অনিরাপদ রান্নাঘর ও যাত্রাপথ: ঘর ও বাহন যখন ‘এক একটি টাইম বোমা’

অনিরাপদ রান্নাঘর ও যাত্রাপথ: ঘর ও বাহন যখন ‘এক একটি টাইম বোমা’

গত ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬; তারিখটি চট্টগ্রামের হালিশহরবাসীর জন্য আরও একটি বিভীষিকাময় দিন হিসেবে ক্যালেন্ডারে ঠাঁই নিল। হালিশহরের সেই ‘হালিমা মঞ্জিল’-এ যখন ভোরের আলো ফোটার কথা, তখন সেখানে দাউদাউ করে জ্বলে উঠল আগুনের লেলিহান শিখা। গ্যাস লাইনের লিকেজ থেকে জমে থাকা গ্যাসে এক নিমেষেই পুড়ে গেল একটি পরিবারের স্বপ্ন, হাসপাতালে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন শিশুসহ নয় জন। চট্টগ্রামের পাথরঘাটা থেকে শুরু করে ঢাকার মগবাজার কিংবা নারায়ণগঞ্জের তিতাস গ্যাসের বিস্ফোরণ—ঘটনাগুলো ভিন্ন ভিন্ন হলেও এদের নেপথ্যের কারিগর কিন্তু একই: অবহেলা আর অব্যবস্থাপনা।


গৃহকোণে ওৎ পেতে থাকা মৃত্যু:

গত এক বছরে বাংলাদেশে বাসাবাড়িতে গ্যাস সিলিন্ডার ও পাইপলাইন বিস্ফোরণে নিহতের সংখ্যা কয়েকশ ছাড়িয়েছে। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট অগ্নিকাণ্ডের একটি বড় অংশই ঘটছে ত্রুটিপূর্ণ গ্যাস সংযোগের কারণে। হালিশহরের ঘটনাটি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, আমরা আমাদের প্রিয়জনদের নিয়ে আসলে এক একটি আগ্নেয়গিরির ওপর বাস করছি।

রান্নাঘরে গ্যাস সিলিন্ডারের হোস পাইপ ফেটে যাওয়া, মেয়াদোত্তীর্ণ রেগুলেটর ব্যবহার করা কিংবা গ্যাসের গন্ধ পাওয়ার পরও অবহেলা করা—এই ছোট ছোট ভুলগুলোই বড় ট্র্যাজেডির জন্ম দিচ্ছে। তিতাস বা কর্ণফুলী গ্যাস কর্তৃপক্ষের পাইপলাইনের সংস্কার কাজে দীর্ঘসূত্রতা এবং গ্রাহক পর্যায়ে গ্যাস শনাক্তকরণ যন্ত্র (Gas Detector) ব্যবহারের অভাব এই বিপদকে আরও ঘনীভূত করছে।

সড়কের চলন্ত ‘টাইম বোমা’:

রান্নাঘরের আতঙ্ক যদি ঘরে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে সড়কের চিত্র আরও ভয়ংকর। বর্তমানে বাংলাদেশে চলাচলকারী কয়েক লাখ সিএনজিচালিত যানবাহন মূলত এক একটি চলন্ত বোমা। গত ছয় মাসের পরিসংখ্যান ঘাঁটলে দেখা যায়, মহাসড়কে বাস বা লেগুনা বিস্ফোরণে দগ্ধ হওয়ার হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে।

বিস্ফোরক পরিদপ্তরের আইন অনুযায়ী, যানবাহনের প্রতিটি গ্যাস সিলিন্ডার প্রতি পাঁচ বছর অন্তর ‘রি-টেস্টিং’ বা পরীক্ষা করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু বাস্তবতা হলো, দেশের অর্ধেকের বেশি যানবাহনের সিলিন্ডার মেয়াদোত্তীর্ণ। অনেক সময় দেখা যায়, সাশ্রয়ের নামে পুরনো সিলিন্ডার কেটে জোড়াতালি দিয়ে ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলে সামান্য সংঘর্ষ বা ওভারহিটিং-এর কারণে সিলিন্ডার ফেটে মুহূর্তের মধ্যে পুরো যানটি জ্বলন্ত কফিনে পরিণত হচ্ছে।

তদারকির অভাব ও দায়বদ্ধতা:

বিস্ফোরক পরিদপ্তর এবং বিআরটিএ-র মতো নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলোর চরম শৈথিল্য আজ জনজীবনকে হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। বাজারে যে এলপিজি (LPG) সিলিন্ডারগুলো সরবরাহ করা হচ্ছে, তার গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন তোলার অবকাশ আছে। অনেক অসাধু ব্যবসায়ী পুরনো সিলিন্ডারকে নতুন করে রং করে বাজারজাত করছে, যা দেখার যেন কেউ নেই। হালিশহরের ঘটনায় যারা দগ্ধ হলেন, তাদের চিকিৎসার ভার কে নেবে? সেই অবহেলার দায়ভার কি রাষ্ট্র বা সংশ্লিষ্ট গ্যাস সরবরাহকারী সংস্থা এড়াতে পারে?

মুক্তির পথ: প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ: একটি নিরাপদ সমাজ গঠনে কেবল রাষ্ট্রের দিকে চেয়ে থাকলে চলবে না, প্রয়োজন নাগরিক সচেতনতা ও কঠোর আইন প্রয়োগের সমন্বয় ।

নিয়মিত পরিদর্শন: প্রতিটি গ্যাস সরবরাহকারী সংস্থাকে নিয়মিত বিরতিতে গ্রাহকদের পাইপলাইন এবং যানবাহনের সিলিন্ডার পরীক্ষা করার একটি অটোমেটেড সিস্টেম চালু করতে হবে।

মেয়াদোত্তীর্ণ সিলিন্ডার বাজেয়াপ্ত: রাস্তায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে মেয়াদোত্তীর্ণ সিলিন্ডারবাহী যানবাহন চিহ্নিত করে তাৎক্ষণিক ডাম্পিং-এর ব্যবস্থা করতে হবে।

ভেন্টিলেশন ও প্রযুক্তি: রান্নাঘরে পর্যাপ্ত বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা রাখা এবং অল্প খরচে ‘গ্যাস লিকেজ অ্যালার্ম’ ব্যবহারের ওপর জোর দিতে হবে।

গণমাধ্যম ও শিক্ষা: পাঠ্যবই ও গণমাধ্যমে গ্যাস ব্যবহারের নিরাপত্তা নির্দেশিকা নিয়ে আরও বেশি প্রচার চালাতে হবে।

হালিশহরের বিস্ফোরণে দগ্ধ শিশুদের আর্তনাদ আজ প্রতিটি সচেতন নাগরিকের হৃদয়ে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। উন্নয়ন মানে কেবল মেট্রোরেল বা ফ্লাইওভার নয়, উন্নয়ন মানে প্রতিটি নাগরিকের ঘরে ও যাত্রাপথে জীবনের নিশ্চয়তা। আমরা চাই না আর কোনো হালিশহর বা পাথরঘাটা ট্র্যাজেডি। রাষ্ট্রকে বুঝতে হবে, জীবনের চেয়ে সিলিন্ডারের রি-টেস্টিং ফি বা সংস্কার কাজ বড় নয়। সময় এখনই সচেতন হওয়ার, নতুবা আগুনের এই গ্রাস একদিন আমাদের সবার দরজায় কড়া নাড়বে।

হাসান মো: শাব্বির
সাংবাদিক ও প্রাবন্ধিক।

পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/158980