করতোয়া মাল্টিমিডিয়া স্কুল এ্যান্ড কলেজে হয়ে গেল বাঙালি সংস্কৃতির অন্যতম অনুষঙ্গ ‘পিঠা উৎসব’

করতোয়া মাল্টিমিডিয়া স্কুল এ্যান্ড কলেজে হয়ে গেল বাঙালি সংস্কৃতির অন্যতম অনুষঙ্গ ‘পিঠা উৎসব’

স্টাফ রিপোর্টার : এখন মাঘমাস; ঋতু অনুযায়ী চলছে শীতকাল। শীতকালীন এই মাসটি নিয়ে প্রচলন রয়েছে ‘মাঘের জারে বাঘ কাঁদে’। যেহেতু মাঘের প্রায় অর্ধেক দিন পার হয়ে গেছে, তাই তেমন শীত অনুভূত নেই। শীতের হাল্কা আমেজ আর প্রকৃতির কিছুটা রুক্ষ্মতা বলে দিচ্ছে বসন্ত আসছে।

শীতের এই মিষ্টি আবহাওয়ায় গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্য আর আধুনিকতার মেলবন্ধনে বগুড়ার করতোয়া মাল্টিমিডিয়া স্কুল এ্যান্ড কলেজ প্রাঙ্গণে হয়ে গেল দিনব্যাপী বর্ণিল পিঠা উৎসব। দেশীয় সংস্কৃতিকে নতুন প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে দিতে আয়োজিত এই উৎসবে মেতে ওঠে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকবৃন্দ।

প্রতিষ্ঠান চত্বরে পা দিতেই চোখে পড়ে সারিবদ্ধ স্টল। প্রতিটি স্টলে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা নিজ হাতে তৈরি রকমারি পিঠার পসরা নিয়ে বসেন। ভাপা, চিতই, পাটিসাপটা, পুলি, দুধপুলি, মালপোয়া থেকে শুরু করে প্রায় শতাধিক রকমের পিঠার সমারোহ ছিল স্টলগুলোতে। উৎসবের বাড়তি আমেজ যোগ করতে চত্বরে ছিল নাগরদোলা ও দোলনাসহ বিভিন্ন আকর্ষণীয় রাইডস, যেখানে দিনভর আনন্দের জোয়ারে ভাসে কোমলমতি শিশুরা।

এছাড়া বাঙালি সংস্কৃতির ঐতিহ্যবাহী পিঠা উৎসব উপলক্ষে তৈরি করা হয়েছিলো উম্মুক্ত মঞ্চ। সেখানে দিনব্যাপি পরিবেশিত হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। সকালে বেলুন উড়িয়ে উৎসবের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান মোজাম্মেল হক। এ সময় উপস্থিত ছিলেন প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ অসিত কুমার সরকার, উপাধ্যক্ষ আঞ্জুমান আরা বেগমসহ প্রতিষ্ঠানের সকল শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবকসহ আমন্ত্রিত অতিথিবৃন্দ।

প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ অসিত কুমার সরকার বলেন, আমাদের সংস্কৃতির মূল ভিত্তির অন্যতম একটি হল পিঠা। সেই পিঠা শহুরে জীবন থেকে দিন দিন হারিয়ে যেতে বসেছে। এখন কারও পিঠা খেতে মন চাইলে হোটেল থেকে কিনে খান। আমাদের জীবন থেকে বাঙালিয়ানা হারিয়ে যাচ্ছে।

আমরা ভুলে যেতে বসেছি আমাদের শেকড় ও সংস্কৃতিকে। এখন নেই পৌষ সংক্রান্তি বা চৈত্র সংক্রান্তি । তাই নতুন প্রজন্মকে আমাদের ঐতিহ্যবাহী এই সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় করে দেওয়ার জন্যই এ ধরনের উৎসবের আয়োজন করা হয়েছে।

প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান মোজাম্মেল হক বলেন, বাঙালির যে নিজস্ব একটি সংস্কৃতি আছে, এই উৎসবগুলো তারই অংশ। এরকম উৎসব শহুরে জীবনের ক্লান্তি কিছুটা দূর করে দেওয়ার পাশাপাশি আগামী প্রজন্মকে বিভিন্ন পিঠার সাথে পরিচয় করে দেওয়া।

এখনকার শিশু-কিশোররা পিঠা খেলেও সেগুলোর নামই ঠিকমত বলতে পারে না। এটি আমাদের একটি বড় দূর্বলতা। অমাদের ছোট বেলায় শীত-গ্রীস্মঋতুতে স্কুল বন্ধ হলে আমরা দাদা-নানার বাসায় যেতাম। তখন গ্রামের এক বাড়িতে পিঠা তৈরি হলে অন্য সব বাড়ির শিশুদের সই পিঠা খাওয়ার নিমন্ত্রণ থাকতো। আমরা হৈ-হুল্লোড়করে পিঠা খেতে যেতাম। সেই ঐতিহ্য এখন আর নেই। এরকম আয়োজনে শিশুরা একটু হলেও সেই আনন্দ পেতে পারে।

