ছায়া মন্ত্রিসভা: বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রে নতুন ভোরের হাতছানি
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল এবং বিএনপি’র নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক আকাশে এক নতুন ও ইতিবাচক আলোচনার সূত্রপাত হয়েছে। বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি নেতাদের পক্ষ থেকে ‘ছায়া মন্ত্রিসভা’ (Shadow Cabinet) গঠনের ঘোষণা দেশের সংসদীয় রাজনীতির ইতিহাসে একটি মাইলফলক হতে পারে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের রেশ কাটতে না কাটতেই দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি আধুনিক ও গুরত্বপূর্ণ ধারণা ডালপালা মেলছে— তা হলো ‘ছায়া মন্ত্রিসভা’। নির্বাচনের ফলাফল পরবর্তী সময়ে যখন নতুন সরকার শপথের প্রস্তুতি নিচ্ছে, ঠিক তখনই জামায়াতে ইসলামীর আইনজীবী শিশির মনির এবং এনসিপি নেতা আসিফ মাহমুদের পক্ষ থেকে ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের ঘোষণা জনমনে কৌতূহল ও আশার সঞ্চার করেছে। এটি কেবল একটি রাজনৈতিক কৌশল নয়, বরং জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার এক বলিষ্ঠ পদক্ষেপ।
ছায়া মন্ত্রিসভা: ধারণার উৎস ও তাৎপর্য
মূলত ব্রিটিশ ‘ওয়েস্টমিনস্টার’ ধারার সংসদীয় গণতন্ত্রে ‘ছায়া মন্ত্রিসভা’ একটি অত্যন্ত সুপরিচিত এবং কার্যকর ব্যবস্থা। যুক্তরাজ্য বা অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশগুলোতে প্রধান বিরোধী দল প্রতিটি সরকারি মন্ত্রণালয়ের বিপরীতে একজন করে ‘ছায়া মন্ত্রী’ নিয়োগ দেয়। তাদের মূল কাজ হলো সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কাজের ওপর কড়া নজরদারি রাখা, নীতি বিশ্লেষণ করা এবং প্রয়োজনে সরকারের বিকল্প প্রস্তাব জনগণের সামনে পেশ করা। এটি যেন সরকারের আয়নার মতো কাজ করে, যেখানে সরকার তার ভুলগুলো দেখতে পায়।
‘ছায়া-মন্ত্রিসভা’: বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট ও নতুন সম্ভাবনা
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আগে কখনোই আনুষ্ঠানিকভাবে ছায়া মন্ত্রিসভার চর্চা দেখা যায়নি। এখানে বিরোধী দলের রাজনীতি মূলত রাজপথের আন্দোলন এবং ঢালাও সমালোচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু এবারের চিত্র ভিন্ন। নির্বাচনে পরাজিত হওয়া সত্ত্বেও শিশির মনির বা তরুণ নেতা আসিফ মাহমুদের মতো ব্যক্তিরা যখন ‘ওয়াচডগ’ বা প্রহরী হিসেবে কাজ করার ঘোষণা দেন, তখন বোঝা যায় রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তনের হাওয়া বইছে।
আমাদের দেশে সংসদীয় গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করার পথে সবচেয়ে বড় বাধা হলো সরকারি কাজের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাব। একটি শক্তিশালী ছায়া মন্ত্রিসভা থাকলে:-
বিকল্প বাজেট ও নীতি: সরকার কোনো বাজেট দিলে বিরোধী দল কেবল তার বিরোধিতাই করবে না, বরং তাদের ‘ছায়া অর্থমন্ত্রী’ বিকল্প একটি বাজেট প্রস্তাব করতে পারবেন।
প্রশাসনিক স্বচ্ছতা: প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করার ফলে আমলাতন্ত্র ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের ওপর একটি মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরি হবে।
ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের মহড়া: এটি রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য একটি ‘প্রশিক্ষণ কেন্দ্র’ হিসেবে কাজ করে। আজ যিনি ছায়া স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, কাল তিনি ক্ষমতায় এলে মন্ত্রণালয় পরিচালনায় অভিজ্ঞতার পরিচয় দিতে পারবেন।
চ্যালেঞ্জ ও প্রত্যাশা
বাংলাদেশের সংবিধানে ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা নেই। ফলে এই ব্যবস্থার সাফল্য নির্ভর করবে রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছা এবং জনগণের সমর্থনের ওপর। যদি এটি কেবল প্রচারণার হাতিয়ার না হয়ে সত্যিকারের গঠনমূলক সমালোচনার মঞ্চ হয়, তবে দেশের শাসনব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন সম্ভব।
নতুন সরকারের বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠতার মুখে বিরোধী পক্ষ যদি রাজপথের ধ্বংসাত্মক রাজনীতির পরিবর্তে সংসদের বাইরে বা ভেতরে এই ‘ছায়া মন্ত্রিসভা’র মাধ্যমে মেধা ও যুক্তির লড়াই শুরু করে, তবে তা হবে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত এক সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতির সূচনা।
সুতরাং, একটি শক্তিশালী গণতন্ত্রের জন্য কেবল শক্তিশালী সরকার নয়, বরং একটি সুসংগঠিত ও দায়িত্বশীল বিরোধী পক্ষ অপরিহার্য। ছায়া মন্ত্রিসভা সেই দায়িত্বশীলতারই প্রতীক। এটি যদি সফলভাবে কাজ করতে পারে, তবে সরকার যেমন স্বেচ্ছাচারী হতে পারবে না, তেমনি বিরোধী দলও জনগণের কাছে নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করতে পারবে। আমরা একটি এমন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি, যেখানে রাজনীতি হবে যুক্তি আর জনকল্যাণের, পেশী শক্তির নয়।
হাসান মো: শাব্বির
সাংবাদিক ও প্রবান্ধিক।
পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/157815