আগুন থেকে সুন্দরবনকে রক্ষা করতে হবে
দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলকে যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় মাতৃস্নেহে আগলে রাখে সুন্দরবন। ফলে ঝড়-ঝাপটায় উপকূলীয় অঞ্চলে বসবাসরত মানুষের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কম হয়। সাম্প্রতিক সময়ে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে বার বার আঘাত হানছে ঘূর্ণিঝড়। আর বিগত কয়েক বছর ধরে এসব ঘূর্ণিঝড়ের গতিবেগ কমিয়ে দিয়ে উপকূলকে সুরক্ষা দিচ্ছে সুন্দরবন। কিন্তু উপকূলীয় জনপদ টিকিয়ে রাখা বিশ্ব ঐতিহ্যের সুন্দরবন এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। সুন্দরবনের প্রাণ-প্রকৃতি আজ হুমকির মুখে। বিশেষ করে অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের কারণে সুন্দরবন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বৃক্ষনিধন, বন্যপ্রাণী হত্যা, পাচারসহ নানা ধরনের অনৈতিক কাজে এ শ্রেণির মানুষ জড়িয়ে পড়ছে। এছাড়া একশ্রেণির মৌয়াল বা জেলের অসাবধানতা কিংবা অতিলোভী মানসিকতার ফলে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হচ্ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে সুন্দরবনে বেশ কয়েকটি স্থানে আগুন লাগার ঘটনা ঘটেছে। সবশেষ সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের চাঁদপাই রেঞ্জের ধানসাগর স্টেশনের কলমতেজী টহল ফাঁড়ির টেপার বিলে আগুন লাগে। যে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে বন বিভাগ, ফায়ারসার্ভিস এবং স্থানীয় প্রায় অর্ধ শতাধিক স্বেচ্ছাসেবক রাতভর একযোগে কাজ করেছেন। আগুন লাগার স্থান থেকে পানির উৎস বেশ কিছুটা দূরে থাকায় আগুন নেভাতে এই বেগ পেতে হয়েছে। পরেরদিন আবার পার্শ্ববর্তী ধানসাগর টহল ফাঁড়ির তেইশের ছিলা এলাকায় ফের আগুন লাগে। কিন্তু বার বার সুন্দরবনে আগুন লাগছে পিছনে কোন নির্দিষ্ট কারণ আছে কি না তা তদন্তে বের হয়ে আসছে না। সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশ পূর্ব ও পশ্চিম এ দুই ভাগে বিভক্ত। গত ২৩ বছরে ২৭ বার আগুনের ঘটনা ঘটেছে সুন্দরবনে। কাকতালীয় হলেও সত্য যে, আগুন লাগার সবগুলো ঘটনাই ঘটেছে পূর্ব সুন্দরবন এলাকায়। এছাড়া নানা কারণে বাঘের মৃত্যুর যে খবর পাওয়া যায় তার বেশিরভাগ পূর্ব সুন্দরবন রেঞ্জে। এজন্য সুন্দরবন সুরক্ষায় পূর্ব সুন্দরবন রেঞ্জের সক্ষমতা বাড়ানো খুব জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমাদের নিজেদের বেঁচে থাকার প্রয়োজনে, উপকূলীয় জনপদকে টিকিয়ে রাখতে যেকোনো মূল্যে আগুন প্রতিরোধ করে সুন্দরবনকে বাঁচাতে হবে।
বিশেষ করে আমাদের সমাজের একশ্রেণির মানুষ জীবন-জীবিকার জন্য সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল। বছরের একেকটি মৌসুমে মৌয়াল, কাঠুরিয়া এবং জেলেরা সুন্দরবনে প্রবেশ করে। সরকারিভাবে অনুমতি নিয়েই তারা সুন্দরবনে যায়। যদিও প্রতি বছর কিছু সংখ্যক বনজীবীদের পাওয়া যায়; যারা নিয়মবহির্ভূতভাবে সুন্দরবনে যায়। এখন কথা হচ্ছে, যখনই সুন্দরবনে আগুন লাগে তখনই একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। নির্দিষ্ট একটি সময় বেধে দিয়ে কি কারণে সুন্দরবনে আগুন লেগেছে তার কারণ চিহ্নিত করতে বলা হয়। কিন্তু বেশিরভাগ সময় দেখা যায়, সেসব প্রতিবেদন আলোর মুখ দেখে না। পড়ে থাকে অন্ধকারে। এজন্য বছরের পর বছর চলে যায় তবুও এর প্রকৃত কারণ উদঘাটন করা সম্ভব হয় না। আবার অনেক সময় আগুন প্রতিরোধ করে সুন্দরবনকে বাঁচাতে সকল প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে কিছু সুপারিশের কথা উঠে আসলেও তা আর বাস্তবায়িত হয় না।
