ভোট, বিশ্বাস ও গণতান্ত্রিক দায়বদ্ধতা

ভোট, বিশ্বাস ও গণতান্ত্রিক দায়বদ্ধতা

ভোট একটি দেশের মানুষের মৌলিক গণতান্ত্রিক অধিকার। এটি মানুষকে নিজের শাসক বেছে নেওয়ার সুযোগ দেয় এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় মত প্রকাশের ক্ষমতাও দেয়। ভোটের মাধ্যমে নির্ধারিত হয় দেশের রাজনৈতিক পথ, অর্থনৈতিক পরিকল্পনা নয় এবং সামাজিক উন্নয়নের দিকনির্দেশনা। তাই ভোট শুধু আনুষ্ঠানিক কাজ নয় ভোট মানে আশা, বিশ্বাস এবং একটি ভালো ভবিষ্যতের প্রত্যাশা। একটি দেশের ভবিষ্যৎ কোন পথে যাবে, তা নির্ভর করে জনগণের দেওয়া ভোটের ওপর। প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব হলো যোগ্য, সৎ ও দায়িত্বশীল প্রার্থীকে ভোট দেওয়া। গণতন্ত্রের শক্তি এখানেই ক্ষমতার উৎস জনগণ। তবে এই শক্তি কার্যকর হয়, যখন নির্বাচিত প্রতিনিধিরা জনগণের রায়ের মর্যাদা রক্ষা করেন। 

ভোটের আগে প্রার্থীরা নানা প্রতিশ্রুতি দেন, উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, রাস্তা-ঘাট এবং দুর্নীতিমুক্ত সমাজ। এসব প্রতিশ্রুতি শুনে জনগণের মনে আশা জন্মায়। মনে হয়, নির্বাচনের পর সব সমস্যার সমাধান হবে। কিন্তু বাস্তবে অনেক সময় দেখা যায় ভোটের পর কথা আর কাজের মধ্যে বড় ফারাক থাকে। বহু নির্বাচনে জনগণ এই চিত্র দেখেছে।

ইশতেহার তখনই গুরুত্বপূর্ণ, যখন তা বাস্তবায়নের ইচ্ছা ও সামর্থ্য থাকে। অসম্ভব প্রতিশ্রুতি দেওয়া জনগণের সঙ্গে প্রতারণার সমান। বড় স্বপ্ন দেখানোর চেয়ে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা বেশি দরকার। জনগণ চায় ধাপে ধাপে বাস্তবায়নযোগ্য উদ্যোগ, স্বচ্ছতা এবং নেতাদের দায়িত্বশীলতা। জনগণ প্রার্থীদের বিশ্বাস করে ভোট দেয়। এই ভোট শুধু রাজনৈতিক সমর্থন নয়, এটি মানুষের আশা ও আস্থার প্রতিফলন। যখন সেই বিশ্বাস ভেঙে যায়, তখন শুধু ব্যক্তি বা দল নয়, ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো গণতন্ত্র। মানুষের মধ্যে রাজনীতির প্রতি আগ্রহ কমে যায় এবং অংশগ্রহণও কমে।

ভোটের সময় প্রার্থীরা শহর-গ্রাম, হাট-বাজার, অবহেলিত এলাকায় যান। সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলেন, তাদের সমস্যা শোনেন এবং সমাধানের আশ্বাস দেন। তখন মনে হয় নেতা ও জনগণের মধ্যে দূরত্ব নেই। কিন্তু ভোটে জয়ের পর অনেক সময় সেই চিত্র বদলে যায়। নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সঙ্গে দেখা করা কঠিন হয়ে পড়ে। ভিআইপি ব্যবস্থার কারণে জনগণকে দূরে সরিয়ে রাখা হয়। কিছু জনপ্রতিনিধি দীর্ঘদিন নিজের নির্বাচনি এলাকায় আসেন না। যে এলাকায় তারা ভোটে জয়ী হয়েছে, সেখানকার ভাঙা রাস্তা, ড্রেনেজ সমস্যা, স্কুল ও হাসপাতালের দুরবস্থা দীর্ঘদিন থাকে। তখন মানুষের মনে প্রশ্ন জাগে ভোটের সময়ই কি কেবল আমাদের দরকার ছিল? 

একজন জনপ্রতিনিধি শুধু ক্ষমতার আসনে বসার জন্য নির্বাচিত হন না। তিনি জনগণের প্রতিনিধি এবং কণ্ঠস্বর। জনগণের সুখ-দুঃখ, সমস্যা ও চাহিদা বোঝাই তার প্রধান দায়িত্ব। নেতৃত্ব মানে মানুষের পাশে থাকা এবং কথা ও কাজে মিল রাখা। ক্ষমতায় থাকা মানুষ যদি জনগণকে ভুলে যায়, তবে সেই নেতৃত্বের কোনো মূল্য থাকে না। 

এখন সময় এসেছে নেতৃত্বে পরিবর্তনের। সমাজ চায় দূরদর্শী ও সৃজনশীল নেতা, যিনি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথা ভাববেন, জনগণের বন্ধু হবেন এবং প্রতিশ্রুতিকে বাস্তবায়ন করবেন। ভোটের প্রকৃত মূল্য তখনই বোঝা যায়, যখন জনগণের বিশ্বাস অটুট থাকে এবং নেতারা সেই বিশ্বাসের সম্মান রাখেন। শেষ কথা হলো ভোট একটি অধিকার। সেই অধিকারকে সম্মান করা নেতা ও নাগরিক উভয়ের দায়িত্ব। জনগণ সচেতন হোক, নেতৃত্ব হোক মানবিক, সৎ ও দায়িত্বশীল। তবেই ভোট হবে গণতন্ত্রের শক্ত প্রতীক, আর রাষ্ট্র এগিয়ে যাবে জনগণের স্বপ্নের পথে। 

লেখক:

শুভ কর্মকার

শিক্ষার্থী, ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেমস্ বিভাগ
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর।

পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/156332