শবেবরাতে কবর জিয়ারত সত্যিই কি উত্তম আমল?
শবে বরাত মুসলমানদের জন্য ক্ষমা, রহমত ও আত্মশুদ্ধির এক মহিমান্বিত রাত। এই রাতে বান্দা আল্লাহর কাছে নিজের গুনাহ মাফের পাশাপাশি মৃত আত্মীয়–স্বজনের জন্য দোয়া করার সুযোগ পায়। আর হ্যাঁ, শবেবরাতের অন্যতম উত্তম ও তাৎপর্যপূর্ণ আমল হলো কবর জিয়ারত—যা আমাদের মৃত্যুর বাস্তবতা স্মরণ করিয়ে দেয় এবং আখিরাতমুখী করে তোলে। কারণ রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজেও এই রাতে কবরস্থানে গিয়ে কবরবাসীদের জন্য দোয়া করতেন। তার অনুসরণেই শবেবরাতে কবর জিয়ারতের গুরুত্ব বিশেষভাবে আলোচিত।
শবে বরাতে কবর জিয়ারত: ফজিলত ও শিক্ষা
যে কোনো দিনই কবর জিয়ারত করা, কবরস্থানে গিয়ে মৃত মুসলমানদের জন্য দোয়া করা এবং মৃত্যুর কথা স্মরণ করা সুন্নত ও সওয়াবের কাজ। রাসুলুল্লাহ (সা.) মাঝে মাঝেই সাহাবিদের কবরস্থান জান্নাতুল বাকিতে যেতেন, সেখানে কিছুক্ষণ অবস্থান করতেন এবং কবরবাসীদের জন্য দোয়া করতেন।
কবর জিয়ারতের গুরুত্ব বোঝাতে নবীজি (সা.) বলেছেন—
كُنْتُ نَهَيْتُكُمْ عَنْ زِيَارَةِ الْقُبُورِ فَزُورُوهَا فَإِنَّهَا تُزَهِّدُ فِي الدُّنْيَا وَتُذَكِّرُ الْآخِرَةَ
‘আমি তোমাদেরকে কবর যিয়ারত করতে নিষেধ করেছিলাম। এখন তোমরা কবর যিয়ারত করো। কেননা তা দুনিয়া বিমুখ বানায় এবং আখেরাত স্মরণ করিয়ে দেয়।’ (ইবনে মাজাহ ১৫৭১)
বিশেষভাবে শাবানের মধ্যরাত, অর্থাৎ শবে বরাতে, নবীজি (সা.) জান্নাতুল বাকিতে গমন করতেন এবং কবরবাসীদের জন্য দোয়া করতেন।
عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا قَالَتْ: فَقَدْتُ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم لَيْلَةً فَخَرَجْتُ فَإِذَا هُوَ بِالْبَقِيعِ فَقَالَ " أَكُنْتِ تَخَافِينَ أَنْ يَحِيفَ اللَّهُ عَلَيْكِ وَرَسُولُهُ " . قُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنِّي ظَنَنْتُ أَنَّكَ أَتَيْتَ بَعْضَ نِسَائِكَ . فَقَالَ " إِنَّ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ يَنْزِلُ لَيْلَةَ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ إِلَى السَّمَاءِ الدُّنْيَا فَيَغْفِرُ لأَكْثَرَ مِنْ عَدَدِ شَعْرِ غَنَمِ كَلْبٍ
হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, এক রাতে আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে হারিয়ে ফেললাম (বিছানায় পেলাম না)। আমি (তার সন্ধানে) বের হলাম। এসে দেখলাম তিনি বাকী কবরস্থানে আছেন। তিনি বলেনঃ তুমি কি ভয় করছ আল্লাহ ও তার রাসূল তোমার প্রতি কোন অবিচার করবেন? আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমি অনুমান করলাম আপনি আপনার অন্য কোন বিবির নিকটে গিয়েছেন। তিনি বললেনঃ আল্লাহ্ তা’আলা মধ্য শা’বানে (১৫ তারিখের রাতে) দুনিয়ার কাছের আকাশে অবতীর্ণ হন। তারপর কালব গোত্রের বকরী পালের লোমের চেয়েও বেশী সংখ্যক লোককে তিনি মাফ করে দেন।’ (তিরমিজি ৭৩৯, মুসনাদে আহমদ ২৬০১৮)
এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, শবে বরাত ক্ষমা ও দয়ার এক বিশেষ রাত। তাই এ রাতে নবীজির অনুসরণে আমরা আমাদের মৃত আত্মীয়–স্বজনের কবর জিয়ারত করতে পারি এবং তাদের জন্য দোয়া করতে পারি। আশা করা যায়, আল্লাহ তাআলা আমাদের দোয়ায় তাদের গুনাহ ক্ষমা করবেন, মর্যাদা বৃদ্ধি করবেন এবং আমাদেরকেও ক্ষমা ও সওয়াব দান করবেন।
কবর জিয়ারতের নিয়ম
কবর জিয়ারতের সময় কিছু আদব ও নিয়ম মেনে চলা জরুরি—
