কেন এই মাসের নাম ‘রমজান’ রাখা হলো?
রমজান শব্দটির উৎপত্তি নিয়ে একটি প্রসিদ্ধ কথা প্রচলিত আছে। বলা হয়, আরবরা যখন প্রাচীন ভাষা থেকে মাসগুলোর নাম গ্রহণ করেছিল, তখন তারা সেই সময়ের প্রকৃতি ও আবহাওয়ার সঙ্গে মিল রেখে নামকরণ করেছিল।
যে মাসে প্রচণ্ড গরম পড়েছিল, সেই মাসটির নাম রাখা হয়েছিল ‘রমজান’। ‘রমজ’ ধাতুর অর্থই হলো তীব্র উত্তাপ বা দহন। ঐতিহাসিকভাবে এই বক্তব্য পুরোপুরি প্রমাণিত হোক বা না হোক, শব্দটির মূল অর্থের সঙ্গে রমজানের প্রকৃত তাৎপর্যের গভীর মিল রয়েছে। কারণ ইসলাম এই মাসকে এমন এক আধ্যাত্মিক উষ্ণতার মাধ্যমে চিহ্নিত করেছে, যা কেবল ঋতুগত উত্তাপ নয়; বরং হৃদয়, বিবেক ও সমাজজীবনকে জাগ্রত করার এক অন্তর্গত দহন।
এই দহন হলো রোজার দহন—ক্ষুধা ও তৃষ্ণার আগুনে দগ্ধ হওয়া। আল্লাহ তাআলা ইমানদারদের ওপর রোজা ফরজ করেছেন, যাতে তারা দিনের দীর্ঘ সময় পানাহার ও নানান বৈধ ভোগ-বিলাস থেকে বিরত থাকে। এই বিরত থাকা নিছক শারীরিক কষ্টভোগ নয়; এটি একটি বাস্তব প্রশিক্ষণ।
যে ব্যক্তি স্বেচ্ছায় ক্ষুধার কষ্ট সহ্য করে, সে অনুভব করতে শেখে সেইসব মানুষের বেদনা, যারা বাধ্য হয়ে প্রতিদিন ক্ষুধার সঙ্গে লড়াই করে। রমজানের রোজা তাই কেবল একটি ইবাদত নয়, এটি সামাজিক ন্যায়বোধ ও মানবিক সংবেদনশীলতার এক গভীর ও পরিশীলিত শিক্ষানিকেতন।
ক্ষুধার অনুভূতি ভাষায় সম্পূর্ণ প্রকাশ করা যায় না। দারিদ্র্যের যন্ত্রণা বর্ণনা করে বোঝানো সম্ভব নয়। লেখকরা লেখেন, বক্তারা বলেন—মানুষকে সাম্য ও সহানুভূতির শিক্ষা দেন। কিন্তু মানুষের অন্তরকে যে শক্তি নাড়া দেয়, তা কথার চেয়ে অনেক গভীর।
রমজানের একটি দিনের রোজা মানুষের অন্তরে যে বোধ জাগায়, তা শত বক্তৃতার চেয়েও প্রভাবশালী। কারণ এটি কল্পনা নয়, এটি প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা। একজন রোজাদার যখন দুপুরের প্রখর রোদে বা ক্লান্তিকর কর্মদিবসে পানির এক ফোঁটার জন্য তৃষ্ণার্ত হয়, তখন সে বুঝতে পারে—অভাবী মানুষের প্রতিদিনের সংগ্রাম কেমন।
রোজার স্বাস্থ্যগত উপকারিতা অস্বীকার করার উপায় নেই। রোজা শারীরিকভাবে শৃঙ্খলা আনে, আত্মসংযম শেখায়। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে রোজার মূল উদ্দেশ্য কেবল শারীরিক সুস্থতা নয়। এটি আত্মশুদ্ধি, নৈতিক উৎকর্ষ এবং ইহসানের চর্চা। ইহসান মানে কেবল দান নয়; বরং আল্লাহকে প্রত্যক্ষ করার মতো সচেতনতা নিয়ে সৎকর্ম করা এবং মানুষের প্রতি দয়া প্রদর্শন করা। রমজান এই ইহসানের অনুভূতিকে জাগিয়ে তোলে।
সহিহ হাদিসে এসেছে, মুহাম্মদ (সা.) ছিলেন মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দানশীল। আর রমজান মাসে তাঁর দানশীলতা আরও বেড়ে যেত।
যখন জিবরীল (আ.) তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেন এবং তারা একে অপরকে কোরআন তিলাওয়াত করে শোনাতেন, তখন তিনি কল্যাণের ক্ষেত্রে প্রবাহিত বাতাসের চেয়েও বেশি উদার হয়ে উঠতেন। এই বর্ণনা আমাদের সামনে রমজানের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরে। রোজা, ওহির স্মরণ এবং ফেরেশতার সান্নিধ্য—এই তিনটি উপাদান একত্রিত হয়ে তার মহান চরিত্রকে আরও দীপ্তিময় করে তুলত।
রোজা মানুষের মধ্যে বঞ্চনার অভিজ্ঞতা সৃষ্টি করে। যদিও রাসুলুল্লাহ (সা.) ও সাধারণ মানুষ উভয়েই রোজা রাখেন, কিন্তু তার হৃদয় ছিল মানবতার প্রতি সবচেয়ে বেশি সংবেদনশীল। তিনি ছিলেন উত্তম চরিত্র পূর্ণ করার জন্য প্রেরিত।
