ইফতারের পর ক্লান্তি, গ্লুকোজ স্পাইক ও মারাত্মক ঝুঁকি

ইফতারের পর ক্লান্তি, গ্লুকোজ স্পাইক ও মারাত্মক ঝুঁকি

আমাদের দেশে প্রায় সকল মানুষের ইফতারের পর মারাত্মক ক্লান্তি ও ঘুম ঘুম লাগে। এই বিষয়টি সবার কাছে স্বাভাবিক মনে হয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে পোস্টপ্রান্ডিয়াল সমনোলেন্স বলা হয়ে থাকে। এটা শুধুমাত্র রমজান মাসেই যে হয় এমনটা না, যে কোন সময় উচ্চ কার্বোহাইড্রেট যুক্ত খাবার খাওয়ার পর এমন ক্লান্তিভাব দেখা যায়। গবেষণা ও মানবদেহের ফিজিওলজি অনুযায়ী এর পেছনে মূলত আমাদের খাদ্যাভ্যাস এবং শরীরের পরিপাকতন্ত্রের কিছু জৈব-রাসায়নিক ক্রিয়া দায়ী। আমাদের দেশের ইফতারে সাধারণত সাধারণ শর্করা এবং চিনি ও তেলজাতীয় খাবার বেশি থাকে (যেমন: শরবত, মিষ্টি দই,  জিলাপি, পিঁয়াজু, বেগুনি)। দীর্ঘক্ষণ না খেয়ে থাকার পর হঠাৎ এই ধরনের খাবার খেলে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা খুব দ্রুত বেড়ে যায় (যাকে গ্লুকোজ স্পাইক বলা হয়)। গ্লুকোজের এই আকস্মিক বৃদ্ধি সামাল দিতে অগ্ন্যাশয় প্রচুর পরিমাণে ইনসুলিন হরমোন নিঃসরণ করে। ইনসুলিন খুব দ্রুত গ্লুকোজকে রক্ত থেকে সরিয়ে কোষে প্রবেশ করায়, যার ফলে রক্তে শর্করার মাত্রা আবার হঠাৎ করেই দ্রুত কমে যায় (যাকে রিঅ্যাক্টিভ হাইপোগ্লাইসেমিয়া বলা হয়)। শর্করার এই আকস্মিক পতনের কারণেই শরীর এনার্জি হারিয়ে মারাত্মক ক্লান্ত হয়ে পড়ে।
স্বাভাবিকভাবে এই ক্লান্তি খুব সাধারণ মনে হলেও এর রয়েছে মারাত্মক দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতিকর দিক। গ্লুকোজের এই দ্রুত ওঠানামার প্রভাবে শরীরে একটি এনজাইমবিহীন জৈব-রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটে, যাকে গ্লাইকেশন বলা হয়। স্বাভাবিক অবস্থায় আমাদের শরীরের প্রোটিন এবং লিপিডগুলো তাদের নিজস্ব নিয়মে কাজ করে। কিন্তু রক্তে যখন গ্লুকোজের মাত্রা হঠাৎ করে খুব বেড়ে যায়, তখন এই অতিরিক্ত গ্লুকোজ অণুগুলো কোনো এনজাইমের সাহায্য ছাড়াই রক্তে থাকা প্রোটিনের অ্যামিনো গ্রুপ অথবা লিপিডের সাথে যুক্ত হয়ে যায়। এই স্বতঃস্ফূর্ত প্রক্রিয়াটিকেই গ্লাইকেশন বলা হয়। এই গ্লাইকেশনের প্রভাবে শরীরে মারাত্মক ক্ষতিকর কিছু পরিবর্তন দেখা দেয়। গ্লাইকেশনের ফলে শরীরের প্রোটিন অণুগুলোর মধ্যে অস্বাভাবিক বন্ধন (ক্রস-লিংক) বা জট তৈরি হয়। এর ফলে কোলাজেন এবং ইলাস্টিনের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রোটিনগুলো তাদের স্থিতিস্থাপকতা হারিয়ে শক্ত হয়ে যায়। 

