ক্রিকেটের খেলা নাকি রাজনৈতিক খেলা
ক্রিকেট শুধু একটি খেলা নয়; এটি আমাদের দেশের মানুষের আবেগ, গর্ব ও জাতীয় পরিচয়ের অংশ। মাঠে একজন ক্রিকেটার ব্যাট হাতে দাঁড়ালে শুধু একটি বল নয়, পুরো জাতির আশা-আকাক্সক্ষা তার দিকে তাকিয়ে থাকে। কিন্তু আজকের দিনে ক্রিকেট কেবল মাঠের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। ক্রিকেটের সাথে রাজনীতি জড়িয়ে পড়ায় খেলাটি ক্রমশ “খেলা” থেকে “রাজনৈতিক খেলা” হয়ে যাচ্ছে। এই প্রশ্নই আজ বাস্তব: ক্রিকেট কি সত্যিই খেলা, নাকি রাজনৈতিক শক্তির একটি মাধ্যম? ক্রিকেটে রাজনীতির প্রবেশের মূল কারণ হলো ক্রিকেট এখন একটি বিশাল অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্র। টুর্নামেন্ট, স্পন্সরশিপ, টেলিভিশন রাইটস, বোর্ডের বাজেট এসবের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা লেনদেন হয়। আর যেখানে টাকা আসে, সেখানে ক্ষমতাশীল ব্যক্তি ও রাজনৈতিক দলগুলো আগ্রহী হয়। তারা ক্রিকেটকে নিজেদের জনপ্রিয়তা বাড়ানোর, ক্ষমতা প্রদর্শনের ও সামাজিক প্রভাব বিস্তারের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে। ফলে ক্রিকেটের প্রশাসন, খেলোয়াড় নির্বাচন ও ম্যাচ পরিচালনায় রাজনৈতিক প্রভাব বাড়তে থাকে।
রাজনীতির প্রভাব ক্রিকেটকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করে খেলোয়াড় নির্বাচন ও দল গঠনে। ক্রিকেটে খেলোয়াড় নির্বাচন হওয়া উচিত পারফরম্যান্স ও দক্ষতার ভিত্তিতে। কিন্তু রাজনীতির কারণে অনেক সময় দল গঠন হয় “স্বার্থ” ও “প্রভাব” দেখে। এমনকি কিছু প্রতিভাবান খেলোয়াড় সুযোগ না পেয়ে পিছিয়ে পড়ে, আর কিছু খেলোয়াড় রাজনৈতিক কারণে দলের মধ্যে টিকে থাকে। এতে দলের মান কমে যায়, সমন্বয় নষ্ট হয় এবং খেলায় বাস্তব প্রতিদ্বন্দ্বিতা হারিয়ে যায়। খেলোয়াড়দের মনোবলও ভেঙে পড়ে, কারণ তারা জানে, তাদের কঠোর পরিশ্রম কোনো দিন ফলপ্রসূ হবে না, যদি রাজনৈতিক ব্যাকিং না থাকে।
রাজনীতি ক্রিকেটকে শুধু খেলায় নয়, সামাজিকভাবে ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। যখন দর্শক দেখতে পায় যে খেলায় ন্যায্যতা নেই, ফলাফল নির্দিষ্ট হয়ে যায় বা নির্বাচনে অনিয়ম হয়, তখন ক্রিকেটের প্রতি তাদের আস্থা কমে যায়। ক্রিকেট একটি দেশের গর্বের প্রতীক। যদি ক্রিকেটের মান কমে যায়, দেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং যুবসমাজের মধ্যে খেলাধুলার প্রতি আগ্রহ কমে যায়। ফলে দেশের ভবিষ্যৎ ক্রিকেটও দুর্বল হয়ে পড়ে। তবে রাজনীতি নিজে খারাপ নয়। যদি রাজনীতি সঠিকভাবে পরিচালিত হয়, ক্রিকেটের উন্নয়নে সহায়ক হতে পারে। সরকার বা সমাজের অংশ হিসেবে ক্রিকেটকে সমর্থন করা উচিত, যেমন উন্নত স্টেডিয়াম, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, বাজেট বরাদ্দ ইত্যাদি। কিন্তু সমস্যা তখনই যখন রাজনীতি খেলাকে নিয়ন্ত্রণ করে, নিজের স্বার্থে ব্যবহার করে এবং খেলোয়াড়দের ক্ষতি করে। তখন ক্রিকেট আর খেলাই থাকে না, হয় একটি শক্তির লড়াই, হয় একটি ব্যবসায়িক খেলা।
ক্রিকেটকে আবার “খেলা” হিসেবে ফিরিয়ে আনতে হলে দরকার স্বচ্ছতা, যোগ্যতা ভিত্তিক সিদ্ধান্ত, এবং রাজনৈতিক প্রভাব কমানো। খেলোয়াড় নির্বাচন, বোর্ড নির্বাচন ও টুর্নামেন্ট পরিচালনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। খেলোয়াড়দের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া সমাজ ও দর্শকদের সচেতনতা বাড়লে ক্রিকেট প্রশাসনকে দায়িত্বশীল হতে বাধ্য করা সম্ভব হবে। অতএব, “ক্রিকেটের খেলা নাকি রাজনৈতিক খেলা?” এই প্রশ্নের উত্তর স্পষ্ট: ক্রিকেটকে খেলা হিসেবে রাখা উচিত, কিন্তু রাজনীতির অযাচিত প্রভাব খেলাটিকে দ্রুত রাজনৈতিক খেলা করে দেয়। আমাদের দায়িত্ব হলো ক্রিকেটকে আবার খেলার জায়গায় ফিরিয়ে আনা, যেখানে শুধুই খেলোয়াড়ের দক্ষতা, পরিশ্রম ও নৈতিকতা বিচার্য হবে।
লেখক
মাহিন উদ্দিন
শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ
ঢাকা কলেজ