যেভাবে বিএনপির ত্রাণকর্তা হয়ে উঠলেন তারেক রহমান

যেভাবে বিএনপির ত্রাণকর্তা হয়ে উঠলেন তারেক রহমান

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন অনেক সময় ও বাস্তবতা রয়েছে, যেখানে কোন কোন দলের অস্তিত্ব বেশ সংকটের মুখে পড়েছে। নেতৃত্বহীনতা, দমন-পীড়ন, সাংগঠনিক ভাঙন ও আদর্শিক বিভ্রান্তি; সব মিলিয়ে দল যেন কেবল অতীত স্মৃতির ভারে টিকে থাকে। ২০০৭ সালের পর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ঠিক এমনই এক অস্তিত্ব সংকটে নিমজ্জিত হয়েছিল। সেই সংকটকালে দলকে পুনর্গঠিত ও পুনরুজ্জীবিত করার যে প্রক্রিয়া শুরু হয়, তার কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবে ধীরে ধীরে আবির্ভূত হন তারেক রহমান। ২০০৭ সালের তথাকথিত ওয়ান-ইলেভেন পরবর্তী সময়ে বিএনপি ত্রিমুখী সংকটে পড়ে। প্রথমত, নেতৃত্ব সংকট। যেখানে দলের চেয়ারপারসন কারাবন্দি, স্থায়ী কমিটির অধিকাংশ সদস্য মামলা ও কারাগারের মধ্যে আবদ্ধ। দ্বিতীয়ত, সাংগঠনিক ভাঙন। উপযুক্ত বাস্তবতায় জেলা-উপজেলা কমিটির বড় অংশ নিষ্ক্রিয়, ছাত্র ও যুব সংগঠন প্রায় অচল। তৃতীয়ত, রাজনৈতিক বৈধতার সংকট। নির্বাচনি ও প্রশাসনিক কাঠামোগত বাস্তবতায় বিএনপি কার্যত রাজপথ ও সংসদ; উভয় ক্ষেত্রেই কোণঠাসা। রাজনৈতিক গবেষণায় একে বলা হয় অপজিশন মার্জিনালাইজেশন ফেস, যে পর্যায়ে দল টিকে থাকলেও রাষ্ট্রক্ষমতায় প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে পড়ে।

এই প্রসঙ্গে তারেক রহমানের নেতৃত্বের সবচেয়ে আলোচিত এবং একইসঙ্গে গবেষণাযোগ্য দিক হলো, ভৌগোলিক অনুপস্থিতি সত্ত্বেও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে যেটি বিরল একটি উদাহরণ, যেখানে একজন নেতা সরাসরি মাঠে না থেকেও কেন্দ্রীয় নীতিনির্ধারণে প্রভাব রেখেছেন, সাংগঠনিক পুনর্গঠনের কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন, বিভিন্ন আন্দোলন ও নির্বাচনি কৌশলের দিকনির্দেশনা দিয়েছেন এবং তৃণমূল নেতৃত্বের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ স্থাপনের মাধ্যমে তিনি দলকে ভেঙে পড়া থেকে রক্ষা করেছেন। দলীয় সূত্র অনুযায়ী, ২০১০ সালের পর থেকে বিএনপির প্রায় সব বড় রাজনৈতিক সিদ্ধান্তই এসেছে কেন্দ্রীয় ভার্চুয়াল সমন্বয়ের মাধ্যমে। এটি বিএনপির রাজনীতিতে এক ধরনের ডিজিটাল কমান্ড স্ট্রাকচার তৈরি করে, যা পরবর্তী সময়ে অন্যান্য দলও অনুসরণ করতে শুরু করে।

তারেক রহমানের সবচেয়ে বড় অবদান ছিল বিএনপির আদর্শিক পুনর্গঠন। একদিকে রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের বাস্তবতা, অন্যদিকে জনগণের মধ্যে রাজনীতি-বিমুখতার প্রবণতা; এই দুই সংকট মোকাবিলায় তিনি বিএনপিকে ধীরে ধীরে ‘গণমানুষের দল’ হিসেবে পুনরায় উপস্থাপনের কৌশল গ্রহণ করেন। গবেষণালব্ধ তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালের পর বিএনপির সাংগঠনিক পুনর্গঠনে বেশ কিছু পদক্ষেপ সামনে আসে। 

