বাংলাদেশের সহাবস্থানের মডেল তুলে ধরলেন ঢাবি উপাচার্য

বাংলাদেশের সহাবস্থানের মডেল তুলে ধরলেন ঢাবি উপাচার্য

ঢাবি প্রতিনিধি : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমদ খান যুক্তরাষ্ট্র সফরকালে ওয়াশিংটন ডিসিতে অনুষ্ঠিত দু’টি আন্তর্জাতিক কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে ধর্মীয় স্বাধীনতা, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, সহাবস্থান ও নৈতিক নেতৃত্ব বিষয়ে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন।

গত ৪ ফেব্রুয়ারি তিনি যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতা কমিশন (ইউএসসিআইআরএফ)-এর কার্যালয়ে কমিশনের চেয়ার ভিকি হার্টজলারসহ শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠকে অংশ নেন। একই সফরে তিনি গ্লোবাল ফেইথ ফোরামে বিশেষ বক্তা হিসেবেও বক্তব্য প্রদান করেন। সফর শেষে বর্তমানে তিনি দেশে অবস্থান করছেন। ইউএসসিআইআরএফ’র সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি, নির্বাচনকালীন প্রেক্ষাপট এবং সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা হয়। বৈঠকটি সমন্বয় করে মাল্টি-ফেইথ নেবারস নেটওয়ার্ক (এমএফএনএন)। 

বৈঠকে অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমদ খান বাংলাদেশের দীর্ঘ ঐতিহাসিক সহাবস্থানের ঐতিহ্য তুলে ধরে বলেন, তৃণমূল পর্যায়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি তুলনামূলকভাবে দৃঢ় থাকলেও সহিংসতার অধিকাংশ ঘটনাই রাজনৈতিকভাবে প্ররোচিত। তিনি জানান, সংখ্যালঘু সম্প্রদায় সংশ্লিষ্ট প্রায় ৫৭৪টি ঘটনার মধ্যে মাত্র ৭১টিতে সরাসরি ধর্মীয় উপাদান পাওয়া গেছে। বাকি ঘটনাগুলোর পেছনে ভূমি-বিরোধ, স্থানীয় দ্বন্দ্ব ও রাজনৈতিক সুযোগসন্ধানী কর্মকাণ্ড ভূমিকা রেখেছে। তিনি উল্লেখ করেন, জুলাই ২০২৪-এর আন্দোলনের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একাডেমিক কার্যক্রম পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি আন্তঃধর্মীয় ঐক্য রক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। দায়িত্ব গ্রহণের পর বিশ্ববিদ্যালয়ে বৃহৎ পূজা উদযাপন, অন্তর্ভুক্তিমূলক ঈদ অনুষ্ঠান, বড়দিনের বৃহৎ আয়োজনসহ বছরব্যাপী আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতি কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হয়েছে।

বর্তমান পরিস্থিতি প্রসঙ্গে ঢাবি উপাচার্য বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সার্বিকভাবে স্থিতিশীলতা বিরাজ করছে। জাতীয় পর্যায়ে কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটলেও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে পদ্ধতিগতভাবে টার্গেটিংয়ের কোনো প্রমাণ নেই। নির্বাচন একটি সংবেদনশীল সময় হলেও সরকার সার্বিক নিরাপত্তা জোরদারে কাজ করছে বলেও তিনি জানান। আঞ্চলিক ভূরাজনীতি প্রসঙ্গে তিনি ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের সাম্প্রতিক টানাপোড়েন এবং পাকিস্তানের সুযোগ নেওয়ার প্রচেষ্টার কথা উল্লেখ করেন। তবে নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে বড় ধরনের সাম্প্রদায়িক সহিংসতার আশঙ্কা কম বলে মত দেন তিনি। একই সঙ্গে হিন্দু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে বাংলাদেশের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।

বৈঠকে অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমদ খান সাম্প্রদায়িক ঘটনা পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণের জন্য একটি কেন্দ্রীয় একাডেমিক মনিটরিং সেল গঠনের প্রস্তাব দেন। পাশাপাশি সংখ্যালঘু অধিকার ও ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষায় মারাকেশ ঘোষণার নীতিমালা একাডেমিকভাবে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের সুপারিশ করেন। গ্লোবাল ফেইথ ফোরামে বক্তব্য প্রদানকালে ঢাবি উপাচার্য বলেন, এই ফোরাম মেধা, গবেষণা ও আশাভিত্তিক বৈশ্বিক সংলাপের একটি অনন্য উদাহরণ। তিনি বাংলাদেশের ইতিহাস তুলে ধরে বলেন, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এ ভূখণ্ডে বিভিন্ন ধর্মের মানুষের মধ্যে সহাবস্থান ও সহনশীলতার সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। তিনি আরও বলেন, এ অঞ্চলে ইসলাম সুফি ঐতিহ্যের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণভাবে বিস্তার লাভ করেছে। যদিও বিভিন্ন সময়ে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে, তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সেগুলোর পেছনে রাজনৈতিক প্ররোচনা কাজ করেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক ভূমিকার কথা উল্লেখ করে অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমদ খান বলেন, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ এবং ২০২৪ সালের জুলাই ছাত্র-আন্দোলন-প্রতিটি জাতীয় পরিবর্তনের কেন্দ্রে ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/156915