানুষ তাকে ভয় পায় না, বরং ভালোবাসে এবং নির্ভয়ে নিজের সমস্যার কথা বলতে পারে। মীর শাহে আলম এই আস্থার জায়গাটি দীর্ঘ চার দশকের রাজনৈতিক পরিক্রমায় অর্জন করেছেন। তার রাজনৈতিক দর্শন মূলত উন্নয়ন ও শান্তি কেন্দ্রিক। তিনি মনে করেন, উন্নয়ন কেবল বড় বড় দালানকোঠা বা হাইওয়েতে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না, সেই উন্নয়নের সুফল যেন গ্রামের শেষ প্রান্তের মানুষটিও পায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে উত্তরবঙ্গের অবহেলিত জনপদ বগুড়ার উন্নয়নে তার বিশেষ পরিকল্পনা সবসময়ই লক্ষ্য করা যায়। বগুড়ায় একটি আধুনিক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন, বিমানবন্দর সচল করা এবং কৃষিনির্ভর শিল্পায়নের মাধ্যমে বেকারত্ব দূরীকরণে তার যে স্বপ্ন, তা বাস্তবায়নে তিনি নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন। মীর শাহে আলমের এই দীর্ঘ পরিক্রমা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তিনি কখনোই সংক্ষিপ্ত পথে সফল হতে চাননি। তিনি বিশ্বাস করেন তিল তিল করে গড়ে তোলা জনভিত্তিতে। আজকের এই অস্থির রাজনীতির যুগে যেখানে অনেকেই রাতারাতি বড় পদ পাওয়ার মোহে অন্ধ থাকেন, সেখানে মীর শাহে আলম এক উজ্জ্বল ব্যতিক্রম। তিনি প্রমাণ করেছেন যে, ধীরস্থিরভাবে কাজ করলে এবং সাধারণ মানুষের সাথে সংযোগ বিচ্ছিন্ন না করলে সফলতা আসবেই। তার এই সাফল্য আগামী দিনের তরুণ রাজনীতিকদের জন্য একটি বিশেষ বার্তা প্রদান করে যে রাজনীতি মানে কেবল ক্ষমতা নয়, রাজনীতি মানে মানুষের সেবা এবং ত্যাগের এক কঠিন পরীক্ষা। প্রতিমন্ত্রী হিসেবে মীর শাহে আলমের বর্তমান মেয়াদকাল দেশের পল্লী উন্নয়নে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামীণ জনপদগুলোর সুরক্ষা এবং ডিজিটাল বাংলাদেশ থেকে স্মার্ট বাংলাদেশের লক্ষ্য অর্জনে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে প্রযুক্তিবান্ধব করার যে চ্যালেঞ্জ তিনি নিয়েছেন, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। তার নেতৃত্বে এলজিআরডি মন্ত্রণালয় আরও গতিশীল হবে এবং প্রতিটি গ্রাম শহরে রূপান্তরিত হওয়ার পথে এক ধাপ এগিয়ে যাবে। পরিশেষে বলা যায়, মীর শাহে আলম কেবল একটি নির্দিষ্ট এলাকা বা দলের নেতা নন, তিনি বর্তমান বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির এক বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর। তৃণমূল থেকে সচিবালয় পর্যন্ত তার এই যাত্রা যেমন বর্ণাঢ্য, তেমনই তাৎপর্যপূর্ণ। মানুষের জন্য কাজ করার যে ব্রত নিয়ে তিনি রাজনীতিতে এসেছিলেন, সেই ব্রত যেন তিনি আমৃত্যু পালন করে যেতে পারেন এটাই আজকের দিনে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা। মীর শাহে আলমদের মতো অভিজ্ঞ ও জনবান্ধব নেতারা যত বেশি নীতি—নির্ধারণী পর্যায়ে আসবেন, দেশের সাধারণ মানুষের ভাগ্যোন্নয়ন তত বেশি ত্বরান্বিত হবে। তার রাজনৈতিক জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপ আগামীর সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার পথে এক একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হয়ে থাকবে।

 

লেখক :

মুহাম্মাদ মাছুদুর রহমান

প্রাবন্ধিক ও পিএইচডি গবেষক 
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/160727