‘জনপ্রত্যাশার ইশতেহার’-এ যেসব প্রতিশ্রুতি দিলো ইসলামী আন্দোলন
নির্বাচনী ইশতেহার দিয়েছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। এই ইশতেহারের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে রাষ্ট্র পরিচালনার সর্বত্র শরীয়াহ’র প্রাধান্য, রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন এবং সাম্য ও মানবিক মর্যাদাভিত্তিক সমাজ গঠনের প্রতিশ্রুতি। ১৫ বছরের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি উন্নত ও কল্যাণরাষ্ট্রে রূপান্তরের লক্ষ্য সামনে রেখে নীতিগত অবস্থান, রাষ্ট্র সংস্কার এবং খাতভিত্তিক উন্নয়ন—এই তিন স্তরে পরিকল্পনা সাজানো হয়েছে।
ইশতেহারের শিরোনাম রাখা হয়েছে ‘জনপ্রত্যাশার ইশতেহার’। এর মূল অঙ্গীকার হলো রাষ্ট্র গঠনে নীতিগত ও প্রশাসনিক সংস্কার, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং নাগরিক সেবা নিশ্চিত করা। রাষ্ট্র পরিচালনার সর্বত্র শরীয়াহ’র প্রাধান্য নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।
ইশতেহারটি প্রধানত তিনটি অধ্যায়ে উপস্থাপন করা হয়েছে: ১. রাষ্ট্র গঠনে নীতিগত অবস্থান। ২. রাষ্ট্র সংস্কারে পরিকল্পনা। ৩. খাতভিত্তিক উন্নয়ন পরিকল্পনা।
‘মৌলিক ইশতেহার’ শিরোনামে মোট ৩১টি বিষয় তুলে ধরা হয়েছে এতে। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হলো-
* রাষ্ট্র পরিচালনার সর্বত্র শরীয়াহ-র প্রাধান্য নিশ্চিত করা।
* রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন এবং সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা।
* ১৫ বছরের মধ্যে বাংলাদেশকে উন্নত ও কল্যাণ রাষ্ট্রে পরিণত করা।
* সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ করা।
রাষ্ট্র গঠনে নীতিগত দফা
রাষ্ট্র গঠনে নীতিগত অবস্থানের ওপর মোট ৮টি দফা ঘোষণা করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে-
* ইসলামের মৌলিক নীতিমালার পরিপালন।
* ক্ষমতার চর্চা ও হস্তান্তরে গণতান্ত্রিক পদ্ধতি।
* সকল ধর্ম ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষা।
* সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ।
* দুর্নীতির মূলোৎপাটন এবং নারীর মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠা।
রাষ্ট্র সংস্কারে পরিকল্পনা
রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষ্যে ৬টি প্রধান দফা প্রস্তাব করা হয়েছে ইশতেহারে। উল্লেখযোগ্য দফাগুলো হলো-
* পিআর (Proportional Representation) বা সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতিতে জাতীয় নির্বাচন আয়োজন।
* রাষ্ট্র ও রাজনীতিতে ক্ষমতার ভারসাম্য নিশ্চিত করা।
* সেবাভিত্তিক দক্ষ ও সৎ উন্নত জনপ্রশাসন গড়ে তোলা।
* স্বনির্ভর ও শক্তিশালী বহুমাত্রিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা (ডিফেন্স সিস্টেম) গড়ে তোলা।
বিশেষ কর্মসূচি
জরুরি নাগরিক সেবা ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে ১২ দফা বিশেষ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে-
* হতদরিদ্রদের জন্য মাসে ৫,০০০ টাকা নগদ সহায়তা।
* ১৮-২৪ বছর বয়সীদের জন্য সুদমুক্ত ও জামানতবিহীন এককালীন ঋণ।
* প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের জন্য প্রতিদিন একবেলা পুষ্টিকর খাবার।
* সার্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা কার্ড ও কৃষিকার্ড চালু করা।
খাতভিত্তিক উন্নয়ন পরিকল্পনা: দেশের বিভিন্ন খাতের উন্নয়নে মোট ২৮টি দফা বা ক্ষেত্র চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে:-
* অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ।
* নৈতিকতা সমৃদ্ধ কর্মমুখী বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থা।
* সার্বজনীন কর্মসংস্থান ও প্রবাসী কল্যাণ।
* আঞ্চলিক উন্নয়ন ভারসাম্য (যেমন: পার্বত্য চট্টগ্রাম, বরেন্দ্র ও হাওর অঞ্চলের উন্নয়ন)।
* পরিবেশ ও জলবায়ু সুরক্ষা।
সামাজিক ও নাগরিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে নারী, শিশু, সংখ্যালঘু এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর পূর্ণ সুরক্ষা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে ইশতেহারে। এছাড়া শরীয়াহ মোতাবেক নারীর সম্পত্তির উত্তরাধিকার নিশ্চিত করা এবং কর্মজীবী মায়েদের জন্য ডে-কেয়ার সেন্টার স্থাপনের প্রতিশ্রুতি আছে এতে। আরও বলা হয়েছে, বিচার ব্যবস্থায় দীর্ঘসূত্রতা কমিয়ে নারীর প্রতি সহিংসতা ও ধর্ষণের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা হবে।
১৫ বছরের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি উন্নত ও কল্যাণরাষ্ট্রে পরিণত করার অঙ্গীকার করা হয়েছে।
প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র নীতির ক্ষেত্রে সকল প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সাথে পারস্পরিক সম্মান ও সহযোগিতার ভিত্তিতে ভারসাম্যপূর্ণ বৈদেশিক সম্পর্ক গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে। আরও প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে যে, দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় একটি স্বনির্ভর ও শক্তিশালী বিশ্বমানের ডিফেন্স সিস্টেম (আকাশ, নৌ ও স্থল বাহিনী) গড়ে তোলা হবে।
সামগ্রিকভাবে, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ একটি দুর্নীতিমুক্ত, সাম্যভিত্তিক এবং ইসলামী মূল্যবোধসম্পন্ন রাষ্ট্র গঠনের রূপরেখা এই ইশতেহারে তুলে ধরেছে।
পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/156566