নানা সমস্যায় স্থবির হয়ে পড়েছে বুড়িমারী বন্দরের ব্যবসা-বাণিজ্য
লালমনিরহাট প্রতিনিধি : লালমনিরহাটের পাটগ্রামে ত্রিদেশীয় বুড়িমারী স্থলবন্দরে স্থান সংকট, জরাজীর্ণ মহাসড়কসহ নানা সমস্যার কারণে স্থবির হয়ে পড়েছে এ বন্দরের ব্যবসা-বাণিজ্য। এবস্থায় ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে মালামাল আনা-নেওয়ার সড়ক ছয় লেন করার দাবি উঠেছে।
জানা গেছে, লালমনিরহাটের পাটগ্রামে ১৯৮৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়া ভারত, নেপাল, ভুটান ত্রিদেশীয় বাণিজ্যের অন্যতম দ্বিতীয় বৃহত্তম স্থলবন্দর বুড়িমারী। তবে বন্দর ইয়ার্ডে স্থান সংকটের পাশাপাশি মহাসড়ক প্রশস্ত না হওয়ায় বন্দর ঘিরে পণ্যবাহী ট্রাকের যানজটের কারণে এ বন্দরে অপার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও ব্যবসায়ী, ট্রাকচালক, পাসপোর্টধারী যাত্রীসহ সাধারণ মানুষের চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট বন্দর সূত্রে জানা যায়, বন্দরটি মাত্র ১১.১৫ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত। স্থলবন্দরের তিনটি শেডের ধারণক্ষমতা ১ হাজার ৭৬৮ টন এবং তিনটি ওপেন স্টাক ইয়ার্ডের ধারণক্ষমতা ছয় হাজার ২০৩ টন। প্রতিদিন ভারত, ভুটান থেকে ৩২০টিরও বেশি পণ্যবাহী ট্রাক বাংলাদেশে প্রবেশ করে এবং বাংলাদেশ থেকে অন্তত শতাধিক ট্রাক ছেড়ে যায়।
তবে স্থান সংকট হওয়ায় বর্তমানে প্রতিদিন ৪‘শ থেকে ৫‘শ টি ট্রাক বন্দর ও কাস্টমসের দ্রুত আইনি প্রক্রিয়া শেষ করে ছাড়পত্র প্রদান করে কর্তৃপক্ষ। ফলে এসব ট্রাক বুড়িমারী টু লালমনিরহাট মহাসড়কের জিরো পয়েন্ট টু ঘুন্টি বাজার পর্যন্ত প্রায় তিন কিলোমিটার মহাসড়কে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়।
কিন্তু ১০৫ কিলোমিটার দীর্ঘ ও ১৮ ফুট চওড়া এ মহাসড়কটি প্রশস্ত না হওয়ায় তীব্র যানজট ও দুর্ঘটনা নিত্যদিনের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। বুড়িমারী স্থলবন্দরে অবকাঠামোগত উন্নয়নে বিশ্বব্যাংকের আর্থিক সহায়তায় ‘স্থানীয় জমির মালিকদের কাছ থেকে’ প্রকল্পের মাধ্যমে ৪০ একরের বেশি জমি অধিগ্রহণের কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়।
এর মধ্যে সাত একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে এবং ১৮ একরের বেশি খাস জমি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। তবে স্থানীয়দের সঙ্গে ১৩ একর জমির বনিবনা না হওয়ায় পুরো প্রকল্পের কাজ থমকে আছে। এতে জমি অধিগ্রহণ এবং বন্দরের উন্নয়ন কাজ দুটোই পিছিয়ে যাচ্ছে।
বুড়িমারী স্থলবন্দরের ব্যবসায়ীরা জানান, মহাসড়কটি চার বা ছয় লেন করার দাবি জানাই, সরকার কোটি কোটি রাজস্ব নিচ্ছে অথচ মহাসড়কটি এত ছোট যে, আমাদের ব্যবসা করতে সমস্যা হচ্ছে। এর মধ্যে ভুটানের পরীক্ষামূলক ট্রান্সশিপমেন্ট পণ্য চালান আরো নতুন মাত্রায় ব্যবসার পরিধি বাড়লেও মহাসড়ক উন্নীত না করায় তারা ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
ট্রাকচালক আকমল বলেন, বন্দরেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় নষ্ট হয়। রাস্তা ছোট হওয়ায় ওভারটেক করতে গেলে গাড়ি খাদে পড়ে যাওয়ার ভয় থাকে। সরকার দ্রুত রাস্তাটির দিকে নজর দিলে ব্যবসা-বাণিজ্য আরো বাড়বে।
অপার সম্ভাবনার এ বুড়িমারী স্থলবন্দর বাংলাদেশ ও ভুটানের মধ্যে ২০২৩ সালের ২২ মার্চ স্বাক্ষরিত চুক্তি ও প্রটোকলের আওতায় প্রথম পরীক্ষামূলক ট্রান্সশিপমেন্ট পণ্য চালানের ট্রায়াল রান সফল হওয়ায় এবং দ্রুতই রাস্তা ফোর লেন করলে শ্রমিকদের লোড-আনলোড, সিএন্ডএফ এজেন্টদের ব্যবসা বৃদ্ধি, বন্দর এলাকার বিভিন্ন গুদাম ভাড়া সব মিলিয়ে বন্দরে আবার প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে আসবে বলে মনে করছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা।
এবিষয়ে কথা হলে বুড়িমারী স্থলবন্দরের সহকারী পরিচালক (ট্রাফিক) মাহমুদুল হাসান বলেন, জায়গার অভাবে বন্দরে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। তবে ৪০ একর জমি অধিগ্রহণের প্রকল্প চলমান আছে। এ প্রকল্পের আওতায় প্যাসেঞ্জার টার্মিনাল ও সড়কের কাজ হবে। তখন আর কোনো গাড়ি রাস্তার ওপর থাকবে না। বন্দরের কাজ দ্রুতই শুরু হবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।
এদিকে বুড়িমারী স্থল শুল্ক স্টেশনের (কাস্টমস) সহকারী কমিশনার দেলোয়ার হোসেন বলেন, বুড়িমারী স্থলবন্দরের যে বর্তমান এক্সিস্টিং অবকাঠামো আছে সেটা আসলে প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। এ স্থলবন্দরের যে আয়তন সেটা যদি বৃদ্ধি করা হয় এবং বুড়িমারী থেকে রংপুর পর্যন্ত যে সড়ক আছে সেটা যদি বৃদ্ধি করে চার লেনে উন্নীত করা হয় তাহলে আমদানি-রপ্তানিকারকরা পণ্য আমদানি করতে আগ্রহ প্রকাশ করবে। একই সঙ্গে সরকারের রাজস্ব আয় বহুলাংশে বৃদ্ধি পাবে বলেও আশা করেন তিনি।
কথা হলে লালমনিরহাট সড়ক ও জনপদ অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী আজহারুল ইসলাম বলেন, এটি একটি জাতীয় মহাসড়ক। ৩২টি বাঁকের মধ্যে ১৬টির প্রস্তাবনা অনুমোদন হয়েছে। আমরা পুরো রাস্তাটি অন্তত ২৪ ফুট বা প্রয়োজন হলে ফোর লেন করার জন্য ডিজাইন ও প্রকল্প তৈরির পরিকল্পনা করছি। তবে প্রক্রিয়াগত কারণে কাজে কিছুটা ধীরগতি রয়েছে। আশা করছি আর বেশি সময় লাগবে না।
পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/158930