বিএনপি ধীরে ধীরে একটি লো-রিস্ক কিন্তু হাই-কমিটমেন্ট সংগঠন হিসেবে নিজেকে পুনর্গঠন করে, যেখানে সুবিধাবাদী রাজনীতির জায়গা সংকুচিত হয়। তাছাড়া, ২০০১-২০০৬ মেয়াদের ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতিচর্চার পরিবর্তে তিনি গুরুত্ব দেন ভোটাধিকার, সাংবিধানিক শাসন, রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি এবং নাগরিক মর্যাদার মত বিভিন্ন উপাদানগুলোতে। 

তারেক রহমানের রাজনৈতিক প্রবেশ ১৯৮৮ সালে গাবতলী (বগুড়া) বিএনপি’র উপজেলা সদস্য হিসেবে। প্রতিকূল পরিবেশে স্বৈরশাসক এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশ নেন, যা রাজনৈতিক চেতনা ও সংগঠকসত্তার প্রথম ভিত্তি গড়ে তোলে। এরপর ১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচনেও তিনি তাঁর মায়ের, তৎকালীন চেয়ারম্যান খালেদা জিয়ার, প্রচারণায় দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করেন, যা দলটির বড় জয় হিসেবে পরিণত হয়েছিল। ২০০১ সালের নির্বাচনেও তারেক রহমানের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। দলের কেন্দ্রীয় স্থাপনায় থেকে তিনি নির্বাচনী কৌশল ও সংগঠন ব্যবস্থাপনায় সক্রিয় ছিলেন। এসময় বিএনপি জোট একটি দ্বিতীয় মেয়াদের সরকার গঠন করে তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছিল। এই সময় তিনি দেশজুড়ে সংগঠন সম্প্রসারণ, স্থানীয় নেতাদের বিকেন্দ্রীকরণ ও নীতিবার্তা প্রচারে মনোনিবেশ করেন। 

২০০৮ সালের সেপ্টেম্বরে দেশ ত্যাগের আগে তাকে একাধিক মামলায় গ্রেফতার করা হয়েছিল এবং তিনি প্রায় ১৮ মাসের জন্য জেলে ছিলেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলেন, এই সময় নামে-বেনামে তৎকালীন বিরোধী নেতৃত্বকে দুর্বল করার প্রয়াস ছিল। ২০০৯ সালে তিনি লন্ডন থেকে বিএনপি’র সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন এবং ২০১২ সালে বিএনপি ২০ দলীয় জোটের সঙ্গে বিভিন্ন রাজনৈতিক অংশীদারিত্ব তৈরি করে। ২০১৮ সালে খালেদা জিয়ার কারাবন্দির পর ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার মধ্য দিয়ে তিনি পার্টির সামগ্রিক কৌশল ও সাংগঠনিক সিদ্ধান্তের মূল নায়ক হয়ে উঠেন। এ সময় তার দল ২০ দলীয় জোট ভাঙার মধ্য দিয়ে নিজস্ব অবস্থান পুনর্বিন্যাস করে এবং গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে গতিশীল করতে জামায়াতকেন্দ্রিক জোট থেকে কিছুটা দূরে সরে এসে প্রগতিশীল, গণতান্ত্রিক ও সাম্যভিত্তিক রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মে জোর দিতে থাকে, যা তারেক রহমানের বিশেষ রাজনৈতিক বুদ্ধিমত্তা ও সংগঠকসত্তা নির্দেশ করে। তারেক রহমান নিজেকে কেবল রাজনৈতিক সংগঠক বা চেয়ারম্যান হিসেবে দেখাননি বরং একটি দীর্ঘমেয়াদি রাজনীতি ও প্রশাসনিক ভিশনও উপস্থাপন করেছেন। তার নেতৃত্বাধীন দল ২০২২ সালে ২৭ দফা পেশ করে, যেখানে রাষ্ট্র মেরামতের রূপরেখা প্রকাশ করা হয়। যা পরবর্তীতে ৩১ দফাতে সম্প্রসারিত হয়। এই প্রস্তাবে স্বচ্ছ নির্বাচন, বিচারব্যবস্থা সংস্কার, নাগরিক অধিকার বৃদ্ধিসহ গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের কথা উল্লেখ ছিল। যা প্রতিকূল সময়ে বিএনপির রাজনৈতিক ভিত্তি আরও দৃঢ় করে। তারেক রহমানের রাজনৈতিক বুদ্ধিমত্তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো রাজনীতির সামাজিক বিস্তার। রাজনীতির সামাজিক বিস্তার বলতে রাজনীতিকে সামাজিকভাবে সম্প্রসারণ করা ও মানুষের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করা; যেটি তারেক রহমান নির্বাসিত জীবন থেকেই চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। দীর্ঘ সতেরো বছরের বেশি সময় লন্ডনে রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকার পর শেষ পর্যন্ত ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে তার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে একটি মাইলস্টোন হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। যার মাধ্যমে তাকে ঘিরে তার দলের ভেতরে ও বাইরে তৈরি হওয়া উদ্বেগের অবসান হয়েছে এবং এর মাধ্যমে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের তৈরি করা দলটি খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে সংগঠিত ও জনপ্রিয় হওয়ার পর আবার একটি সমস্যা-সঙ্কুল পথ পাড়ি দিয়ে তারেক রহমানের সরাসরি নেতৃত্বে পরিচালিত হওয়ার সময়ে পদার্পণ করলো। 

