জৈব কৃষি বনাম কর্পোরেট এগ্রিকালচার

জৈব কৃষি বনাম কর্পোরেট এগ্রিকালচার

মানুষের থালা ভরা খাবারের পেছনের গল্পটা এখন আর কেবল কৃষকের ঘাম আর মাটির ঘ্রাণে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি হয়ে দাঁড়িয়েছে বহুজাতিক কোম্পানির মুনাফার অংক আর বিশ্বরাজনীতির এক জটিল দাবার চাল। একদিকে আছে হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী ও প্রকৃতির সাথে মিতালি করা ‘জৈব কৃষি’, আর অন্যদিকে দাঁড়িয়ে আছে প্রযুক্তিনির্ভর, পেটেন্ট-চালিত ‘কর্পোরেট এগ্রিকালচার’। এই দুই বিপরীতমুখী ধারার সংঘাত এখন আর কেবল চাষ পদ্ধতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি এখন খাদ্যের সার্বভৌমত্ব, পরিবেশের ভারসাম্য এবং মানবস্বাস্থ্যের ওপর আধিপত্য বিস্তারের এক দীর্ঘস্থায়ী লড়াই। 

বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে যখন ‘সবুজ বিপ্লব’-এর জয়ধ্বনি শোনা গিয়েছিল, তখন কর্পোরেট এগ্রিকালচারকে দেখা হয়েছিল বিশ্ব ক্ষুধার একমাত্র সমাধান হিসেবে। উচ্চ ফলনশীল বীজ, রাসায়নিক সার আর কীটনাশকের ব্যবহার উৎপাদনকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু এর বিনিময় মূল্য হিসেবে আমাদের হারাতে হয়েছে মাটির স্বাভাবিক উর্বরতা। কর্পোরেট এগ্রিকালচারের মূল দর্শন হলো ‘মনোকালচার’ বা একক ফসলের চাষ এবং সর্বোচ্চ মুনাফা। এখানে বীজ এখন আর কৃষকের সম্পদ নয়, বরং বহুজাতিক কোম্পানির ‘ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি’ বা মেধা সম্পদ। একবার বীজ কিনে চাষ করার পর কৃষক আর সেই বীজ সংরক্ষণ করতে পারেন না, প্রতিবারই তাকে কোম্পানির দুয়ারে হাত পাততে হয়। এই যে বীজের ওপর কৃষকের অধিকার কেড়ে নেওয়া, এটিই হলো এই বৈশ্বিক সংঘাতের সবচেয়ে অন্ধকার দিক।

অন্যদিকে, জৈব কৃষি কেবল একটি চাষপদ্ধতি নয়, এটি একটি জীবনদর্শন। এটি মাটিকে একটি জীবন্ত সত্তা হিসেবে বিবেচনা করে এবং রাসায়নিকের পরিবর্তে প্রকৃতির নিজস্ব চক্রের ওপর ভরসা রাখে। জৈব কৃষির সমর্থকরা মনে করেন, কর্পোরেট কৃষি আমাদের সাময়িক প্রাচুর্য দিলেও দীর্ঘমেয়াদে বাস্তুসংস্থানকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। ক্ষতিকারক কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ আমাদের রক্তপ্রবাহে মিশে গিয়ে তৈরি করছে ক্যানসারের মতো মরণব্যাধি। কিন্তু সমস্যা হলো, পুঁজিনির্ভর এই বিশ্বে জৈব কৃষিকে প্রায়ই ‘অলাভজনক’ বা ‘বিলাসিতা’ হিসেবে তকমা দেওয়া হয়। অথচ প্রকৃত সত্য হলো, কর্পোরেট কৃষির পেছনে দেওয়া বিশাল অংকের সরকারি ভর্তুকি সরিয়ে নিলে জৈব কৃষির অর্থনৈতিক সক্ষমতা অনেক বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠত। এই সংঘাতের মাঠ এখন বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা থেকে শুরু করে প্রতিটি দেশের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে বিস্তৃত। বহুজাতিক কোম্পানিগুলো লবিংয়ের মাধ্যমে এমন সব আইন প্রণয়ন করছে, যাতে দেশীয় ও স্থানীয় বীজের জাতগুলো ক্রমান্বয়ে হারিয়ে যায়। তারা প্রলোভন দেখাচ্ছে জেনেটিক্যালি মডিফাইড বা জিএমও ফসলের, যা পোকা মাকড় প্রতিরোধী বলে দাবি করা হলেও আদতে মাটির অণুজীব ও জীববৈচিত্র্যের জন্য এক নীরব ঘাতক। কর্পোরেট এই আগ্রাসনের ফলে কৃষক আজ তার নিজের জমিতেই পরনির্ভরশীল এক শ্রমিকে পরিণত হয়েছে। তার নিজের কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা নেই; তাকে ল্যাবরেটরিতে তৈরি করা ফর্মুলা অনুযায়ীই চাষবাস করতে হচ্ছে। তবে আশার কথা হলো, বিশ্বজুড়ে সচেতন মানুষের মধ্যে এখন ‘ফুড সলিডারিটি’ বা খাদ্য সংহতির ধারণা জনপ্রিয় হচ্ছে। মানুষ এখন বুঝতে পারছে যে, সস্তা খাবার মানেই নিরাপদ খাবার নয়। ইউরোপ থেকে শুরু করে লাতিন আমেরিকা পর্যন্ত ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষকরা কর্পোরেট শৃঙ্খল ভেঙে জৈব কৃষিতে ফিরতে শুরু করেছেন। এটি কেবল বিষমুক্ত খাবারের লড়াই নয়, এটি নিজের সংস্কৃতির শেকড়ে ফেরার লড়াই। কর্পোরেট এগ্রিকালচার যখন পৃথিবীকে একটি বড় বাজার বানাতে চায়, জৈব কৃষি তখন পৃথিবীকে একটি টেকসই বাগান হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখে।

এই বৈশ্বিক সংঘাতের সমাধান কেবল তাত্ত্বিক তর্কে নেই, আছে আমাদের প্রতিদিনের খাদ্য নির্বাচনে। আমরা কি সেই ব্যবস্থার অংশ হব যা মাটিকে বিষাক্ত করে আর কৃষকের সার্বভৌমত্ব কেড়ে নেয়? নাকি আমরা তাকে সমর্থন দেব যা জীবন ও প্রকৃতির সজীবতাকে টিকিয়ে রাখে? প্রযুক্তির আধুনিকতাকে অস্বীকার না করে যদি তাকে জৈব কৃষির মূল দর্শনের সাথে মেলানো যেত, তবেই হয়তো এই সংঘাতের এক মানবিক সমাধান মিলত। তবে যতক্ষণ পর্যন্ত মুনাফা জীবনের চেয়ে বড় হয়ে থাকবে, ততক্ষণ এই অসম লড়াই চলতেই থাকবে।

 

লেখক

হেনা শিকদার

শিক্ষার্থী, দর্শন বিভাগ 
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/159730