মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধে পাঁচ বাংলাদেশি নিহত

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধে পাঁচ বাংলাদেশি নিহত

করতোয়া ডেস্ক : মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতে এখন পর্যন্ত পাঁচ বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। এদের মধ্যে সিলেট, কিশোরগঞ্জ, টাঙ্গাইলে একজন করে এবং চট্টগ্রামের ২ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এরমধ্যে ১ জন করে দুবাই, কুয়েতে ও বাহরাইনে এবং সর্বশেষ রোববার সৌদি আরবে ২ জন নিহত হয়েছেন। সব ধরনের নিয়মনীতি মেনে পর্যায়ক্রমে তাদের লাশ দেশে আনা হবে বলে আশ্বস্ত করেছেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী।

আজ সোমবার (৯ মার্চ) দুপুরে সিলেট ওসমানী বিমানবন্দরে সংযুক্ত আরব আমিরাতে ইরানের ড্রোন হামলায় নিহত সালেখ উদ্দিন ওরফে আহমেদ আলীর মরদেহ গ্রহণকালে এ তথ্য জানান তিনি। এ সময় প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী যুদ্ধ পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের ধৈর্য ধরার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের যেখানেই ঘটনা ঘটেছে সেখানেই সরকার কাজ করছে।

এ সময় ওসমানী এয়ারপোর্টে উপস্থিত ছিলেন সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক, পুলিশ কমিশনারসহ নিহত আহমেদ আলীর স্বজনেরা উপস্থিত ছিলেন।

সৌদি আরবে মিসাইল হামলায় দুই বাংলাদেশি নিহত : সৌদি আরবে ইরানের মিসাইল হামলায় দুই প্রবাসী বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। নিহতরা হলেন- প্রবাসী বাংলাদেশি বাচ্চু মিয়া (৩৫) ও মো. মোশাররফ হোসেন (৪০)। রোববার সৌদি আরবের আল খারিজ শহরে আল তোয়াইক বলদিয়া কোম্পানির একটি শ্রমিক ক্যাম্পে মিসাইল বিস্ফোরণের ঘটনায় তারা নিহত হন।

নিহত বাচ্চু মিয়া কিশোরগঞ্জ জেলার কটিয়াদী উপজেলার জালালপুর ইউনিয়নের পশ্চিম ফেকামারা গ্রামের বাসিন্দা রইস উদ্দিনের ছেলে আর মোশাররফ হোসেন টাঙ্গাইলের সখীপুর উপজেলার কীর্ত্তনখোলা গ্রামের সুরজত আলীর ছেলে।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, বাচ্চু মিয়া দুই কন্যা সন্তানের জনক। তাদের মধ্যে একজন কন্যা মানসিক প্রতিবন্ধী। তার আকস্মিক মৃত্যুতে পরিবার ও এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। এদিকে, নিহত মোশাররফ হোসেনের পরিবার জানান, ৮ বছর আগে তিনি সৌদি আরব গেছেন।

দুই বছর আগে সর্বশেষ তিনি দেশে এসেছিলেন। মোশাররফের বড় ছেলে মাহিম (১৪) স্থানীয় একটি উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী এবং ছোট ছেলে মিহান মাদরাসার প্রথম শ্রেণিতে পড়ে। পারিবারিক ও প্রবাসী সূত্রে জানা গেছে, বাচ্চু মিয়া আল খারিজ শহরের ‘আল তোয়াইক বলদিয়া’ কোম্পানির একটি শ্রমিক ক্যাম্পে কর্মরত ছিলেন। রোববার ইফতারের ঠিক আগে সেখানে মিসাইল আঘাত হানে।

বর্তমানে মক্কা প্রবাসী ইমরান হুসাইন জানান, যে এলাকায় মিসাইল হামলার ঘটনা ঘটেছে, সেখানে একটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, সেই ঘাঁটি লক্ষ্য করেই হামলাটি চালানো হয়েছিল।

বাচ্চু মিয়া সৌদি আরব শাখা জামায়াতে ইসলামীর একজন কর্মী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। কটিয়াদী উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর আমীর অধ্যাপক মোজাম্মেল হক জোয়ারদার নিশ্চিত করেছেন যে, বাচ্চু মিয়া দেশে থাকাকালেও দলটির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। বাচ্চু মিয়ার অকাল মৃত্যুতে তার পরিবার ও নিজ এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। তার মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছেন স্বজনরা।

