নবোদ্যমে শুদ্ধাচারের নতুন বাংলাদেশ

নবোদ্যমে শুদ্ধাচারের নতুন বাংলাদেশ

রক্তস্নাত এক জনপদে দাঁড়িয়ে আমরা যখন নতুন ভোরের সূর্য দেখি তখন সেই আলোয় কেবল তথাকথিত উন্নয়ন নয়, বরং এক নির্মল শুদ্ধতার তৃষ্ণা জাগে। ইতিহাস সাক্ষী এদেশের মানুষ বারবার রাজপথে নেমেছে শুধু খেয়ে পরে বেঁচে থাকার জন্য নয় বরং সম্মানের সাথে মাথা উঁচু করে বাঁচার একটি পরিবেশ নিশ্চিত করতে, নতুন সরকারের কাছে আজ কোটি প্রাণের একটাই আকুতি আমরা এমন এক বাংলাদেশ চাই যেখানে দুর্নীতি শব্দটি কেবল অভিধানের পাতায় বন্দি থাকবে বাস্তবতায় যার কোনো অস্তিত্ব থাকবে না, একটি রাষ্ট্র যখন দুর্নীতির ঘুণপোকায় আক্রান্ত হয় তখন তার বাহ্যিক চাকচিক্য থাকলেও ভেতরটা ফোকলা হয়ে যায়, মেধা পাচার হয়, যোগ্যরা বঞ্চিত হয় আর অযোগ্যদের দাপটে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস ওঠে, আমরা গত কয়েক দশকে দেখেছি কীভাবে দুর্নীতির করাল গ্রাস আমাদের সোনালী স্বপ্নগুলোকে গিলে খেয়েছে, দুর্নীতির এই বিষাক্ত জাল আমাদের সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে আছে, আমরা চাই এমন এক স্বদেশ যেখানে সরকারি দপ্তরে ফাইল সরাতে ঘুষ দিতে হবে না, নিয়োগ পরীক্ষায় মেধার বদলে টাকার লেনদেন হবে না, আমরা চাই স্বজনপ্রীতির অবসান যেখানে অযোগ্য আত্মীয়ের বদলে যোগ্য প্রার্থীই কাজ পাবেন, বাজারের সিন্ডিকেট প্রথা ভেঙে দিয়ে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস দূর করা এখন সময়ের দাবি, ব্যবসায়িক লাইসেন্স থেকে শুরু করে সাধারণ ট্রেড লাইসেন্স সংগ্রহ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে যে অবৈধ লেনদেনের সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে তা উপড়ে ফেলতে হবে, আমরা চাই একটি স্বচ্ছ টেন্ডার প্রক্রিয়া যেখানে পেশিশক্তি বা রাজনৈতিক পরিচয় নয় বরং কাজের মানই হবে মুখ্য, ব্যাংকিং খাতের লুটপাট এবং হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচারের যে মহোৎসব আমরা দেখেছি তার পুনরাবৃত্তি রোধে কঠোর আইনি কাঠামো প্রয়োজন, একটি দেশ যখন দুর্নীতির করাল গ্রাসে পড়ে তখন সাধারণ মানুষের করের টাকায় নির্মিত রাস্তাঘাট কিংবা ব্রিজ অল্প দিনেই ভেঙে পড়ে। নিম্নমানের নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহার করে জনগণের জীবনের ঝুঁকি বাড়ানোও এক ধরনের বড় অপরাধ। নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা থাকবে প্রতিটি উন্নয়ন প্রকল্পে শতভাগ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, কালোবাজারি ও মজুদদারির মাধ্যমে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে যারা সাধারণ মানুষের পকেট কাটে তাদের কঠোর বিচারের আওতায় আনতে হবে, আমরা চাই শিক্ষা খাতের শুদ্ধি অভিযান যেখানে প্রশ্নপত্র ফাঁস কিংবা ভর্তি বাণিজ্য নামের কোনো কলঙ্ক থাকবে না, স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে দালালের দৌরাত্ম্য বন্ধ করে সাধারণ মানুষের বিনামূল্যে বা সুলভ মূল্যে চিকিৎসা পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে, বিচারহীনতার সংস্কৃতিই মূলত দুর্নীতিকে উৎসাহিত করে, যখন কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি ক্ষমতার অপব্যবহার করে পার পেয়ে যান তখন সমাজের সৎ মানুষগুলো হতাশ হয়ে পড়েন, নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা হলো আইনের শাসন এমনভাবে প্রতিষ্ঠা করা যেন অপরাধীর পরিচয় কেবল অপরাধী হিসেবেই গণ্য হয়, ক্ষমতার ছায়াতলে কেউ যেন অন্যায়ের সুরক্ষা না