নিজের ঘরে এসে কি বলবো তাল হারিয়ে ফেলেছি : প্রিয় পিতৃভূমিতে তারেক রহমান
স্টাফ রিপোর্টার : ১৯ বছর পর বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান আজ বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) তার পিতৃভূমি বগুড়ায় পৌঁছেছেন। বগুড়ার আলো, বাতাস, মাটি ও মানুষের একান্ত আপনজন তারেক রহমানের আগমনী ধ্বনীতে বগুড়ার প্রকৃতি যেন নতুন রুপে সাজে।
রাজশাহী-নওগাঁয় নির্বাচনি জনসভা শেষে তিনি রাত প্রায় ১২টায় এসে পৌঁছান বগুড়ার আলতাফুন্নেছা খেলার মাঠ জনসভাস্থলে। সন্ধ্যা ৭টায় তারেক রহমানের সভাস্থলে পৌঁছার কথা ছিল। কিন্তু রাত ৮টায় বগুড়ায় প্রবেশ করেও জনসমুদ্র ঠেলে ঐতিহাসিক আলতাফুন্নেছা খেলার মাঠে পৌঁছতে সময় লেগে যায় প্রায় ৪ ঘন্টা। রাত ১২টায় তখনও লোকে লোকারণ্য ছিল সভাস্থল।
বগুড়ার জনসভায় তারেক রহমান বলেন, আজ আপনাদেরকে কিছু দিতে আসিনি, নিতে এসেছি। বগুড়ার মানুষ হিসেবে শুধু বগুড়া নয় ‘সারা বাংলাদেশের জন্য কাজ করতে চাই’। তিনি আল্লাহতালার কাছে শুকরিয়া আদায় করে বলেন, আজ ১৯ বছর পরে আপনাদের পাশে আসতে পেরেছি। নিজের ঘরে এসে কি বলবো, আমি নিজেও তাল হারিয়ে ফেলেছি। ঘরের মানুষের কাছে তো কিছু বলার নেই। তিনি বলেন, আমি সন্তান হিসেবে বলবো, না প্রার্থী হিসেবে বলবো, এ সময় উপস্থিত লাখো জনতা সমস্বরে বলেন, এলাকার সন্তান, এলাকার ভাই হিসেবে বলেন।
তিনি ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বগুড়ায় করা উন্নয়নমূলক কাজের উদাহরণস্বরূপ বলেন, সরকারের আইন-কানুনের মধ্য থেকে বিধি অনুযায়ী যতটুকু সম্ভব হয়েছে তা করেছি। তিনি বলেন বগুড়া ছিল আমার কাছে মডেল জেলার মত। আমি চিন্তা করেছিলাম বাকি ৬৩ জেলা কিভাবে সাজাবো। শুধু বগুড়াকে নিয়ে চিন্তা করলে হবে না। সারা বাংলাদেশকে নিয়ে ভাবতে হবে। সারাদেশের উন্নয়ন করতে হবে। তারেক রহমান আরো বলেন, যোগ্যতা এবং দক্ষতার ভিত্তিতে চাকরি হবে। বিগত ১৫ বছর মেগা প্রকল্পের নামে মেগা দুর্নীতি করা হয়েছে। ১৫ বছর শুধু বগুড়া নয় সারাদেশই পিছিয়ে ছিল।
তারেক রহমান প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে স্মরণ করে বলেন, এই আসন ছিল আমার মায়ের। সেই আসনেই আমি নির্বাচন করছি। বিএনপি ক্ষমতায় এলে সারাদেশে সুষম উন্নয়ন হবে। তিনি তার সহধর্মিনী ডা: জোবায়দা রহমানকে দেখিয়ে বলেন, আমার চলার পথে সে সহযোগিতা না করলে এ পর্যায়ে আসতে পারতাম না। বক্তব্যের শেষে বগুড়ার বাকী ৬টি আসনের প্রার্থীদের হাতে ধানের শীষ তুলে দিয়ে প্রার্থীদের পরিচয় করিয়ে দেন। একই সাথে ধানের শীষের প্রার্থীদের নির্বাচনে বিজয়ী করার আহবান জানান। তারেক রহমান বগুড়া সদর আসনে তার জন্য বগুড়ারবাসির কাছে ভোট প্রার্থনা করেন।
এর আগে বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করে গণদোয়া করা হয়।
আলতাফুন্নেছা খেলার মাঠে বগুড়া জেলা বিএনপি আয়োজিত এই সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন, জেলা বিএনপি সভাপতি রেজাউল করিম বাদশা।
বক্তব্য রাখেন, বগুড়া পৌরসভার সাবেক মেয়র এড. মাহবুবর রহমান, বিএনপি মিডিয়া সেলের প্রধান ডা: মওদুদ হোসেন আলমগীর পাভেল, বিএনপি রাজশাহী বিভাগীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ওবায়দুর রহমান চন্দন, বগুড়া-৫ আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী গোলাম মোহাম্মদ সিরাজ, বগুড়া-১ আসনের প্রার্থী কাজী রফিকুল ইসলাম, বগুড়া-৪ আসনের প্রার্থী আলহাজ্ব মোশারফ হোসেন, বগুড়া-২ আসনের প্রার্থী মীর শাহে আলম, বগুড়া-৩ আসনের প্রার্থী আব্দুল মুহিত তালুকদার, বগুড়া-৭ আসনের প্রার্থী মোরশেদ মিল্টন, বিএনপি কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ভিপি সাইফুল ইসলাম, মাহবুবর রহমান হারেজ, আলী আজগর তালুকদার হেনা, জয়নাল আবেদীন চাঁন, এম আর ইসলাম স্বাধীন, এ কে এম আহসানুল তৈয়ব জাকির, মাফতুন আহমেদ খান রুবেল, এড. আব্দুল বাছেদ, বার কাউন্সিলের সদস্য এড. শফিকুল ইসলাম টুকু , ফজলুল বারী তালুকদার বেলাল, ডা: শাহ মোহাম্মদ শাজাহান, ডা: আজফারুল হাবিব রোজ, এড. সাইফুল ইসলাম, ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি ফজলুর রহমান খোকন, যুবদলের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক কামরুজ্জামান জুয়েল, স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক নাজমুল হাসান, ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি আনোয়ার পারভেজ, বিএনপি নেতা জাহিদুল ইসলাম হেলাল, হামিদুল হক চৌধুরী হিরু, শেখ তাহাউদ্দিন নাইন, মনিরুজ্জামান মনি প্রমুখ। সমাবেশ পরিচালনা করেন, জেলা বিএনপির সাংগনিক সম্পাদক সহিদ উন নবী সালাম ও কে এম খায়রুল বাশার। সমাবেশে সাবেক এমপি হেলালুজ্জামান তালুকদার লালু সহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন।
বগুড়া শহরের প্রত্যেকটা পথে পথে ছিল শুধু মানুষ আর মানুষ। সবার কথা ১৯ বছর পর বগুড়ায় আসছেন তারেক রহমান। রাত যতই হোক নেতাকে একনজর দেখেই যাব। শেষমেষ তাই হলো। লাখে লাখে মানুষ প্রিয় নেতাকে দেখে এবং তার বক্তব্য শুনে ফেরেন নিজ নিজ গৃহে। সভার শুরুতে প্রয়াত সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার রুহের মাগফেরাত কামনায় মোনাজাত করা হয়।
জেলা বিএনপির মঞ্চ ও মাঠ ব্যবস্থাপনা ছিল খুবই ভালো। রয়েছে টয়লেট সুবিধা। পুরো মাঠের প্রতিটি কোনায় কোনায় এবং তারেক রহমানের যাত্রাপথে ছিল সেনাবাহিনীসহ আইনশৃংখলা বাহিনীর নিñিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা। তারেক রহমানের আগমনের আগ পর্যন্ত চলে জাতীয় ও স্থানীয় নেতৃবৃন্দের বক্তব্য। বাংলাদেশের উন্নয়নের রাজনীতির হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা তারেক রহমান ইতোপূর্বে ১১ জানুয়ারি বগুড়ায় আসার কথা থাকলেও বিধি-নিষেধের কারণে তিনি তার প্রিয়ভূমিতে আসতে পারেননি। নির্ধারিত সময়ের ১৯ দিনের মাথায় তিনি আজ বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) বগুড়ায় আসছেন।
১৯৯১ সাল থেকে বগুড়ার উন্নয়নে নিবেদিত প্রাণ তারেক রহমানের ভালোলাগা-ভালোবাসা বলতে যা বোঝায় তাই ছিলো বগুড়া। তার প্রচেষ্টায় বিগত ৪ দলীয় জোট সরকারের সময় বগুড়ায় শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ভবন, শহীদ চাঁন্দু স্টেডিয়ামের নতুন রুপ দেওয়া, বগুড়ার বনানী থেকে মাটিডালী এবং সাতমাথা থেকে স্টেশন রোড প্রশস্তকরণ, বিয়াম স্কুল এন্ড কলেজ স্থাপন, জেলা প্রশাসনের কালেক্টরেট ভবন, কালেক্টরেট স্কুল এন্ড কলেজ ভবন, করতোয়া নদীর ওপর একাধিক ব্রিজ নির্মাণ করে পূর্ব বগুড়ার সাথে পশ্চিম বগুড়ার মানুষের সংযোগ স্থাপন এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, বগুড়া কোর্ট চত্বরে জজ কোট ভবন নির্মাণ, পর্যটন মোটেলের সংস্কার, দ্বিতীয় বাইপাস সড়ক নির্মাণ, বগুড়া সদর উপজেলা পরিষদ ভবন নির্মাণ, মাটিডালী বিমান মোড়ের সুন্দর্যবর্ধনে ফাইটার বিমান স্থাপনসহ নানা উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেন।
প্রিয়ভূমির জন্য নিবেদিত এই কিংবদন্তির আগমনী ধ্বনীতে বগুড়াবাসী আনন্দিত ও উৎফুল্ল। ১৯ বছর একমাস ৫ দিন পর আজ বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) বগুড়ায় এসে তিনি মধ্যরাতে আলতাফুন্নেছা খেলার মাঠে জনসভায় বক্তব্য রাখেন। তিনি নওগাঁ থেকে বগুড়ায় আসার পথে কয়েকটি পথসভায় বক্তব্য দেন। বগুড়ায় জনসভা শেষে তিনি হোটেল নাজ গার্ডেনে রাত যাপন করেন। ১৯৮৮ সালে বগুড়ার গাবতলীতে বিএনপি উপজেলা শাখার প্রাথমিক সদস্য হিসেবে তারেক রহমান রাজনৈতিক জীবন শুরু করেন।
