বগুড়ার শেরপুরে আলুর বাম্পার ফলনেও বড় ধরণের লোকসানে কৃষক

বগুড়ার শেরপুরে আলুর বাম্পার ফলনেও বড় ধরণের লোকসানে কৃষক

শেরপুর (বগুড়া) প্রতিনিধি : বগুড়ার শেরপুরে আলুর বাম্পার ফলন হলেও বাজারে দাম কম হওয়ায় কৃষকদের পথে বসার উপক্রম হয়েছে। মাঠভরা ফসল দেখে যে আশা বেঁধেছিলেন শেরপুরের কৃষকরা, তা এখন রূপ নিয়েছে হতাশায়। বাজারে ৬থেকে ৮ টাকা কেজি দরে আলু বিক্রি হচ্ছে। ফলে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে ফলানো ফসলে লাভের মুখ তো দূরের কথা, বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েছেন তারা।

উপজেলার কুসুম্বি ইউনিয়নের খিকিন্দা, কেল্লা, আমন, দক্ষিণ আমন, চণ্ডেশ্বর, উত্তর পেঁচুল, আকরামপুর ও মির্জাপুর ইউনিয়নের মাখাইলচাপড়, তালতাসহ একাধিক গ্রাম এখন আলুর তোলার কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষক-কৃষানীরা। মাঠের মধ্যে আলুর স্তূপ কিন্তু পাইকারি বাজারে দামে ধস নামায় কৃষকের মাথায় হাত।

বর্তমান বাজারদর ও উৎপাদন খরচের হিসাব কষে দেখা যাচ্ছে, বিঘাপ্রতি কৃষকের লোকসান দাঁড়াচ্ছে প্রায় ২০ হাজার টাকা। উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে শেরপুরে আলু চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২ হাজার ৫০০ হেক্টর, যা ছাড়িয়ে আবাদ হয়েছে ২ হাজার ৭৮০ হেক্টর জমিতে।

আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবার যে আলু তোলা হয়েছে তাতে বিঘা প্রতি গড়ে ১২০ মণ ফলন হয়েছে। কিন্তু ফলন ভালো হলেও দাম বিপর্যয়ে কৃষকরা দিশেহারা। বর্তমানে জমিতেই প্রতি কেজি আলু বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৬ থেকে ৮ টাকায়। মির্জাপুর ইউনিয়নের জাহাঙ্গীর ইসলাম, আইয়ুব আলী নামের কৃষকদের দেওয়া তথ্য মতে, এক বিঘা জমিতে সার, কীটনাশক, সেচ, শ্রমিক ও অন্যান্য খরচ মিলিয়ে ব্যয় দাঁড়ায় ৪০ থেকে ৪৫ হাজার টাকা। যারা জমি লিজ নিয়ে চাষ করেছেন, তাদের অতিরিক্ত টাকা গুনতে হয়।

বর্তমান দরে আলু বিক্রি করে প্রায় ২০ হাজার টাকা প্রতি বিঘায় লোকসান হচ্ছে। কৃষক আকবর, রফিক, আসাফসহ আরও একাধিক কৃষক বলেন, ছোট কৃষকরাই বেশি মরে। ২ থেকে ৫ বিঘা জমিতে আলু করেছি। এখন যে দাম, তাতে বিক্রি করলে অর্ধেক লস। আমাদের সংরক্ষণের সুযোগ কম, আজ দাম ৬-৮ টাকা। এত কষ্ট করে চাষ করে লাভ কী?

গত বছর আলুতে বড় ধরনের লোকসান দিয়েছিলেন উপজেলার কৃষকরা। মির্জাপুর ইউনিয়নের মাথাইল চাপড় গ্রামের কৃষক জাহাঙ্গীর হোসেন গতবার ১৫০ বিঘা জমিতে চাষ করে ৪০ লাখ টাকা লোকসান দেন। সেই ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার আশায় এবারও তিনি বড় পরিসরে আবাদ করেছিলেন। কিন্তু এবারও একই পরিণতি। তারা আরো ন্যায্য মূল্য না পাওয়া গেলে ঋণের বোঝা এখন গলার ফাঁস দাড়াবে।

টুনিপাড়া গ্রামের কৃষক লিটন বলেন, দাম যাই হোক, জমি তো খালি করতে হবে। আলু তুলেই ধান লাগাতে হবে, তাই লস দিয়েই বিক্রি করছি। আলু সংরক্ষণে হিমাগারের ভাড়াও এবার বেড়েছে। গত বছর প্রতি বস্তা সংরক্ষণে ১৮০ টাকা লাগত, যা এবার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২২০ টাকায়। পরিবহন খরচসহ যা প্রায় ৩০০ টাকার কাছাকাছি।

শেরপুর ও ভবানিপুরের হিমাগারগুলোতে আলু সংরক্ষণ শুরু হলেও সাধারণ কৃষকদের অনেকেই অর্থাভাবে হিমাগারমুখী হতে পারছেন না। এ বিষয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ফারজানা আকতার বলেন, আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবার আলুর বাম্পার ফলন হয়েছে।

দাম না থাকায় কৃষক ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। তবে মাঠ পর্যায়ের কৃষকদের দাবি, রপ্তানির আশ্বাসের চেয়ে জরুরি এখন বাজার নিয়ন্ত্রণ। সরকার যদি এখনই ধানের মতো আলুরও ন্যায্য মূল্য নির্ধারণ ও ক্রয়ের উদ্যোগ না নেয়, তবে আগামী মৌসুমে আলু চাষে আগ্রহ হারাবেন হাজারো কৃষক।

পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/159835