ভারতীয় মিডিয়া এবং আওয়ামী লীগ প্রতিনিয়ত অপতথ্য ছড়াচ্ছে : প্রেস সচিব
ভারতীয় মিডিয়া এবং আওয়ামী লীগ প্রতিনিয়ত অপতথ্য ছড়াচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম।
তিনি বলেন, ভারতের অনেক পত্রিকা রয়েছে, যারা কোনো দিন বাংলাদেশ নিয়ে সঠিক তথ্য দেয়নি। আমরা দেখেছি আনন্দবাজারের মতো পত্রিকা মিথ্যা তথ্য দিয়েছে; অথচ তারা ভারতে সর্বাধিক পঠিত বাংলা পত্রিকা। ভারত খুব পরিকল্পিতভাবে এই মিসইনফরমেশন ও ডিজইনফরমেশন ছড়াচ্ছে।
সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির কেন্দ্রীয় অডিটোরিয়ামে ‘পলিসি কনক্লেভ অন মিসইনফরমেশন : চ্যালেঞ্জেস টু গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেমোক্রেসি’ শীর্ষক নীতিসংলাপে এসব কথা বলেন তিনি। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সার্বিক সহযোগিতায় এ নীতিসংলাপের আয়োজন করে ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি সাংবাদিক সমিতি (ডিআইইউসাস)।
প্রেস সচিব বলেন, আমরা সবাই ডেমোক্রেসি চাচ্ছি। এর বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী গ্রুপ কাজ করছে। আমাদের চ্যালেঞ্জটা আসছে মিসইনফরমেশন এবং ডিজইনফরমেশন থেকে। ভুয়া তথ্য ছড়ানোর এই চর্চা লোকাল সোর্স এবং আউটসাইড থেকেও হয়। প্রথমবারের মতো আমরা দেখলাম গত ১৮ মাসে ভারতীয় মিডিয়া বাংলাদেশকে নিয়ে ভয়াবহ রকমের মিসইনফরমেশন ছড়াচ্ছে। এটা ভয়াবহ ছিল। গত ৫৪ বছরে বাংলাদেশের কোনো সরকার এটার মুখোমুখি হয়নি। তারা প্রতিদিন মিথ্যা তথ্য ছড়িয়েছে। অফ ইন্ডিয়া নামের একটি ওয়েবসাইট প্রতিদিন ঘৃণা ছড়িয়েছে। এটা যে শুধু তারা করছে বিষয়টা শুধু তা-ই নয়। এটা তাদের বড় বড় দৈনিক পত্রিকা ও টেলিভিশন স্টেশনগুলোও করছে। এটা কি তারা নিজেরাই করছে, নাকি এর অলক্ষ্যে কেউ কলকাঠি নাড়ছে?
শফিকুল আলম বলেন, আমরা একটা স্মুথ ট্রানজিশন (ক্ষমতার পালাবদল) করতে চাই। একটা ভালো নির্বাচন করতে চাই। আমরা একটি গণতান্ত্রিক যুগ দেখতে অধীর আগ্রহে আছি। কিন্তু বাইরে ইমেজ তৈরি করে দেওয়া হচ্ছে—এখানে গণতন্ত্র এলেও সংখ্যালঘুরা নিরাপদ নয়। ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে—বড় রাজনৈতিক দলের কোনো রাজনৈতিক অধিকার রাখা হচ্ছে না। ইন্ডিয়ান মিডিয়া এবং আওয়ামী লীগ এটা অহরহ করছে। এটা করে তারা আমাদের সরকার এবং গণতন্ত্রকে হুমকিতে ফেলছে।
দৈনিক প্রতিদিনের বাংলাদেশের সম্পাদক ও বিএনপি চেয়ারপারসনের সাবেক প্রেস সচিব মারুফ কামাল খান বলেন, তথ্য হচ্ছে সংবাদের কাঁচামাল। তথ্য মানেই কিন্তু সংবাদ নয়। এই তথ্য দিয়েই সংবাদের ভিত্তি গড়ে ওঠে। আমাদের অবশ্যই ভুল তথ্য সংশোধনের উপায় আছে, কিন্তু ইচ্ছা করে তথ্য বিকৃত করার এই চর্চা থেকে আমাদের বের হতে হবে। এটা করতে হলে কতগুলো জায়গা আমাদের ঠিক করতে হবে। আমরা বলি ‘গণমাধ্যম’, কিন্তু দীর্ঘদিন আমরা গণমানুষের কথা বলিনি। এর মাধ্যমে আমরা একটা পক্ষকে প্রমোট করার চেষ্টা করেছি। আরেক পক্ষকে শেষ করে দিতে চেয়েছি। এটা অপতথ্যের একটি অংশ। ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার শেষ হওয়ার পরও আমরা সেই চিন্তা-চেতনা থেকে বের হতে পারিনি। গণমাধ্যম গণবিরোধী ভূমিকায় থেকে এই ফ্যাসিবাদের উত্থানে সহায়তা করেছে। ফ্যাসিবাদ যে আমাদের জাতিকে ধ্বংস করেছে, এটার পেছনে গণমাধ্যমের বিশাল দায় রয়ে গেছে। এটা স্বীকার করতেই হবে। গণমাধ্যমকে সত্যিকারের গণমানুষের কণ্ঠ হয়ে উঠতে হবে।
তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠার জন্য গণমাধ্যমের দায় রয়ে গেছে। গণমাধ্যমের উচিত ছিল গণমানুষের কণ্ঠস্বর হওয়া। কিন্তু হতাশার বিষয়, সেটা হয়নি। গণমাধ্যম আজ সোশ্যাল মিডিয়ার দিকে তাকিয়ে থাকে। আমাদের গণমাধ্যম আজ সাংঘাতিক জনরোষের ভয়ে ভীত। এই জায়গা থেকে বের হয়ে আসতে হবে।
ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক ড. জাহিদুল ইসলাম বলেন, এআই যুগের এই সময় আমাদের বিভ্রান্ত করছে। রাষ্ট্র এখনো বিভ্রান্তির মধ্যে রয়ে গেছে। এই জায়গা থেকে আমাদের বের হয়ে আসতে হবে।
উপাচার্য বলেন, গত সরকারের আমলে আমরা ন্যাচারাল ট্রমার মধ্যে ছিলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ের আলোচনায় কিংবা শ্রেণিকক্ষে যে বক্তব্য দেওয়া দরকার ছিল, সেটা আমরা দিতে পারিনি।
ইউনাইটেড নিউজ অব বাংলাদেশের (ইউএনবি) সম্পাদক মাহফুজুর রহমান বলেন, আমাদের গ্রহণযোগ্য কোনো মিডিয়া পলিসি নেই। আরও কয়েক দশক আগে আমাদের যে গণমাধ্যম নীতিমালা থাকা দরকার ছিল, আমরা এখনো তা ভাবছি। এখনো আমরা পরিকল্পনার কথা বলি। এখনো আমরা বলি, এই নীতিমালা থাকা উচিত। তবে এটা অনেক আগেই থাকা উচিত ছিল।
তিনি বলেন, পুরো পৃথিবীকে এখন ক্যাপিটালিজম শাসন করছে। গণমাধ্যমও এর বাইরে নয়। আজকাল ধর্মের অনেক বিষয় বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার হচ্ছে। একই অবস্থা গণমাধ্যমেরও। এই পরিস্থিতি থেকে বের হয়ে গণমাধ্যমকে গণমুখী হতে হবে। নিউজরুম সাংবাদিকরা চালায়। এগুলো গ্রহণ করে সমাজের সদস্যরা। কিন্তু আজকাল আমাদের চালায় আমাদের অডিয়েন্স। আমরা অডিয়েন্সকে চালাই না। পুরো বিষয়টাকে ভারসাম্য করতে হবে। এটা করতে হলে দক্ষ সাংবাদিকদের বিকল্প নেই।
বাংলাদেশ সেক্রেটারিয়েট রিপোর্টার্স ফোরামের সাবেক সভাপতি ফসিহ উদ্দিন মাহতাব বলেন, একটি মিথ্যা সংবাদ সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য অনেক ক্ষতিকর। আমরা দেখেছি রাজনৈতিক সরকারের আমলে সাংবাদিকরা অনেক প্রতিবন্ধকতা ও সমস্যা মোকাবিলা করেছে। তবে এই সরকারের আমলে তথ্যপ্রবাহের অবাধ সুবিধাকে আমরা বারবার অপব্যবহার করছি। এই সমস্যা থেকে বের হতে সরকারের উদ্যোগ আরও জোরালো করা উচিত।
ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগের চেয়ারম্যান ড. শেখ মোহাম্মদ শফিউল ইসলাম বলেন, ভুল তথ্য এখন আর শুধু যোগাযোগের সমস্যা নয়, এটি একটি কাঠামোগত সংকট। সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যালগরিদম, রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং দুর্বল মিডিয়া লিটারেসি—এই তিনটি একসঙ্গে মিসইনফরমেশনকে শক্তিশালী করছে।
তিনি বলেন, এই পরিস্থিতিতে আইন একমাত্র সমাধান হতে পারে না। প্রয়োজন সমন্বিত নীতি, শক্তিশালী গণমাধ্যম চর্চা এবং শিক্ষাব্যবস্থায় মিডিয়া লিটারেসির কার্যকর অন্তর্ভুক্তি। শিক্ষার্থীদের সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তি গড়ে তুলতে পারলেই আমরা এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারব।
পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/156340