খাওয়ার পর কিছুক্ষণ ক্লান্তি খুব স্বাভাবিক মনে হলেও এর ক্ষতিকর প্রভাব আমরা ইতোমধ্যে জানলাম। খুব সহজে এই ক্ষতির মূল গ্লুকোজ স্পাইক রোধ করা সম্ভব। কিন্তু আমাদের না জানা বা জেনেও অবহেলার কারণে তা করা হয়ে ওঠে না। ইফতার বা যেকোনো বেলায় খাওয়ার পর গ্লুকোজ স্পাইক রোধ করা যায় খুব ছোট কয়েকটা ধাপ অনুসরণ করেই। আমাদের দেশে ইফতারের বেশিরভাগ খাবারই চিনিযুক্ত বা শর্করা সমৃদ্ধ। এই শর্করা সমৃদ্ধ খাবারই গ্লুকোজ স্পাইক ঘটায়। তাই লিকুইড গ্লুকোজ যেমন শরবত, মিষ্টি দই, বোরহানি, মাঠা, কোমল পানীয় ইত্যাদি খাবার গ্রহণ থেকে বিরত থাকতে হবে। আমাদের ইফতারে ডুবো তেলে ভাজা খাবারে থাকে ট্রান্স ফ্যাট, যা রক্তে কোলেস্টেরল বাড়িয়ে দিয়ে হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। তাই ভাজাপোড়াও  পরিহার করতে হবে। বাংলাদেশে অধিকাংশ মানুষের খাবারে প্রয়োজনের তুলনায় কম প্রোটিন, ফাইবার ও ভিটামিন থাকে। এতে আমাদের শরীরে প্রোটিনের ঘাটতি তো থাকেই, পাশাপাশি গ্লুকোজ স্পাইকও দ্রুত হয়। কারণ শর্করার সাথে প্রোটিন ও ফাইবার বেশি গ্রহণ করলে তা খাবার পরিপাক প্রক্রিয়াকে কিছুটা ধীর করে। প্রোটিন ও ফাইবার আমাদের পাকস্থলীতে একটি জালির মতো বাধা তৈরি করে, তাই গ্লুকোজ একটু ধীরে রক্তে প্রবেশ করে। সঠিক ক্রমানুসারে খাবার গ্রহণ করলেও গ্লুকোজ স্পাইক রোধ করা সম্ভব। খাবারের প্রথমে ভাত বা শর্করা জাতীয় খাবার না খেয়ে ফাইবার যুক্ত খাবার (যেমন: শাকসবজি), তারপর প্রোটিন (যেমন: মাছ-মাংস, ডাল, পনির, সয়া) এবং সবশেষে শর্করা জাতীয় খাবার খেলে গ্লুকোজ স্পাইকের সম্ভাবনা অনেকটাই কমে যায়। এছাড়াও খাবারের আগে সামান্য পরিমাণ ভিনেগার (১০-২০ মিলি) খেলেও তা শর্করা শোষণকে ধীর করে গ্লুকোজ স্পাইক কমিয়ে দেয়।

খাবার ও খাবার খাওয়ার ধরন ছাড়াও আরেকটি উপায়ে গ্লুকোজ স্পাইক রোধ করা সম্ভব। তা হলো খাবারের পরে খুব সামান্য শারীরিক ব্যায়াম। খাবারের পর সামান্য ব্যায়াম করলে শরীরের মাংসপেশিগুলো সক্রিয় হয় ও রক্তের গ্লুকোজ প্রাকৃতিকভাবেই মাংসপেশিতে ব্যবহৃত হয়। এতে কোনো ইনসুলিনের প্রয়োজন হয় না। খাবারের পরে এই ব্যায়ামের ফলে দুই ধরনের লাভ পাওয়া যায়। এতে গ্লুকোজ স্পাইক হয় না ও ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের সম্ভাবনা কমে যায়। এর জন্য অনেক বেশি পরিশ্রমের কোনো ব্যায়ামের প্রয়োজন নেই। খাবার পরে ৫-১০ মিনিট হাঁটাহাঁটি, কাফ রেইজ বা স্কোয়াট করে এই সুফল পাওয়া সম্ভব। সামান্য কিছু অভ্যাসগত পরিবর্তনের মাধ্যমে আমরা দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক ঝুঁকি থেকে মুক্ত থাকতে পারি। তাই রমজান মাসে ইফতারে বা সারাবছর যেকোনো খাবারের সময় ও খাবারের পরে এই ছোট অভ্যাসগত পরিবর্তনের মাধ্যমে আমরা নিজেরা ও আমাদের পরিবারকে দীর্ঘমেয়াদি বিভিন্ন জটিল রোগ থেকে দূরে রাখতে পারি।

লেখকঃ  

শেখ সৈকত

সাবেক শিক্ষার্থী, ফার্মেসী বিভাগ,
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। 

পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/158982