মোশাররফের বাড়িতে মাতম : অভাবের সংসারটা একটু ভালো করার স্বপ্ন নিয়ে ৮ বছর আগে সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছিলেন সখীপুর উপজেলার কীর্ত্তনখোলা গ্রামের মোশাররফ হোসেন (৪০)। আল খারিজ শহরের পাশে একটি কোম্পানিতে পরিচ্ছন্নতা কর্মীর কাজ করতেন তিনি; কিন্তু কর্মরত অবস্থায় ইরানের মিসাইল হামলায় থেমে গেল তার জীবন সংগ্রাম।

মোশাররফ হোসেনের বাবা মো. সূর্যত আলী। পরিবারে রয়েছে দুই ছেলে-বড় ছেলে মাহিম স্থানীয় একটি স্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্র এবং ছোট ছেলে মিহান প্রথম শ্রেণিতে পড়ে। তিন বছর আগে মাত্র তিন মাসের জন্য ছুটিতে দেশে এসেছিলেন তিনি।

এরপর আবার ফিরে গিয়েছিলেন সংসারের হাল ধরতে। মোশাররফের মৃত্যুর সংবাদ শোনার পর থেকেই শোকে ভেঙে পড়েছে পুরো পরিবার। মা জহুরা বেগম বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন। ছোট ছেলে মিহান নানার কোলে বসে অবাক দৃষ্টিতে চারপাশের মানুষের কান্না দেখছে-হয়তো এখনো বুঝে উঠতে পারেনি, তার বাবা আর কোনোদিন ফিরবেন না।

আজ সোমবার (৯ মার্চ) কীর্তনখোলা গ্রামে মোশাররফের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীদের ভিড়। বিশেষ করে নারীদের উপস্থিতি ছিল বেশি। বাড়িতে তার মা, একমাত্র বোন মোর্শেদা এবং স্ত্রী কবরী আক্তার কান্নায় ভেঙে পড়েছেন। প্রতিবেশী ও স্বজনেরা তাদের সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন।

রোববারও পরিবারের সঙ্গে কথা হয়েছিল। স্ত্রী কবরী আক্তার জানান, রাতে কথা হয়েছিল স্বামীর সঙ্গে। বলেছিলেন ঈদের জন্য টাকা পাঠাবেন, ছেলে দুটির জন্য কিছু কিনতে; কিন্তু কে জানতো সেই কথাই হবে শেষ কথা! রাত প্রায় ৩টার দিকে খবর আসে মোশাররফ হোসেন আর নেই। তিনি বিলাপ করে বলেন, এখন এই দুই সন্তান নিয়ে আমি কিভাবে চলব? আমাদের এখন কে দেখবে?

মোশাররফের বাবা সুজাত আলী বলেন, আমার ছেলেকে তো আর দেখতে পাব না। এখন অন্তত তার লাশটা দেশে ফেরত চাই। যেন শেষবারের মতো তাকে দেখতে পারি। দ্রুত লাশ দেশে আনার জন্য সরকারের কাছে অনুরোধ করছি। নিহতের বড় ছেলে মাহিম জানায়, রোববার রাত সাড়ে ৮টার দিকে বাবার সঙ্গে ভিডিও কলে কথা হয়। তখন তার বাবা বলেন, ঈদের কাপড়চোপড় কেনার জন্য যা লাগে তা কিনে নিতে। তিনি ইফতারের পর টাকা পাঠাবেন বলেও জানান। কিন্তু ইফতারের সময়ই ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় তার বাবা নিহত হন।

এদিকে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার আব্দুল্লাহ আল রনী। তিনি জানান, প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে দ্রুত মরদেহ দেশে আনার চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে।

একজন প্রবাসীর স্বপ্ন ছিল শুধু-পরিবারের মুখে হাসি ফোটানো। কিন্তু দূর প্রবাসে মিসাইলের আঘাতে থেমে গেল সেই স্বপ্ন, নিঃস্ব করে দিয়ে গেলো একটি পরিবারকে। আহমেদ আলীর পরিবারের পাশে থাকবে সরকার : শামা ওবায়েদ : ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধে দুবাইতে নিহত প্রবাসী বাংলাদেশি আহমেদ আলীর মরদেহ বাংলাদেশে এসে পৌঁছেছে।

আমিরাত এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে আজ সোমবার (৯ মার্চ) সকাল ৮টা ৫৫ মিনিটে বিমানটি ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। নিহতের স্বজনদের পাশাপাশি সরকারের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন প্রবাস কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর এবং পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ।

এ সময় পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী জানান, বাংলাদেশের নাগরিকদের নিরাপত্তা সরকারের কাছে সর্বোচ্চ গুরুত্বের বিষয়। আহমেদ আলীর পরিবারের পাশে থাকবে সরকার এবং প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হবে। ইরান-ইসরাইল যুদ্ধে আরও ১৪ জন আহত হয়েছেন। তাদের সর্বোচ্চ চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রবাস কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর।

