গণভোট ও জনমতের রাজপথ
গণভোট মানে জনগণের ভোট যা সরাসরি জনমতের প্রতিফলন ঘটিয়ে রাষ্ট্রের ভাগ্য নির্ধারণে চূড়ান্ত ভূমিকা পালন করে। একটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নাগরিকের শ্রেষ্ঠতম অধিকার হলো তার ভোটাধিকার যা কেবল প্রতিনিধি নির্বাচনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় বরং রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণে সরাসরি অংশগ্রহণের মাধ্যম হিসেবেও স্বীকৃত। বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো যখন রাষ্ট্র সংস্কারের নানা রূপরেখা নিয়ে বিতর্কে লিপ্ত তখন সরাসরি জনমতের প্রতিফলন ঘটাতে গণভোটের প্রাসঙ্গিকতা সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব বহন করছে। সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার দীর্ঘকাল ধরে কেবল আনুষ্ঠানিকতায় পর্যবসিত হওয়ার ফলে রাষ্ট্রের সাথে জনগণের যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে তা ঘোচাতে গণভোট একটি শক্তিশালী সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করতে পারে।
রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছা এবং জনগণের আকাক্সক্ষার মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান করার জন্য সংসদীয় পদ্ধতির পাশাপাশি প্রত্যক্ষ গণতান্ত্রিক এই প্রক্রিয়াটি আগামীর রাষ্ট্র কাঠামোকে আরও সুসংহত করবে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অচলায়তন ভেঙে যখন কোনো মৌলিক পরিবর্তনের কথা ভাবা হয় তখন তা কেবল গুটিকয়েক রাজনৈতিক দলের আলোচনার টেবিলে সীমাবদ্ধ না রেখে সরাসরি জনগণের রায়ের ওপর ছেড়ে দেওয়াই হলো প্রকৃত গণতন্ত্রের বহিঃপ্রকাশ। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ আজ কেবল ভোট দিয়ে প্রতিনিধি নির্বাচন করতে চায় না বরং তারা চায় রাষ্ট্রের প্রতিটি বড় সিদ্ধান্তে তাদের প্রত্যক্ষ অংশীদারিত্ব নিশ্চিত হোক যা কেবল গণভোটের মাধ্যমেই সম্ভব। ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা করা কিংবা শাসনতান্ত্রিক সংস্কারের মতো বিষয়গুলোতে যখন রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্যের অভাব দেখা দেয় তখন জনগণই হয়ে ওঠে চূড়ান্ত ফয়সালাকারী শক্তি। ভোটাধিকারের প্রকৃত সার্থকতা তখনই ফুটে ওঠে যখন একজন সাধারণ নাগরিক অনুভব করেন যে তার মতামত রাষ্ট্রের সংবিধান কিংবা আইনের গতিপথ বদলে দিতে সক্ষম। রাজনৈতিক দলগুলোকে মনে রাখতে হবে যে চূড়ান্ত ক্ষমতার উৎস কেবল জনগণ এবং তাদের আস্থায় না নিয়ে কোনো স্থায়ী পরিবর্তন টেকসই হতে পারে না। এই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে গণভোট আয়োজন করা হলে তা কেবল আইনি বৈধতা দেবে না বরং তা সাধারণ মানুষের মনে হৃত ভোটাধিকার ফিরে পাওয়ার এক নতুন আত্মবিশ্বাস তৈরি করবে। দেশের সচেতন সমাজ আজ এমন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতির স্বপ্ন দেখে যেখানে দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় স্বার্থে সাধারণ মানুষ সরাসরি কথা বলার সুযোগ পাবে। স্বচ্ছতা এবং নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করে যদি এই জনমতের প্রতিফলন ঘটানো যায় তবে তা হবে দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক মাইলফলক যা ভবিষ্যতে যেকোনো স্বেচ্ছাচারী সিদ্ধান্ত গ্রহণের পথ রুদ্ধ করে দেবে। রাজনৈতিক অস্থিরতা কাটিয়ে একটি স্থিতিশীল ও কার্যকর রাষ্ট্র ব্যবস্থা