সেই সময় তিনি বগুড়ার দলীয় ইউনিটগুলোকে সক্রিয়ভাবে সংগঠিত করেন এবং রাজনীতিকে আরও উৎপাদন ও উন্নয়নমুখী করার জন্য অন্তর্নিহিত সংস্কৃতি পরিবর্তন করেন। তারেক রহমান বিএনপির জাতীয় প্রচারণা কৌশল কমিটির সদস্য ছিলেন এবং তার মা খালেদা জিয়ার নির্বাচনি এলাকার পাঁচটি নির্বাচনি এলাকায় জাতীয় নির্বাচনি প্রচারণার সমন্বয়কের দায়িত্বও পালন করেছিলেন।
১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচনের সময়, যখন সামরিক সরকার থেকে নির্বাচিত সরকারে রূপান্তর চলছিল, তারেক রহমান সক্রিয়ভাবে দলের পক্ষে সমর্থন সংগ্রহ করেছিলেন। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপির সাফল্য এবং নতুন সরকার গঠনের পর, তার অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে দলের একটি সিনিয়র পদের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। তবে, তিনি উচ্চতর পদ গ্রহণে অনিচ্ছুক ছিলেন, তৃণমূল পর্যায়ে দলকে শক্তিশালী করার জন্য পর্যাপ্ত সময় পেতে পছন্দ করতেন। বহু বছর ধরে তিনি বিএনপির বগুড়া ইউনিটগুলো উন্নয়নে সক্রিয় ছিলেন। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগের শাসনামলে তারেক রহমান সরকারের কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলেন।
তিনি অর্থনৈতিক বঞ্চনার সমস্যা সমাধানের জন্য সক্রিয়ভাবে প্রচারণা চালান এবং গ্রামীণ এলাকায় বসবাসকারী মানুষের দুর্দশার কথা প্রচারের লক্ষ্যে দেশব্যাপী পরামর্শ কর্মসূচির নেতৃত্ব দেন। ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনে, বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ভূমিধস বিজয় লাভ করে। ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের মধ্যে বিএনপির শাসনামলে, ২০০৪ সালে ঢাকায় গ্রেনেড হামলার ঘটনা ঘটে, এই ঘটনায় তিনি প্রধান সন্দেহভাজন ছিলেন, যার জন্য তাকে আদালত যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেয়। ২০২৪ সালে, পুরো বিচার কার্যক্রম “অবৈধ” বলে রায় দেওয়ার পর তাকে খালাস দেওয়া হয়।
২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর খালেদা জিয়ার মুক্তির পর, তিনি সেন্টজনস উডের একটি স্বাধীন বেসরকারি হাসপাতাল ওয়েলিংটন হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য লন্ডনে যান। ২০০৯ সালের ৮ ডিসেম্বর ঢাকায় অনুষ্ঠিত বিএনপির ৫ম জাতীয় কাউন্সিলে তারেক রহমানকে দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত করা হয়। ২০২৫ এর ১৩ জুন তারেক রহমান এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের মধ্যে একটি ব্যক্তিগত বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়, যিনি যুক্তরাজ্য সফরে ছিলেন। বৈঠকের পর, উভয় পক্ষের প্রতিনিধিরা একটি যৌথ বিবৃতি জারি করেন। বিএনপি সূত্রগুলো এই বৈঠককে “একটি টার্নিং পয়েন্ট” হিসেবে উল্লেখ করেছে।
গত ২৫ ডিসেম্বর তিনি তার স্ত্রী জুবাইদা রহমান এবং মেয়ে জাইমা রহমানের সাথে, ২০০৮ সাল থেকে নির্বাসিত জীবন শেষ করে বাংলাদেশে ফিরে আসেন। এর পাঁচদিন পর তার মা বেগম খালেদা জিয়া দীর্ঘ অসুস্থতার পর মারা যান। তারেক রহমান জাতীয় সংসদে বগুড়া-৬ এবং ঢাকা-১৭ আসনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। গত ৯ জানুয়ারী তারেক রহমান বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের চেয়ারম্যান হন।
পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/155876