নারী শিক্ষা: বৈষম্যমুক্ত আগামীর সন্ধানে অ্যাডভোকেসি ডায়ালগ অনুষ্ঠিত

নারী শিক্ষা: বৈষম্যমুক্ত আগামীর সন্ধানে অ্যাডভোকেসি ডায়ালগ অনুষ্ঠিত

আন্তর্জাতিক নারী দিবস ২০২৬ উপলক্ষ্যে রাজধানীতে অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘মেয়েদের শিক্ষার প্রতিবন্ধকতা দূরীকরণ’ বিষয়ে এক বিশেষ অ্যাডভোকেসি ডায়ালগ। “আজকের পদক্ষেপ, আগামীর ন্যায়বিচার; সুরক্ষিত হোক নারী ও কন্যার অধিকার” প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে বিশেষজ্ঞ ও নীতিনির্ধারকরা নারীর শিক্ষা অর্জনে সকল বাধা দূর করতে নতুন কৌশলগত রূপরেখা প্রণয়নের আহ্বান জানান।

মালালা ফান্ডের অর্থায়নে এবং জাগো ফাউন্ডেশন ট্রাস্টের বাস্তবায়নে পরিচালিত “অদম্য (ODOMMO)” প্রকল্পের আওতায় এই সংলাপ আয়োজন করা হয়। কিশোরগঞ্জ জেলার হাওড়বেষ্টিত মিঠামইন উপজেলায় ৪০ মাসের এই প্রকল্পটির সফল বাস্তবায়ন শেষে আয়োজিত এই সংলাপে সরকারি প্রতিনিধি, নাগরিক সমাজ, উন্নয়ন সংস্থা, শিক্ষা খাতের বিশেষজ্ঞ, নারী প্রতিনিধি, বেসরকারি খাত এবং এডুকেশন চ্যাম্পিয়ন নেটওয়ার্ক–এর সদস্যরা অংশগ্রহণ করেন।

অনুষ্ঠানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্ব ছিল “শিক্ষায় বৈষম্য দূরীকরণে বাংলাদেশের জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের মেয়েদের ক্ষমতায়ন” শীর্ষক প্যানেল আলোচনা। প্যানেল আলোচনায় ইউনিসেফ বাংলাদেশের চাইল্ড প্রটেকশন অফিসার ফাতেমা খায়রুন্নাহার বলেন, “জলবায়ুজনিত দুর্যোগের সময় সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপ বেড়ে যাওয়ায় অনেক পরিবার মেয়েদের শিক্ষার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারে না, ফলে শিশুবিবাহ, শিশুশ্রম এবং স্কুল থেকে ঝরে পড়ার ঝুঁকি বাড়ে।”

তিনি আরও বলেন, “এধরনের পরিস্থিতিতে কমিউনিটি-ভিত্তিক শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থা ও সমন্বিত সামাজিক উদ্যোগ মেয়েদের শিক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।”

মোশাররফ তানসেন, স্বতন্ত্র পরামর্শক এবং মালালা ফান্ডের সাবেক কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তন শুধু একটি পরিবেশগত সংকট নয়—এটি সামাজিক ন্যায়বিচারের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, যা সরাসরি মেয়েদের শিক্ষার সুযোগকে প্রভাবিত করে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশের জন্য জরুরি হলো জলবায়ু অভিযোজন কৌশল, শিক্ষা নীতি এবং জেন্ডার সমতার লক্ষ্যগুলোকে সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন করা। একই সঙ্গে স্থানীয় কমিউনিটিকে ক্ষমতায়ন, প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা জোরদার করা এবং মাঠপর্যায়ের তথ্য ও অভিজ্ঞতাকে নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করাই টেকসই পরিবর্তন নিশ্চিত করার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপায়।”

প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের পরিচালক (ইনফ্লুয়েন্সিং, ক্যাম্পেইন অ্যান্ড কমিউনিকেশনস) নিশাত সুলতানা বলেন, “যেকোনো পরিস্থিতি ও বাস্তবতায় প্রথম বাধার শিকার হয় নারী। জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশে মেয়েদের শিক্ষা নিশ্চিত করতে হলে জাতীয় নীতি, বাজেট ও উন্নয়ন পরিকল্পনায় বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। একই সঙ্গে সামাজিক ধ্যানধারণা পরিবর্তনে দীর্ঘমেয়াদি যোগাযোগ কৌশল গ্রহণ এবং জনসম্পৃক্ত ক্যাম্পেইনের প্রয়োজন রয়েছে।”

আলোচনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী পূজা দেবনাথ বলেন, “জলবায়ু অভিযোজন কৌশল এবং মেয়েদের শিক্ষা ও জেন্ডার সমতার লক্ষ্যগুলোর মধ্যে আরও কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন। মাঠ পর্যায়ের তথ্য, গবেষণা এবং যুবসমাজের অভিজ্ঞতাকে নীতিনির্ধারণী আলোচনায় যুক্ত করা হলে বাস্তবসম্মত সমাধান খুঁজে পাওয়া সহজ হবে।” আলোচনায় উঠে আসে যে, জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ প্রত্যন্ত অঞ্চলে শিক্ষার সুযোগ সীমিত হওয়ায় মেয়েরা নানা সামাজিক ও অর্থনৈতিক ঝুঁকির মুখে পড়ে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসন, উন্নয়ন সংস্থা এবং কমিউনিটির সমন্বিত উদ্যোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