গড়তে চাইলে সাধারণ মানুষের হারানো ভোটাধিকারকে পুনরায় সক্রিয় করার কোনো বিকল্প নেই। গণভোট কেবল একটি সংখ্যাতাত্ত্বিক জয় পরাজয় নয় বরং এটি হলো নাগরিকের সেই কণ্ঠস্বর যা রাষ্ট্রের ভিত্তিপ্রস্তরকে আরও মজবুত ও জনমুখী করার ক্ষমতা রাখে। শেষ পর্যন্ত সরাসরি জনগণের রায়ই নির্ধারণ করবে দেশের ভবিষ্যৎ গতিপথ এবং নিশ্চিত করবে এমন এক জবাবদিহিতামূলক ব্যবস্থা যেখানে রাজনৈতিক দলগুলো জনগণের কাছে দায়বদ্ধ থাকতে বাধ্য হবে। যদি রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থায় প্রকৃত অর্থে পরিবর্তন আনতে হয় তবে গণভোটই হতে পারে সেই পরিবর্তনের প্রধান চাবিকাঠি যা সাধারণ মানুষের অধিকারকে সর্বোচ্চ মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করবে। একটি রাষ্ট্র যখন তার নাগরিকদের ওপর পূর্ণ আস্থা রাখে এবং প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁকে তাদের পরামর্শ গ্রহণ করে তখনই সেই রাষ্ট্র প্রকৃত অর্থে জনকল্যাণমূলক হয়ে ওঠে। গণভোটের মাধ্যমে নাগরিক সমাজ রাষ্ট্র পরিচালনার অংশীদার হয়ে ওঠে যা আধুনিক গণতান্ত্রিক বিশ্বের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হিসেবে স্বীকৃত। আগামীর বাংলাদেশে সাধারণ মানুষের মতামতকে পাশ কাটিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ যাতে সম্ভব না হয় তার জন্য এই সরাসরি ভোটের প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত ফলপ্রসূ হবে। এটি কেবল একটি ভোটাধিকার নয় বরং এটি হলো নাগরিকের আত্মমর্যাদা এবং রাষ্ট্রের প্রতি তার দায়বদ্ধতার এক চূড়ান্ত দলিল যা ইতিহাসকে নতুন করে লিখবে। গণতান্ত্রিক এই অভিযাত্রায় সাধারণ মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণই নিশ্চিত করবে একটি শোষণমুক্ত সমাজ যেখানে রাষ্ট্র এবং নাগরিকের সম্পর্ক হবে আস্থার ও বিশ্বাসের। যখন সাধারণ মানুষ অনুভব করবে যে তাদের একটি ভোট রাষ্ট্রের আইনকানুন এবং শাসন কাঠামো বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে তখন তাদের মধ্যে নাগরিক দায়িত্ববোধ আরও প্রবল হবে। রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত সংকীর্ণ দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে জনগণের এই মৌলিক অধিকারকে সম্মান জানানো এবং রাষ্ট্র সংস্কারের প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা বজায় রাখা। একটি জবাবদিহিতামূলক সমাজ নির্মাণে গণভোটের গুরুত্ব অপরিসীম কারণ এটি শাসক এবং শাসিতের মধ্যে বিদ্যমান কৃত্রিম দেয়াল ভেঙে দেয়।
ইতিহাসের প্রতিটি বাঁকে দেখা গিয়েছে যে জনগণের রায়কে উপেক্ষা করে কোনো শাসনব্যবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারেনি। তাই বর্তমান বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে গণভোট আয়োজন করা হলে তা হবে জাতীয় ঐক্যের এক অনন্য সুযোগ যেখানে দল মত নির্বিশেষে সবাই রাষ্ট্রের কল্যাণে শামিল হতে পারবে। ভোটাধিকারের এই পুনর্জাগরণ কেবল একটি নির্বাচন নয় বরং এটি হলো একটি জাতির ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক নিরাপদ ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশের নিশ্চয়তা প্রদান করবে। জনমতের এই প্রত্যক্ষ শক্তির মাধ্যমেই রাষ্ট্রের সকল জট খুলে যাবে এবং সূচিত হবে এক নতুন রাজনৈতিক যুগের যেখানে নাগরিকই হবে তার ভাগ্যের প্রকৃত নির্মাতা।
লেখক
শাম্মী শফিক জুঁই
শিক্ষার্থী, ইংরেজি বিভাগ
ইডেন মহিলা কলেজ, ঢাকা