বাংলাদেশে ছায়া মন্ত্রিসভা নতুন অধ্যায়ের সূচনা
ছায়া মন্ত্রিসভা (Shadow Cabinet) হলো সংসদীয় গণতন্ত্রের একটি লোভনীয় ও কার্যকর রীতি। সহজভাবে বললে, প্রধান বিরোধী দল যখন সরকারের প্রতিটি মন্ত্রীর বিপরীতে নিজেদের একজন করে সংসদ সদস্য নির্ধারণ করে দেয়, তখন তাকে ছায়া মন্ত্রিসভা বলা হয়। ১. তাত্ত্বিক উৎস ও ধারণা : ছায়া মন্ত্রিসভার ধারণাটি এসেছে যুক্তরাজ্য থেকে। এটি ব্রিটিশ ‘ওয়েস্টমিনস্টার মডেল’-এর অংশ। এর মূল দর্শন হলো Her MajestyÕs Loyal Opposition- অর্থাৎ বিরোধী দল সরকারের শত্রু নয়; বরং তারা একটি বিকল্প সরকার হিসেবে সদা প্রস্তুত। লক্ষ্য হলো সরকারকে জবাবদিহির আওতায় রাখা এবং প্রয়োজনে ক্ষমতা গ্রহণের জন্য প্রস্তুত থাকা।
২. এটি যেভাবে কাজ করে : সরকারের প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের বিপরীতে বিরোধী দলের একজন নির্দিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা থাকেন। যেমন- সরকারের একজন অর্থমন্ত্রী থাকলে বিরোধী দলে থাকবেন একজন ছায়া অর্থমন্ত্রী। বাজেট পেশের সময় তিনি সরকারের প্রস্তাবের গঠনমূলক সমালোচনা করবেন এবং বিকল্প প্রস্তাব তুলে ধরবেন। ছায়া মন্ত্রীরা নিয়মিত বৈঠক করে সরকারের নীতির ত্রুটি চিহ্নিত করেন এবং নিজেদের বিকল্প পরিকল্পনা জনগণের সামনে উপস্থাপন করেন।
৩. বেতন ও সুযোগ-সুবিধা : ছায়া মন্ত্রীরা সাধারণত আলাদা কোনো বিশেষ বেতন পান না। তারা একজন সাধারণ সংসদ সদস্য হিসেবে নির্ধারিত বেতন ও সুবিধাই গ্রহণ করেন। কিছু দেশে বিরোধীদলীয় নেতা বা প্রধান হুইপ অতিরিক্ত ভাতা পেতে পারেন, তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে এটি দলীয় ও রাজনৈতিক দায়িত্ব হিসেবেই বিবেচিত।
৪. সাংবিধানিক ভিত্তি : বেশিরভাগ দেশে ছায়া মন্ত্রিসভা সরাসরি সংবিধান দ্বারা বাধ্যতামূলক নয়; এটি একটি সংসদীয় রীতি বা কনভেনশন। তবে সংসদীয় কার্যবিধিতে বিরোধীদলীয় নেতার বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হয়, যা পরোক্ষভাবে এই কাঠামোকে স্বীকৃতি দেয়।
৫. যেসব দেশে চর্চা রয়েছে : মূলত কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোতে এই প্রথা বেশি দেখা যায়- যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড, ভারতে কেন্দ্রীয়ভাবে ধারাবাহিক চর্চা না থাকলেও কিছু রাজ্যে সীমিত আকারে এ ধরনের উদ্যোগ দেখা গেছে। বাংলাদেশে ছায়া মন্ত্রিসভা: নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের (১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬) পরবর্তী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের ঘোষণা একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী–এর আইনজীবী নেতা শিশির মনির এবং জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-এর মুখপাত্র আসিফ মাহমুদের বক্তব্য অনুযায়ী, দেশে প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। অতীতে প্রতীকী ‘ছায়া সংসদ’ দেখা গেলেও মূলধারার বড় রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে মন্ত্রণালয়ভিত্তিক দায়িত্ব বণ্টনের এমন ঘোষণা আগে দেখা যায়নি।
এই উদ্যোগকে রাজনীতিতে সৃজনশীল নেতৃত্বের প্রয়াস হিসেবে দেখা যেতে পারে। এনসিপির ভাষ্যমতে, ছায়া মন্ত্রিসভা সরকারের ওপর ‘ওয়াচডগ’ বা প্রহরীর ভূমিকা পালন করবে। অর্থাৎ এটি কেবল সমালোচনার প্ল্যাটফর্ম নয়; বরং নির্দিষ্ট মন্ত্রণালয়ের বিপরীতে বিকল্প নীতি, বিশ্লেষণ ও সমাধান তুলে ধরার একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো। ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের মাধ্যমে বিরোধী দলগুলো জনগণকে বার্তা দিতে চায় তারা শুধু প্রতিবাদী নয়, বরং রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য প্রস্তুত ও সংগঠিত। সংসদের ভেতরে-বাইরে নীতিনির্ভর বিতর্ককে গুরুত্ব দেওয়ার যে আহ্বান এসেছে, তা রাজপথনির্ভর রাজনীতি থেকে প্রাতিষ্ঠানিক বিতর্কের দিকে অগ্রসর হওয়ার ইঙ্গিত বহন করে।
সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ : এই উদ্যোগ তরুণ ভোটারদের মধ্যে ইতিবাচক সাড়া ফেলতে পারে এবং সংসদীয় সংস্কৃতিতে বিষয়ভিত্তিক বিরোধিতার চর্চা শুরু করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, স্বরাষ্ট্র, অর্থ বা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিপরীতে নির্দিষ্ট বিশেষজ্ঞ নেতার উপস্থিতি নীতিগত আলোচনাকে সমৃদ্ধ করতে পারে। তবে চ্যালেঞ্জও কম নয়। সরকারি দল ছায়া মন্ত্রিসভাকে কতটা গুরুত্ব দেবে, তথ্যপ্রাপ্তির সুযোগ কতটা নিশ্চিত হবে, এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে গঠনমূলক প্রস্তাব গ্রহণের মানসিকতা কতটা তৈরি হবে এসব প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ। তবু যদি এটি কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠ বনাম সংখ্যালঘু রাজনীতির বাইরে গিয়ে নীতিনির্ভর প্রতিযোগিতা ও জবাবদিহির একটি নতুন অধ্যায় সূচিত হতে পারে।
লেখক:
শাহারিয়া নয়ন
সাংবাদিক, (সহ-সম্পাদক, দূরবিন নিউজ)
শিক্ষার্থী, সাংবাদিকতা এবং গণমাধ্যম বিভাগ ,
সোনারগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়