মধ্যপ্রাচ্যের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা এড়িয়ে চলতে প্রবাসীদের অনুরোধ জানান তিনি। এয়ারপোর্টের সার্বিক কার্যক্রম শেষে অভ্যন্তরীণ বিমানযোগে মরদেহ নেওয়া হয় সিলেটের মৌলভীবাজারে। স্বজনরা জানান, আহমেদ আলী দীর্ঘদিন ধরে সংযুক্ত আরব আমিরাতের আজমান শহরে বসবাস করতেন। ইরানের ছোড়া একটি ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি তিনি নিহত হন। পরিবারের সদস্যরা জানান, গ্রামের বাড়িতে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে সমাহিত করা হবে।

শোক প্রকাশ সরকারের : মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধে সৌদি আরবের আল-খারজ গভর্নরেটে বিমান হামলায় দুই বাংলাদেশি নিহত ও আরও কয়েকজন আহত হওয়ার ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ সরকার। এ অঞ্চলে নিরীহ বাংলাদেশি বেসামরিক নাগরিকদের প্রাণহানি অব্যাহত থাকা গভীর উদ্বেগের বিষয় বলে উল্লেখ করেছে সরকার। আজ সোমবার (৯ মার্চ) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

বাংলাদেশ নিরীহ মানুষের প্রাণহানি ঘটায় এমন সব ধরনের হামলার তীব্র নিন্দা জানায় এবং সংশ্লিষ্ট সবপক্ষকে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানায়। একই সঙ্গে পরিস্থিতি প্রশমনে এবং প্রাণহানিরোধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে জরুরি ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ। বিবৃতিতে বলা হয়, মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত বাংলাদেশি নাগরিকদের নিরাপত্তা ও কল্যাণকে বাংলাদেশ সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয় এবং চলমান পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।

কুয়েতে বিস্ফোরণের ঘটনায় বাংলাদেশি যুবক নিহত : এর আগে কুয়েতে বিস্ফোরণের ঘটনায় এক প্রবাসী বাংলাদেশি যুবক মারা গেছেন। নিহত ওই যুবকের নাম জাহেদ হোসেন (৩০)। তিনি চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা কামাল উদ্দিনের ছেলে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছে নিহত জাহেদ হোসেনের সহকর্মী লুৎফুর রহমান। তিনি জানান, বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় বেলা ১১টার দিকে কুয়েতের সালমি এলাকার মরু অঞ্চলে একটি বিস্ফোরণের ঘটনায় তার মৃত্যু হয়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বাংলাদেশের কিছু গণমাধ্যমে ইরানি মিসাইল বিস্ফোরণে তার মৃত্যু হয়েছে বলে জানানো হলেও স্থানীয় প্রবাসীদের দাবি, ইরাক-কুয়েত যুদ্ধের সময় মরুভূমিতে পোঁতা একটি ল্যান্ডমাইন বিস্ফোরণে জাহেদের মৃত্যু ঘটে।

তার আগে আসে আরও ২ বাংলাদেশি নিহতের খবর : মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতে আরব উপসাগরীয় বিভিন্ন দেশে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ঘটনায় দুই বাংলাদেশি নাগরিক নিহত এবং আরও সাতজন আহত হন বলে গত সোমবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, নিহতদের মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতের আজমানে সিলেটের বড়লেখার বাসিন্দা সালেহ আহমেদ আছেন।

তিনি নাগরিক স্থাপনায় আকাশ থেকে নেমে আসা ধ্বংসাবশেষে আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন। এছাড়া, বাহরাইনে নিহত চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ উপজেলার আজিমপুর ইউনিয়নের মোহাম্মদ তারেক (৪৮)। তিনি একটি ড্রাইডক শিপইয়ার্ডে ডিউটিকালীন সময়ে ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ একটি জাহাজের উপর পড়লে তিনি মারা যান। এ ঘটনায় আরও ৩ বাংলাদেশি আহত হয়েছেন।

কুয়েতে ড্রোন হামলায় আহত চারজন বাংলাদেশি হলেন নবীনগরের আমিনুল ইসলাম (ব্রাহ্মণবাড়িয়া), সাথিয়ার রাবিউল ইসলাম (পাবনা), বেগমগঞ্জের মাসুদুর রহমান (নোয়াখালি) ও চাঁদিনার দুলাল মিয়া (কুমিল্লা)। তারা প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা গ্রহণ করেছেন এবং বর্তমানে স্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছেন।

পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/160539