তাই রমজানে তার দানশীলতার বৃদ্ধি আমাদের জন্য এক উজ্জ্বল আদর্শ। জিবরীলের (আ.) সঙ্গে সাক্ষাৎ ছিল আধ্যাত্মিক শক্তির উৎস। আর কোরআন তেলাওয়াত ছিল নৈতিক আলোর প্রদীপ। এই তিনটি বিষয় মিলেই রমজানকে পরিণত করে দয়া, সহানুভূতি ও উদারতার উর্বর ভূমিতে।
রমজানের অন্যতম শিক্ষা হলো—বঞ্চনা সহানুভূতি সৃষ্টি করে। প্রসিদ্ধ ওই হাদিসের কথা আমরা জানি, যেখানে বলা হয়েছে, এক ব্যক্তি তীব্র তৃষ্ণায় কাতর হয়ে একটি কূপে নেমে পানি পান করল। উপরে উঠে এসে সে দেখল একটি কুকুর তৃষ্ণায় মাটি চাটছে। তখন তার মনে পড়ল নিজের তৃষ্ণার কথা।
সে আবার কূপে নেমে নিজের জুতা ভরে পানি তুলে কুকুরটিকে পান করাল। এই কাজের জন্য আল্লাহ তাআলা তাকে ক্ষমা করে দিলেন। এই ঘটনার মর্মার্থ স্পষ্ট—নিজে কষ্ট না পেলে অন্যের কষ্ট পুরোপুরি উপলব্ধি করা যায় না। অভিজ্ঞতা থেকেই জন্ম নেয় সহানুভূতি, আর সহানুভূতি মানুষকে উদ্বুদ্ধ করে ইহসান ও দয়ার পথে।
রমজানে রোজাদার ব্যক্তি প্রতিদিন ক্ষুধা ও তৃষ্ণার স্বাদ গ্রহণ করে। ফলে যখন সে সমাজে কোনো ক্ষুধার্ত বা অসহায় মানুষকে দেখে, তার অন্তর সহজেই নরম হয়ে যায়। এই অনুভূতি কৃত্রিম নয়; এটি অনুশীলনের ফল। বছরের পর বছর এই অনুশীলন মানুষকে গড়ে তোলে দয়ালু ও উদার করে। হয়তো এ কারণেই মুসলমান সমাজে, নানা সামাজিক ও রাজনৈতিক দুর্বলতা সত্ত্বেও, ব্যক্তিগত দান ও সহানুভূতির চর্চা শক্তিশালীভাবে টিকে আছে।
রমজানকে ‘সহযোগিতার মাস’ বলা হয়েছে। হজরত সালমান (রা.) বর্ণনা করেন, শাবানের শেষ দিন রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছিলেন, তোমাদের কাছে এক মহান ও বরকতময় মাস আসছে; এতে এমন একটি রাত রয়েছে যা হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। এই মাস ধৈর্যের, এই মাস সহযোগিতার। যে ব্যক্তি কোনো রোজাদারকে ইফতার করাবে, তার গুনাহ মাফ হবে এবং সে জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাবে। এই ঘোষণা রমজানের সামাজিক দিকটি স্পষ্ট করে দেয়। রোজা শুধু নিজে রাখার বিষয় নয়; বরং অন্যের রোজা সহজ করারও বিষয়।
একজন দরিদ্র রোজাদারের জন্য ইফতারির ব্যবস্থা করা মানে কেবল একটি খাবার দেওয়া নয়; বরং তার কষ্ট লাঘব করা, তাকে সম্মান দেওয়া। ইসলামে এমন কি যে ব্যক্তি বার্ধক্য বা অসুস্থতার কারণে রোজা রাখতে অক্ষম, তার পরিবর্তে কাফফারা হিসেবে দরিদ্রকে আহার করানোর বিধান রয়েছে। অর্থাৎ রোজা ও দান—এই দুই বিষয় একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
রমজানের ইহসান-শিক্ষা শেষ হয় সদকাতুল ফিতরের মাধ্যমে। ঈদের আগে প্রত্যেক সক্ষম মুসলমানের ওপর এটি ওয়াজিব করা হয়েছে, যাতে দরিদ্ররাও ঈদের আনন্দে শরিক হতে পারে। সহিহ হাদিস অনুযায়ী সদকাতুল ফিতর রোজাদারকে অনর্থক ও অশ্লীল কথাবার্তা থেকে পবিত্র করে এবং অভাবীদের জন্য খাদ্যের ব্যবস্থা করে। এ যেন মাসব্যাপী শিক্ষার একটি চূড়ান্ত পরীক্ষা। পুরো মাস ধরে যে সহানুভূতি ও দয়ার চর্চা করা হয়েছে, তার বাস্তব প্রমাণ দেওয়ার সময় আসে ঈদের প্রাক্কালে।
এইভাবে রমজান একটি বিদ্যাপীঠে পরিণত হয়—ইহসান ও দয়ার বিদ্যাপীঠ। এখানে মানুষ শেখে আত্মসংযম, শেখে ধৈর্য, শেখে সহমর্মিতা। ক্ষুধার আগুন তাকে পোড়ায়, কিন্তু সেই আগুন হৃদয়কে কঠিন না করে কোমল করে তোলে। এই আগুন আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে। তাই রমজান কেবল একটি মাস নয়; এটি একটি পরিবর্তনের প্রক্রিয়া। যে ব্যক্তি আন্তরিকতার সঙ্গে এই প্রশিক্ষণে অংশ নেয়, সে বছরের বাকি সময়েও দানশীল ও দয়ালু থাকার প্রেরণা পায়।
পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/158755