খেজুরের গুড়, নারিকেল কোড়া, চালের গুড়া ও দুধের মিশ্রণে লেচি কাটা এক ধরণের পিঠা প্রদর্শন ও বিক্রি হচ্ছে ‘পিঠা যাবে পেটুক বাড়ি’ স্টলে। পিঠাটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘চুষি’ পিঠা। একাদশের রঙ্গন শাখার ৭ জন শিক্ষার্থীর ওই স্টলের দলনেতা জিম জানায়, এই উৎসবটির জন্য আমরা সারা বছর অপেক্ষা করি। এই দিনটি এলেই মনে হয়, আমরা সবাই যেনো সত্যি বাঙালি হয়ে গেছি। কেজি শ্রেণির শিক্ষার্থী পিহু’র নামে তার মা রুমানা আক্তার দিয়েছেন ‘পিহু পিঠাঘর’।

ওই স্টলে প্রায় ১৫ রকমের পিঠা ও হালুয়া প্রদর্শন ও বিক্রি করছেন রুমানা। রুমানা জানান, তার তৈরি পিঠা ও হালুয়ার বিশেষত্ব হলো সব পদেই সবজি ব্যবহার করা হয়েছে। যেমন মুলার হালুয়া, আলুর হালুয়া, গাজর, মিষ্টি আলু দিয়ে তৈরি পিঠা।

এখনকার শিশুরা সবজি খেতে চায় না বলেই এমন আয়োজন বলে জানান তিনি। একাদশের জিনিয়া ও টগর শাখার শিক্ষার্থী অন্তর, শামী ও সীমন্ত পিঠা মেলায় পিঠা তৈরি করতে না পারলেও ছোলা, চানাচুরের সংমিশ্রণে ১০ টাকা প্লেট ঝাল মুড়ি মাখা বিক্রি করছে। সীমান্ত জানায়, আমরা ছেলে মানুষ পিঠা তৈরি করতে না পারলেও মুড়ি মাখা করতে পারি। আর মেলায় পিঠাসহ নানা রকম মিষ্টান্ন খাওয়ার পর সবাই একটু ঝাল খেতে চান, এজন্যই এমন আয়োজন।

চালের আটা, গুড়, বাদাম ও তিল দিয়ে তৈরি গোলাকৃতি এক পিঠার নাম দেওয়া হয়েছে ‘সতীন মোচড়’ পিঠা। শিক্ষক হাবিবা সুলতানার ‘পিঠারি’ স্টলের ভাইরাল ওই পিঠা সম্পর্কে বলতে গিয়ে হাবিবা বলেন, সতীনদের পিঠা খাইয়ে বশ করার জন্য এই পিঠার নমকরণ এমন করা হয়েছে।

শিক্ষকদের আরেক স্টল ‘অবরা তে’ ঐতিহ্যবাহী দুধ চিতই, ভাপা, তেলপোয়া, হৃদয় হরণসহ প্রায় ৫৪ রকমের পিঠা প্রদর্শন ও বিক্রি করেছেন শিক্ষকরা। অবরা’র প্রধান অদিতি সিংহ জানান, তাদের স্টলের সবচে স্পেশাল পিঠা হচ্ছে দুধ চিতই। কেননা দুধ চিতইয়ের মূল স্বাদটা সবাই আনতে পারেন না। চিনা বাদাম, জলপাই, আম, চালতা, মরিচসহ ১২ ধরণের আচার নিয়ে শিক্ষক সুলতানা নাজনীনের স্টল ‘শিল্পধারা’।

নাজনীন জানান, বাদামের আচার সচরাচর কেউ করেন না। বাইরে এই আচার অনেক দাম দিয়ে কিনতে হয়। শিক্ষার্থীদের জন্য তিনি মাত্র ১০ টাকার একটি প্যাকেটে এই আচার বিক্রি করেছেন যেনো সহজেই যে কেউ এই আচারের স্বাদটা নিতে পারেন।

পিঠা উৎসবে আসা ওই প্রতিষ্ঠানের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী তামজিদুল হক আরাফ জানায় দ্বিতীয় শ্রেণি থেকে সে এই প্রতিষ্ঠানে লেখাপড়া করছে। প্রতি বছর এই উৎসবে এসে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, খেলাধুলা ও খাওয়া দাওয়া করে। এইদিন ক্লাস থাকে না, পড়ালেখা থাকে না, তাই মজা হয়। তবে এবার সে খুব উদ্বিগ্ন হয়ে আছে স্কুলের পিকনিক নিয়ে।

আগামি ৬ ফেব্রুয়ারি স্কুল থেকে সাভারের ফ্যান্টাসি কিংডমে নিয়ে যাওয়া হবে তাই এবার এই উৎসবের চেয়ে পিকনিক নিয়েই বেশি আনন্দিত আমি। উৎসবে আসা স্মৃতি খাতুন নামে এক অভিভাবক জানান, তার মেয়ে এই স্কুলে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ছে। কেজি শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছিলো। তখন থেকেই উৎসবে আসেন। স্মৃতি বলেন, বাসায় তো এত পদের পিঠা তৈরি করা হয় না, এখানে যত রকমের পিঠা পাওয়া যায়। তাই এই উৎসবটি তার কাছে বিশেষত্ব নিয়ে আসে।  

উৎসব শেষে পিঠার মান ও সংখ্যা বিবেচনা করে পাঁচটি স্টলকে পুরস্কার দেওয়া হয়। এবার প্রথম হয়েছে শিক্ষকদের ‘অবরা’ দ্বিতীয় হয়েছে শিক্ষকদের স্টল ‘দুই সখি পিঠাঘর’ আর তৃতীয় হয়েছে তিনটি স্টল। ‘পিহু পিঠাঘর’ ‘কেক প্যালেস’ এবং ‘শীত বিলাসের পিঠার স্বাদ’।

পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/156245