জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা, কতটা প্রস্তুত বাংলাদেশ
বিশ্ব রাজনীতির মানচিত্রে মধ্যপ্রাচ্য বরাবরই অস্থিরতার এক কেন্দ্র। প্রাকৃতিক সম্পদের বিপুল ভাণ্ডার আর ভূরাজনৈতিক ক্ষমতার প্রতিযোগিতা এই অঞ্চলকে দীর্ঘদিন ধরেই বৈশ্বিক কৌশলগত হিসাব-নিকাশের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করেছে। ফলে যখনই মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ বা উত্তেজনা তৈরি হয়, তার প্রতিক্রিয়া আঞ্চলিক রাজনীতি ছাপিয়ে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে গভীর প্রভাব ফেলে। ১৯৭৩ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের পর সৃষ্ট বৈশ্বিক তেল সংকট, ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধ কিংবা পরবর্তী সময়ে এই অঞ্চলটিকে ঘিরে বিভিন্ন সামরিক সংঘাত বিশ্ব অর্থনীতিকে প্রতিবারই নাড়িয়ে দিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে আবারও সেই বাস্তবতা সামনে এসেছে।
ইরান যাতে পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী না হতে পারে সেটি নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই দেশটির রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও সামরিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ব্যাপক সামরিক হামলা চালায়। এর পর থেকেই দুই পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা চলতে থাকায় কার্যত মধ্যপ্রাচ্যে নতুন এক যুদ্ধ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, যা এখনো থামার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের পাশাপাশি গোটা বিশ্বেই কমবেশী অস্বস্থিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এই উত্তেজনার প্রভাব ইতোমধ্যেই বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি করেছে, যার প্রভাব আমদানিনির্ভর জ্বালানি অর্থনীতির দেশগুলোতে, বিশেষ করে বাংলাদেশের বাজারে পড়তে শুরু করেছে। ফলে স্বভাবতই আশঙ্কা জাগছে, জ্বালানি বাজারে এই অস্থিরতার মুখে বাংলাদেশের কতটা প্রস্তুতি রয়েছে? বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যবস্থার একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর ক্রমবর্ধমান আমদানিনির্ভরতা। এক সময় দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় পুরোটাই নির্ভর করত দেশীয় প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর। কিন্তু গত এক দশকে বিদ্যুতের চাহিদা দ্রুত বৃদ্ধি পেলেও নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার সেই অনুপাতে হয়নি। ফলে ঘাটতি পূরণের জন্য সরকারকে আমদানিকৃত জ্বালানির দিকে ঝুঁকতে হয়েছে। বর্তমানে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ আমদানিকৃত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি), ডিজেল ও ফার্নেস অয়েলের ওপর নির্ভর করছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ বছরে প্রায় ৬৫ লাখ মেট্রিক টনেরও বেশি জ্বালানি তেল ব্যবহার করে, যার বড় অংশই আমদানি করতে হয়। একইভাবে প্রাকৃতিক গ্যাসের ঘাটতি পূরণের জন্য এলএনজি আমদানিও ক্রমেই বাড়ছে। বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় ৮০০ থেকে ১০০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস আমদানিকৃত এলএনজি থেকে সরবরাহ করা হয়। অর্থাৎ দেশের জ্বালানি ব্যবস্থার একটি বড় অংশই এখন আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশ যদিও কাতার ও ওমানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি আমদানি চুক্তি করেছে, তবুও দেশের মোট চাহিদা পূরণের জন্য প্রায়ই স্পট মার্কেটের ওপর নির্ভর করতে হয়। কিন্তু পেট্রোবাংলা ও বিপিসি সূত্রে জানা গেছে, স্পট মার্কেট থেকেও এখন সাড়া পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে; আবার পাওয়া গেলেও তার দাম অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল অর্থনীতির দেশগুলোর জন্য জ্বালানি সংগ্রহ করা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। তাছাড়া, কাতারের রাষ্ট্রীয় জ্বালানি প্রতিষ্ঠান কাতারএনার্জি (ছধঃধৎঊহবৎমু) ২ মার্চ পেট্রোবাংলাকে একটি চিঠির মাধ্যমে জানিয়েছে যে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে তারা এলএনজি উৎপাদন বাধ্যতামূলকভাবে বন্ধ রেখেছে। অর্থাৎ যুদ্ধ পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে কাতার থেকেও এলএনজি প্রাপ্তি সহজ হচ্ছে না।
বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশব্যাপী ডিজেল, পেট্রল, অকটেন ও অন্যান্য জ্বালানি তেলের মজুদও ধীরে ধীরে কমে আসছে এবং নতুন সরবরাহ নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে। এরই মধ্যে গ্যাস ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা আরোপ, শিল্প খাতে সরবরাহ কমানো এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর মতো পদক্ষেপের আলোচনা শুরু হয়েছে। সরকার ইতোমধ্যেই গ্যাস রেশনিং শুরু করেছে এবং লোডশেডিংয়ের মাধ্যমে বিদ্যুৎ ব্যবস্থার চাপ কমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় জনগণকে সাশ্রয়ী ব্যবহারের আহ্বান জানিয়েছে, যেন সীমিত মজুদ দিয়ে সংকট মোকাবিলা করা যায়। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা দীর্ঘায়িত হলে তেলের দাম আরও বাড়তে পারে এবং বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতে ভর্তুকি রেকর্ড পরিমাণে বাড়তে পারে। জ্বালানি সংকটের সম্ভাব্য এই পরিস্থিতি বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। কারণ দেশের শিল্প উৎপাদন, রপ্তানি খাত, পরিবহন ব্যবস্থা এবং কৃষি প্রভৃতি খাতসমূহ জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্প, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান উৎস, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ ছাড়া স্বাভাবিকভাবে পরিচালিত হতে পারে না। ফলে জ্বালানি সরবরাহে সামান্য বিঘ্নও অর্থনীতির বৃহত্তর কাঠামোর ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এই পরিস্থিতি বাংলাদেশের জ্বালানি নীতির সীমাবদ্ধতাকেও সামনে এনেছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হলেও জ্বালানির নিজস্ব উৎস উন্নয়নের ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হয়নি। নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার, অফশোর অনুসন্ধান এবং বিকল্প জ্বালানি উন্নয়নের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ঘাটতি স্পষ্ট। এ বাস্তবতায় বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে জ্বালানি নিরাপত্তার একটি টেকসই কৌশল তৈরি করা। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার করা, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি করা এবং আঞ্চলিক জ্বালানি সহযোগিতা সম্প্রসারণ—এই বিষয়গুলোকে এখনই অগ্রাধিকার দিতে হবে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বঙ্গোপসাগরের অফশোর ব্লকগুলোতে আন্তর্জাতিক মানের অনুসন্ধান কার্যক্রম বাড়ানো গেলে নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। একইসঙ্গে সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি এবং বায়োমাসের মতো নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার দ্রুত সম্প্রসারণ করা সম্ভব হলে আমদানিনির্ভরতা কিছুটা কমানো সম্ভব। সবচেয়ে বড় কথা, জ্বালানি নিরাপত্তাকে শুধুই সরবরাহের বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি একদিকে যেমন জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন, অন্যদিকে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ভিত্তি। বৈশ্বিক অস্থিরতার যুগে যে দেশ তার জ্বালানি সরবরাহের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে, সেই দেশই দীর্ঘমেয়াদে টেকসই উন্নয়নের পথে এগিয়ে থাকতে পারবে। মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান উত্তেজনা বাংলাদেশের জন্য সাময়িক হলেও একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। এই সতর্কবার্তা থেকে শিক্ষা নিয়ে যদি এখনই জ্বালানি নীতিতে দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার না আনা হয়, তবে ভবিষ্যতে আরও বড় জ্বালানি সংকটের মুখোমুখি হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যাবে।
লেখক:
শাহিন আলম
সাবেক শিক্ষার্থী,
সলিমুল্লাহ মুসলিম হল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/160576