পায়, প্রতিটি সরকারি দপ্তরে অটোমেশন এবং ডিজিটাল স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গেলে দুর্নীতির সুযোগ অনেকটা কমে আসবে, মানুষ যখন দেখবে তার প্রাপ্য সেবা পেতে কোনো মধ্যস্বত্বভোগীর দ্বারস্থ হতে হচ্ছে না তখনই রাষ্ট্রের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা ফিরে আসবে, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমিয়ে এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতা বৃদ্ধি করে একটি বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা এখন জরুরি, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় সততার বীজ বপন করা এখন সময়ের দাবি, কেবল বড় বড় ডিগ্রি অর্জন করলেই হবে না যদি সেই শিক্ষার ভেতরে নৈতিকতা না থাকে, নতুন সরকার যদি শিক্ষা কারিকুলামে চারিত্রিক দৃঢ়তা এবং দুর্নীতির কুফল সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেয় তবে আগামী প্রজন্ম একটি সুস্থ মানসিকতা নিয়ে বেড়ে উঠবে, আমরা চাই এমন এক বাংলাদেশ যেখানে একজন তরুণ উদ্যোক্তা কেবল তার মেধা আর পরিশ্রমের জোরে সফল হবেন তাকে কোনো টেবিলের নিচে লেনদেন করতে হবে না, পুলিশ প্রশাসন থেকে শুরু করে বিচার বিভাগ পর্যন্ত প্রতিটি অঙ্গকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখা গেলে সাধারণ মানুষের শেষ আশ্রয়স্থলটুকু নিরাপদ থাকবে, ভূমি অফিসের হয়রানি বন্ধ করা এবং সাধারণ মানুষের পৈতৃক সম্পত্তি দখলের ভয়মুক্ত রাখা সরকারের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত, একটি দেশ রাতারাতি বদলে যায় না কিন্তু পরিবর্তনের অঙ্গীকার যদি দৃঢ় হয় তবে অসম্ভবকেও সম্ভব করা যায়, আমরা এমন এক সমাজ চাই যেখানে সরকারি কর্মচারীরা নিজেদের জনগণের প্রভু নয় বরং সেবক মনে করবেন, ঘুষের লেনদেন বন্ধ হলে বাজারের দ্রব্যমূল্য যেমন নিয়ন্ত্রণে আসবে তেমনি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মানও উন্নত হবে, আমরা কোনো বিশেষ দলের বা গোষ্ঠীর বাংলাদেশ চাই না আমরা চাই এদেশের সাধারণ মানুষের বাংলাদেশ, প্রতিটি মন্ত্রণালয় এবং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে কার্যকর নজরদারি এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা থাকা উচিত, গণমাধ্যম ও সুশীল সমাজের গঠনমূলক সমালোচনাকে স্বাগত জানিয়ে সরকারকে তার কাজের জবাবদিহিতা বাড়াতে হবে, পরিবেশ ধ্বংস করে নদী দখল কিংবা বন উজাড় করার মতো পরিবেশগত দুর্নীতিগুলোও কঠোর হাতে দমন করতে হবে, পরিশেষে বলা যায় দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়া কেবল সরকারের একার দায়িত্ব নয় এটি একটি সামাজিক আন্দোলন তবে সেই আন্দোলনের নেতৃত্ব দিতে হবে রাষ্ট্রকে, নতুন সরকারের ওপর মানুষের যে বিশাল প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে তার মূলে রয়েছে শুদ্ধাচার, মানুষ এখন শান্তি চায় স্বচ্ছতা চায় এবং একটি বৈষম্যহীন সমাজ চায়, যদি প্রতিটি স্তরে সততা নিশ্চিত করা যায় তবে এই বাংলাদেশ হবে বিশ্বের বুকে এক অনন্য উদাহরণ, আমরা বিশ্বাস করি সদিচ্ছা থাকলে এবং সাধারণ মানুষকে সাথে নিয়ে চললে এই লক্ষ্য অর্জন করা কঠিন কিছু নয়, আগামীর বাংলাদেশ হোক তারুণ্যের শক্তিতে বলীয়ান এবং সকল প্রকার আর্থিক ও নৈতিক দুর্নীতির কলঙ্কমুক্ত এক আদর্শ ভূমি যেখানে মানুষের ঘামের দাম থাকবে এবং মেধার মূল্যায়ন হবে যথাযথভাবে।

লেখক :

শাম্মী শফিক জুঁই

শিক্ষার্থী

বিভাগ ইংরেজি 
ইডেন মহিলা কলেজ, ঢাকা

পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/158050