নির্বাচনী মিথ্যা আশ্বাস পাপের কাজ
মানবতার ধর্ম ইসলামে প্রতিশ্রুতি দেওয়া এবং তা রক্ষা করা আমানততুল্য। তাই কোনো প্রতিশ্রুতি দিলে তা রক্ষা করা আবশ্যক। প্রতিশ্রুতির গুরুত্ব প্রসঙ্গে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আর তোমরা অঙ্গীকার পূর্ণ করো; নিশ্চয়ই অঙ্গীকার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।’ -সূরা বনি ইসরাঈল: ৩৪
প্রায়ই দেখা যায়, নির্বাচনের সময় রাজনৈতিক নেতারা জনগণের কাছে অনেক প্রতিশ্রুতি দেন। নির্বাচন শেষ হলে সেসবের আর কোনো খবর থাকে না, এটা অনেকটা রুটিন কাজে পরিণত হয়েছে। যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। ইসলামের বিধান হলো, নেতারা যেসব প্রতিশ্রুতি দেন তা শুধু কথার কথা নয়, বরং তা একটি অঙ্গীকার, যার জন্য দুনিয়া ও আখেরাতে জবাবদিহি করতে হবে।
না হলে মিথ্যা আশ্বাস দেওয়ার কারণে শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে। এছাড়া হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) মিথ্যা বলা ও প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করাকে মুনাফিকির সুস্পষ্ট আলামত হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘মুনাফিকের লক্ষণ তিনটি- যখন কথা বলে মিথ্যা বলে, যখন প্রতিশ্রুতি দেয় তা ভঙ্গ করে এবং যখন আমানত রাখা হয় খেয়ানত করে।’ -সহিহ বোখারি: ৩৪
বর্ণিত হাদিস অনুসারে নির্বাচনের আগে জেনেশুনে মিথ্যা আশ্বাস দেওয়া একজন মুসলিমের চরিত্রের সঙ্গে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক। এতে মিথ্যা বলা ও প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করার গুনাহ হয়।
অন্য হাদিসে হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আমাদের সঙ্গে প্রতারণা করল, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।’ -সহিহ মুসলিম: ২৯৪
সুতরাং এটা স্পষ্ট যে, জনগণের ভোট লাভের জন্য মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেওয়া নিঃসন্দেহে প্রতারণার অন্তর্ভুক্ত। এ বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুল এবং প্রার্থীদের সতর্ক থাকতে হবে।
মনে রাখতে হবে, ইসলামে রাজনৈতিক নেতৃত্ব কোনো সম্মান বা ভোগের বস্তু নয়, বরং এটি একটি কঠিন দায়িত্ব ও আমানত। হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘তোমরা অতি সত্বর নেতৃত্বের লোভ করবে। (স্মরণ রেখো) এটি কেয়ামতের দিন অনুতাপের কারণ হবে। সুতরাং (পার্থিব জীবনে) তা কত উত্তম ও (পরকালে) নিকৃষ্ট বিষয়!’ -সহিহ বোখারি: ৭১৪৮
সুতরাং নেতৃত্ব ও ক্ষমতা লাভের উদ্দেশ্যে যদি কেউ মিথ্যা আশ্বাস দেয়, মিথ্যা অঙ্গীকার করে- তাহলে সে পরকালে লজ্জিত হবে। আর রাজনৈতিক মিথ্যা আশ্বাস শুধু ব্যক্তিগত গুনাহ নয়, বরং এর সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষতিও ব্যাপক। কেননা এর ফলে- জনগণের মধ্যে নেতৃত্বের প্রতি আস্থা নষ্ট হয়। ন্যায় ও ইনসাফের পরিবর্তে প্রতারণার সংস্কৃতি গড়ে ওঠে। সমাজে হতাশা ও অবিশ্বাস বৃদ্ধি পায়। রাজনীতিকে মানুষ গুনাহের পেশা মনে করতে শুরু করে। আর ইসলাম কখনোই এমন সমাজব্যবস্থা সমর্থন করে না, যেখানে মিথ্যা ও প্রতারণা স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত হয়।
ওপরের আলোচনা থেকে প্রমাণিত হয় যে যদি কোনো রাজনৈতিক নেতার অন্তরে এই বিশ্বাস থাকে যে তিনি তার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করবেন না অথবা করার সক্ষমতা ও ইচ্ছা নেই, তবু যদি তিনি তা জনগণের আস্থা অর্জন করতে এবং ভোট পেতে মিথ্যা আশ্বাস দেন, তবে শরিয়তের দৃষ্টিতে তা স্পষ্ট হারাম। কেননা এটি মিথ্যা, প্রতারণা, প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ ও আমানতের খেয়ানত ইত্যাদি গুনাহের পরিমণ্ডিত।
তবে যদি কেউ সদিচ্ছা নিয়ে, বাস্তব সক্ষমতার ভিত্তিতে প্রতিশ্রুতি দেন এবং পরে অনিচ্ছাকৃত বাধার কারণে তা পূরণ করতে না পারেন তাহলে তার গুনাহ হবে না।
একজন মুসলিম রাজনীতিকের উচিত সত্যবাদিতা, স্বচ্ছতা ও বাস্তবতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া। ইসলাম এমন নেতৃত্ব চায়, যারা কম কথা বলবে, কিন্তু সত্য বলবে; যারা প্রতিশ্রুতি কম দেবে, কিন্তু তা রক্ষা করবে।
ইসলামের অন্যতম মৌলিক নীতি হলো- সত্যবাদিতা। সত্য শুধু নৈতিক গুণ নয়, বরং এটি ঈমানের অপরিহার্য অংশ। এর বিপরীতে মিথ্যা বলা, প্রতারণা করা ও জেনেশুনে মিথ্যা আশ্বাস দেওয়া ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা বহু স্থানে সত্য বলার নির্দেশ দিয়েছেন এবং মিথ্যাবাদীদের নিন্দা করেছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘হে মুমিনরা! আল্লাহকে ভয় করো এবং সত্যবাদীদের সঙ্গে থাকো।’ -সূরা তওবা: ১১৯
এই আয়াত স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে সত্যবাদিতা শুধু ব্যক্তিগত গুণ নয়, বরং এটি একটি সম্মিলিত সামাজিক দায়িত্ব।
আর রাজনীতি যেহেতু সমাজ পরিচালনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম, তাই সেখানে সত্যের গুরুত্ব আরও বেশি। আরেক আয়াতে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘মিথ্যা রটনা তো তারাই করে, যারা আল্লাহর আয়াতগুলোতে বিশ্বাস করে না।’ -সূরা নাহল: ১০৫
আল্লাহ তায়ালা সবাইকে সত্যের ওপর অবিচল থাকার এবং আমানত সঠিকভাবে আদায়ের তওফিক দান করুন। আমিন।
পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/155901