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তারেক রহমান কৃষক কার্ড, ফ্যামিলি কার্ড কিংবা ক্ষমতায় গেলে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নামক পররাষ্ট্রনীতি জাতীয় পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত করছেন। গণমাধ্যমের সম্পাদকদের সঙ্গে মতবিনিময় বৈঠকেও তাকে পরিণত ও মনোযোগী রাজনৈতিক নেতা হিসেবে দেখা গেছে। তিনি পানি, স্বাস্থ্য, কৃষি, নারী অধিকার, ভোকেশনাল শিক্ষা, দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি ও আইটি খাতের উন্নয়ন নিয়ে তাঁর পরিকল্পনা জানিয়েছেন।  তাছাড়া,  তরুণ ভোটার, শিক্ষার্থী, প্রবাসী কর্মী, ভ্যানচালক, অটোচালক, শ্রমজীবী মানুষ প্রভৃতি শ্রেণির সঙ্গে সরাসরি সংলাপের আয়োজন বিএনপির রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করছে।  এতে বিএনপি আবারও প্রকৃতপক্ষে একটি গণমানুষের দল হিসেবে আত্মপ্রকাশের সুযোগ পাচ্ছে। এই ধরনের উদ্যোগ মূলত দলকে এলিট ক্লাব রাজনীতি থেকে গণভিত্তিক রাজনীতিতে ফিরিয়ে আনে। এবার আসি একটু ভিন্ন প্রসঙ্গে; তারেক রহমানের সঙ্গে ‘ত্রাণকর্তা’ শব্দটি নিয়ে। অনেক সময় এটি আবেগপ্রবণ মনে হলেও রাজনৈতিক বিশ্লেষণে এর একটি যৌক্তিক ব্যাখ্যা রয়েছে। কারণ তিনি এমন এক সংকটকালীন সময়ে দলের দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন যখন দল ভাঙনের দ্বারপ্রান্তে ছিল, বিকল্প নেতৃত্ব কাঠামো অনুপস্থিত ছিল এবং আদর্শিক ও সাংগঠনিক দিকনির্দেশনা হারিয়ে গিয়েছিল। এ অবস্থায় তারেক রহমান যে ভূমিকা নেন, তা মূলত ক্রাইসিস লিডারশিপ মডেল-এর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এই মডেলে নেতা প্রথমে দলকে ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা করেন, তারপর ধীরে ধীরে পুনর্গঠনের দিকে যান। ইতিহাসে বহু দল আছে যারা এমন সংকট থেকে আর ফিরতে পারেনি, সেই তুলনায় বিএনপির ফিনিক্স পাখির মত ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে আসা একটি গবেষণাযোগ্য সাফল্য।

সবশেষে বলা যায়, তারেক রহমানের রাজনৈতিক যাত্রা মূল্যায়ন করতে গেলে আবেগ বা দলীয় দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে এসে সময়ের বাস্তবতাকে বিবেচনায় নিতে হয়। একটি রাজনৈতিক দলকে অস্তিত্ব সংকট থেকে ফিরিয়ে আনা, আদর্শিকভাবে পুনর্গঠন করা এবং ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের কাঠামো দাঁড় করানো- এসব কাজ কেবল উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া যায় না; এর জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক দূরদৃষ্টি, সংগঠকসত্তা ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশল। এই জায়গাতেই তারেক রহমান বিএনপির ইতিহাসে একটি স্বতন্ত্র অধ্যায় হয়ে উঠেছেন।

লেখক:

শাহিন আলম 

শিক্ষার্থী, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি, 
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। 

পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/155774