সূত্র বলছে, গত ২৩ বছরে সুন্দরবনে যেসব অগ্নিকান্ড ঘটেছে তার মধ্যে ১৫টির বেশি তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে ‘অসাবধানতাবশত বনজীবীদের ফেলে যাওয়া আগুনের’ বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু বার বার সুন্দরবনের সংরক্ষিত অংশে আগুন লাগার বিষয়টি শুধু তাদের ওপর দায় দিয়ে এড়িয়ে যাওয়া কতটা যুক্তিযুক্ত– সে প্রশ্ন থেকেই যায়। কারণ সবশেষ সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের ধানসাগর স্টেশনের কলমতেজী টহল ফাঁড়ির টেপার বিলে যেখানে আগুন লেগেছে সেখানে মানুষের চলাচলের পথ পাওয়া গেছে। এছাড়া গরু ছাগলের মল-মুত্রও সেখানে দেখা গেছে। এতে সহজেই বোঝা যায়, সংরক্ষিত বনাঞ্চলে মানুষের অবাধ বিচরণ রয়েছে। তাহলে এসব অবৈধ প্রবেশকারীদের ঠেকাতে বন বিভাগ কি পদক্ষেপ গ্রহণ করে? আগুন লাগার ঘটনাকে ঘিরে স্থানীয়দের কেউ কেউ বলেন, বর্ষা মৌসুমে জাল দিয়ে মাছ ধরতেই বনে আগুন দেয় অনেক অসাধু মানুষ। তাদের জন্যই সুন্দরবন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাহলে শুধু বনজীবীদের ওপর দোষ দিয়ে যে সুন্দরবনকে রক্ষা করা যাবে না– এটা অনেকটা নিশ্চিতভাবে বলা যায়। এজন্য বন বিভাগের দায়সারা কাজ থেকে বেরিয়ে এসে সুন্দরবনের আগুন প্রতিরোধে আরো সর্তক অবস্থান নেওয়া প্রয়োজন।
আমরা দেখেছি, আগুন লাগার ঘটনাকে কেন্দ্র করে তদন্ত কমিটিতে বন সংশ্লিষ্ট উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাসহ অনেকের রাখা হয়। কিন্তু এসব কমিটিতে রাখা দরকার স্টেকহোল্ডার বা যারা পেশাগত কারণে প্রতিনিয়ত বনে যাওয়া-আসা করে। তারাই প্রকৃত কারণ খুঁজে বের করতে সবথেকে সক্ষম জনগোষ্ঠী। কিন্তু আমাদের গতানুগতিক তদন্ত কমিটিতে তাদেরকে উপেক্ষা করা হয়। তাই সুন্দরবনকে বাঁচাতে সরকারকে অবশ্যই সুপরিকল্পিতভাবে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। সেক্ষেত্রে অবশ্যই বনজীবীদের আরো সচেতন করে তুলতে হবে; যাতে করে তাদের ফেলে আসা আগুনে পরবর্তীতে অগ্নিকান্ডের ঘটনা না ঘটে। বনের মনিটরিং কার্যক্রম বাড়ানোর পাশাপাশি অতিলোভী মানসিকতার মানুষ যারা নিজেদের ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের জন্য বনে বনের ভিতরে গিয়ে অসৎপথ অবলম্বন করে তাদেরকে আইনের আওতায় আনতে হবে। আর বিশেষ করে বন বিভাগের উদাসীনতা কাটিয়ে উঠে আরো বেশি দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। যাতে সুন্দরবনে আগুন লাগা বা বন ধ্বংসের কোন কিছু ঘটলে এলাকাবাসীর থেকে জানা-শোনার আগে বন বিভাগের টহলকারী টিম নিজেরা দেখতে পায় এবং পদক্ষেপ নিতে পারে। আমরা আশা রাখি, সুন্দরবনের প্রাণ-প্রকৃতি বাঁচাতে আগুন প্রতিরোধে সরকার সময়োপযোগী যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ করবে।
লেখক
রিয়াদ হোসেন
শিক্ষার্থী, সরকারি বিএল কলেজ, খুলনা।
পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/158855