মহিলা ও শিশু বিষয়ক অধিদপ্তরের প্রকল্প কর্মকর্তা হালিমা প্রেমা বলেন, “জাগো ফাউন্ডেশন যে কাজটি অদম্য প্রকল্পের মাধ্যমে করেছে, তা আসলে সরকারের করার কথা ছিল। মালালা ফান্ড এগিয়ে এসেছে, এবং এই প্রভাব রাখতে সহযোগিতা করেছে। আমরা আশা করব এই কাজগুলো ভবিষ্যতেও চালিয়ে যাওয়া হবে।”

বাংলাদেশের হাওরাঞ্চলের অন্যতম জেলা কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের মেয়েদের শিক্ষা অর্জনে বিদ্যমান সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিত করা এবং সম্ভাব্য সমাধান নিয়ে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আলোচনার লক্ষ্যেই এই সংলাপের আয়োজন করা হয়। বৈচিত্র্যময় ভূপ্রকৃতি ও প্রাকৃতিক ঐশ্বর্যের জন্য পরিচিত কিশোরগঞ্জ জেলা। তবে নারী শিক্ষা, বাল্যবিবাহ, নারী ও শিশু নির্যাতন এবং সামাজিক বৈষম্যের বিভিন্ন সূচকে অঞ্চলটি এখনও পিছিয়ে রয়েছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় জাগো ফাউন্ডেশন ট্রাস্ট গত কয়েক বছর ধরে মিঠামইন উপজেলায় “অদম্য” প্রকল্পের মাধ্যমে কাজ করে আসছে।

“অদম্য” প্রকল্পের উদ্যোগের ফলে মিঠািমইন অঞ্চলে গত তিন বছরে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা গেছে। নির্ধারিত ২৩টি কার্যক্রমের মধ্যে ২১টি সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে, যা মোট পরিকল্পিত কার্যক্রমের প্রায় ৯১ শতাংশ। প্রকল্প এলাকার শিক্ষার্থীদের মধ্যে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ বিষয়ে সচেতনতা বেড়েছে প্রায় ৪৩.৯২ শতাংশ, মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে সচেতনতা বেড়েছে ২৪.৩৪ শতাংশ, এবং জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধ বিষয়ে সচেতনতা বেড়েছে ২২.৭৫ শতাংশ। একই সময়ে প্রকল্প এলাকায় মেয়েদের বিদ্যালয়ে ভর্তি বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ২০ শতাংশ। নানাবিধ সচেতনতা বৃদ্ধিমূলক কার্যক্রমের ফলে ৮৮ শতাংশ পরিবার এখন মেয়েদের শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে, এবং ৭০ শতাংশ মানুষ সরাসরি মেয়েদের শিক্ষার পক্ষে সামাজিক সহায়তা প্রদান করছেন। উল্লেখ্য যে, মিঠামইনের হাজী তাইয়েব উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়ে বর্তমানে মেয়েদের ঝরে পড়ার হার শূন্যে নেমে এসেছে, আর ঘাগড়া আব্দুল গনি উচ্চ বিদ্যালয়ে ২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে মেয়েদের ঝরে পড়ার হার ৬১ শতাংশ কমেছে। এছাড়া ১৫ জনের বেশি ঝরে পড়া শিক্ষার্থী পুনরায় বিদ্যালয়ে ফিরে এসেছে। প্রকল্পের সফলতা নিয়ে কথা বলেন জাগো ফাউন্ডেশন ট্রাস্টের এডুকেশন চ্যাম্পিয়ন কামরুল কিবরিয়া অয়ন। তিনি বলেন, “আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি শিক্ষা পৃথিবী পরিবর্তনের সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার। এটি শুধু ব্যক্তিগত ক্ষমতায়ন নয়, বরং সমগ্র সমাজের অগ্রগতি নিশ্চিত করার অন্যতম ভিত্তি। আমরা এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে চাই যেখানে প্রতিটি শিশু—বিশেষ করে মেয়েরা—নির্ভয়ে তাদের স্বপ্ন অনুসরণ করতে পারে।”

জাগো ফাউন্ডেশন ট্রাস্টের প্রোগ্রাম ইমপ্লিমেন্টেশন ডিপার্টমেন্টের সিনিয়র ম্যানেজার ইফতিখার উল করিম বলেন, “মিঠামইনের মতো প্রত্যন্ত অঞ্চলে মানসম্মত শিক্ষার সুযোগ সীমিত হলেও ‘অদম্য’ প্রকল্প মেয়েদের শিক্ষার পক্ষে সামাজিক সচেতনতা তৈরি, নিরাপদ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার পরিবেশ গড়ে তোলা এবং শিক্ষাবান্ধব নীতির পক্ষে অ্যাডভোকেসি জোরদারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।”

আয়োজনে অংশগ্রহণকারীরা জানান, মেয়েদের জন্য নিরাপদ, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা হলে একটি ন্যায়ভিত্তিক ও সমতাপূর্ণ সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব হবে। “অদম্য” প্রকল্প থেকে প্রাপ্ত অভিজ্ঞতা ও সফলতা বাংলাদেশের সামাজিক পরিবর্তনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে কাজ করবে বলে আশা প্রকাশ করেন বক্তারা।

পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/160344