১. কবরের পাশে দাঁড়িয়ে মাইয়েতের চেহারার দিক বরাবর মুখ করে সালাম দেওয়া।
২. এরপর মৃতের সওয়াবের উদ্দেশ্যে কুরআন তিলাওয়াত, দরুদ শরিফ ও বিভিন্ন দোয়া পড়া।
৩. হাদিসে বর্ণিত ফজিলতপূর্ণ সুরা ও আয়াত— যেমন সুরা ফাতেহা, আয়াতুল কুরসি, সুরা ইখলাস— তিলাওয়াত করে সওয়াব পৌঁছানো যায়।
৪. দোয়া করার সময় কবরের দিকে মুখ না করে কিবলামুখী হয়ে দাঁড়ানো উত্তম।
৫. কেউ চাইলে হাত না তুলে মনেও দোয়া করতে পারে।
কবর জিয়ারতের দোয়া
কবরস্থানে গেলে রাসুলুল্লাহ (সা.) কবরবাসীদের সালাম দিয়ে দোয়া করতেন এবং সাহাবিদেরও তা শিখিয়েছেন। হজরত বুরায়দাহ (রা.) বর্ণিত দোয়া—
السَّلَامُ عَلَيْكُمْ أَهْلَ الدِّيَارِ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُسْلِمِينَ وَإِنَّا إِنْ شَاءَ اللَّهُ بِكُمْ لَلَاحِقُونَ نَسْأَلُ اللَّهَ لَنَا وَلَكُمُ الْعَافِيَةَ
উচ্চারণ: ‘আসসালামু আলাইকুম আহলাদ দিয়ারি মিনাল মুমিনিনা ওয়াল মুসলিমিনা, ওয়া ইন্না ইনশাআল্লাহু বিকুম লালাহিকুনা, নাসআলুল্লাহা লানা ওয়ালাকুমুল আফিয়াহ’
অর্থ: ‘হে কবরবাসী মুমিন ও মুসলিমগণ! তোমাদের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক। ইনশাআল্লাহ আমরা তোমাদের সাথেই মিলিত হবো। আমরা আমাদের ও তোমাদের জন্য আল্লাহর কাছে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রার্থনা করছি।’ (মুসলিম ৯৭৫)
ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত আরেকটি দোয়া—
السَّلَامُ عَلَيْكُمْ يَا أَهْلَ الْقُبُورِ يَغْفِرُ اللَّهُ لَنَا وَلَكُمْ أَنْتُمْ سَلَفُنَا وَنَحْنُ بِالْأَثَرِ
উচ্চারণ: ‘আসসালামু আলাইকুম ইয় আহলাল কুবুরি ইয়াগফিরুল্লাহু লানা ওয়ালাকুম আংতুম সালাফুনা ওয়া নাহনু বিল আছারি।’
অর্থ: ‘হে কবরবাসী! তোমাদের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক। আল্লাহ আমাদের ও তোমাদের গুনাহ ক্ষমা করুন। তোমরা আমাদের আগে গিয়েছ, আমরাও তোমাদের অনুসরণ করব।’ (তিরমিজি ৫৯৬)
কবর জিয়ারতে যে কাজগুলো থেকে বিরত থাকতে হবে
কবরস্থানে গেলে শরিয়তের নিষেধাজ্ঞাগুলো স্মরণ রাখা জরুরি—
কবরের ওপর বসা
কবরের ওপর বসা আদববিরোধী। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘কবরের ওপর বসার চেয়ে আগুনের ওপর বসা উত্তম।’ (মুসলিম ৯৭১)
কবরের ওপর জুতো পরে হাঁটা
কবরের ওপর জুতো পরে হাঁটাহাঁটি নিষিদ্ধ। (নাসাঈ ১০৭)
কবরের দিকে ফিরে নামাজ আদায়
কবরের দিকে ফিরে নামাজ পড়া নিষেধ। (মুসলিম ৯৭২)
কবরস্থানে পশু জবাই করা
এটি জাহেলি যুগের প্রথা; নবীজি (সা.) তা নিষেধ করেছেন। (আবু দাউদ ৩২২২)
হাসি-তামাশা ও উৎসব করা
কবরস্থান ইবাদত ও ইবরতের স্থান—উল্লাসের নয়। (আবু দাউদ ২০৪২)
এ ছাড়া কবরে সেজদা করা, কবরবাসীর কাছে কিছু চাওয়া বা তাদের নামে মানত ও উৎসর্গ করা শিরক ও গুরুতর গুনাহ।
শবেবরাতের রাত আমাদের জন্য আত্মসমালোচনা, ক্ষমা প্রার্থনা এবং আখিরাতের প্রস্তুতির এক অনন্য সুযোগ। কবর জিয়ারত এই প্রস্তুতির একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম— যা আমাদের হৃদয়কে নরম করে, অহংকার ভাঙে এবং মৃত্যুর বাস্তবতা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। নবিজী (সা.)-এর সুন্নত অনুসরণ করে শিরক ও বিদআত থেকে দূরে থেকে যদি আমরা শবেবরাতে কবর জিয়ারত ও দোয়ার আমল করি, তবে ইনশাআল্লাহ এই রাত আমাদের জন্য ক্ষমা ও কল্যাণের বার্তা নিয়ে আসবে।
পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/156507