যেসব কারণে তারেক রহমানের দিকে তাকিয়ে বগুড়ার মানুষ

যেসব কারণে তারেক রহমানের দিকে তাকিয়ে বগুড়ার মানুষ

অর্থনৈতিক পরিকাঠামো, যোগাযোগকেন্দ্রিক অবস্থান এবং ঐতিহাসিক বাণিজ্যিক গুরুত্বের কারণে বগুড়া উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার, দেশের অর্থনীতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। ভৌগোলিক বাস্তবতায় বগুড়া এমন এক জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে দেশের উত্তর ও দক্ষিণ, পূর্ব ও পশ্চিম এক সুতোয় গাঁথা। এই অবস্থানই কালের পরিক্রমায় বগুড়াকে পরিণত করেছিল কৃষি, শিল্প ও বাণিজ্যের স্বাভাবিক মিলনস্থলে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, বগুড়া কখনোই পিছিয়ে পড়া জনপদ ছিল না; বরং রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা থাকলে এটি হতে পারত দেশের অন্যতম অর্থনৈতিক হাব।

ভৌগোলিক সুবিধার কারণে বগুড়ায় যে বণিকায়নের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, তা আজও বিস্ময় জাগায়। পরিকল্পিত রাষ্ট্রীয় সহযোগিতা ছাড়াই ব্যক্তি উদ্যোগে এখানে গড়ে উঠেছে শিল্পকারখানা, ব্যবসা-বাণিজ্যের নানামুখী অবকাঠামো। সেচপাম্প, ধানমাড়াই যন্ত্র, কৃষিযন্ত্রপাতি উৎপাদনে বগুড়া দীর্ঘদিন ধরে দেশের শীর্ষে। রাইস ব্র্যান অয়েল, পাটজাত সুতা, পাটের বস্তা ও ব্যাগ, আলু, পোলট্রি ও ডেইরি খাতের পণ্য, এমনকি বিভিন্ন প্রজাতির গাছের চারা- সবকিছুই বগুড়ার অর্থনীতিকে করেছে বহুমাত্রিক। এসব পণ্য দেশের বাজার ছাড়িয়ে রপ্তানির মাধ্যমেও জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখছে। কিন্তু এই সম্ভাবনার বিস্তারে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা ছিল না বললেই চলে। এগুলো হয়েছে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের উদ্যোগে। বিস্ময়কর হলেও সত্য, গত প্রায় ১৬ থেকে ১৭ বছরে সরকারিভাবে বগুড়াকে কার্যত দমিয়ে রাখার সব আয়োজনই করা হয়েছে। উন্নয়ন পরিকল্পনায় এই জেলা ছিল উপেক্ষিত, বাজেট বরাদ্দে ছিল বৈষম্য, আর বাস্তবায়নে ছিল চরম অনীহা। বড় শিল্পাঞ্চল, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল কিংবা আধুনিক লজিস্টিক হাব, কোনোটিই বাস্তব রূপ পায়নি। যে বগুড়া উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার, সেই বগুড়াকেই দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়নের দরজার বাইরে রাখা হয়েছে।

এই অবহেলার সবচেয়ে বড় মূল্য দিয়েছে মানুষ। কর্মসংস্থানের সুযোগ সংকুচিত হয়েছে, উদ্যোক্তারা নিরুৎসাহিত হয়েছেন, তরুণরা বাধ্য হয়েছেন এলাকা ছাড়তে। শিক্ষিত বেকারত্ব প্রতিদিনের বাস্তবতা। যারা থেকেছেন, তাদের বড় একটি অংশ মনে করেছেন, বগুড়ায় থেকে স্বপ্ন দেখা বৃথা। অথচ একটি অঞ্চলের সবচেয়ে বড় শক্তি তার মানুষ। সেই মানুষ যখন বারবার উপেক্ষিত হয়, তখন উন্নয়ন কেবল কাগজে কলমেই সীমাবদ্ধ থাকে। এই নাকাল অবস্থা থেকে মুক্তি চায় বগুড়া। মুক্তি চায় এখানকার কৃষক, শ্রমিক, শিক্ষার্থী, উদ্যোক্তা, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাই। তারা পথের দিশারী খুঁজছে। এমন একজন নেতৃত্বের দিকে তাকিয়ে আছে, যিনি শুধু ক্ষমতার রাজনীতির বাহিরে গিয়ে সমাজ বিনির্মাণের গতিরেখা নির্ধারণ করবেন। 

এই জায়গাতেই এসে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নাম উচ্চারিত হয় গভীর প্রত্যাশা নিয়ে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জ্যেষ্ঠ পুত্র হিসেবে তারেক রহমান বগুড়াবাসীর কাছে সম্ভাবনার সূতিকাগার। বগুড়ার মানুষ মনে করে, এই মাটির একজন সন্তান যদি রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রে পৌঁছান, তাহলে এই জনপদ আর উপেক্ষিত থাকবে না। তাদের সমানুপাতিক হিস্যা পাবেন। 

দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর আজ বগুড়ার মাটিতে পা রাখতে যাচ্ছেন তারেক রহমান। এই আগমন কোনো সাধারণ রাজনৈতিক সফরের ভিন্নমাত্রা যোগ করবে বলে সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করে। এটি বগুড়াবাসীর কাছে দীর্ঘ অবহেলার বিরুদ্ধে এক নীরব প্রতিবাদ, এক মানসিক স্বীকৃতি হিসেবেই বিবেচিত হবে। আকাশসম প্রত্যাশা নিয়ে আজ তারেক রহমানের দিকেই তাকিয়ে আছে এই জেলা। তাকিয়ে থাকারই কথা। কারণ এটিই বর্তমান দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা। এই প্রত্যাশা হঠাৎ তৈরি হয়নি। এটি গড়ে উঠেছে বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা অভিজ্ঞতা, বঞ্চনা, ক্ষোভ আর অপূর্ণ স্বপ্নের ভেতর দিয়ে। একসময় যে বগুড়া ছিল উত্তরবঙ্গের অর্থনীতি, শিক্ষা ও রাজনীতির অন্যতম কেন্দ্র, সেই বগুড়াই গত দেড় দশকে পরিণত হয়েছে বৈষম্যের প্রতীকে।

ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ শাসনামলে বগুড়ার মানুষের সবচেয়ে বড় অভিযোগ ছিল প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য। উন্নয়ন প্রকল্প থেকে শুরু করে মানুষের জীবনের মৌলিক সুযোগ, সুবিধা-সব ক্ষেত্রেই এই বৈষম্য স্পষ্ট ছিল। চাকরির আবেদন করতে গিয়ে অসংখ্য তরুণের অভিজ্ঞতা একই, যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও বগুড়ার ঠিকানা যেন অঘোষিত অপরাধ। মৌখিকভাবে কিছু বলা না হলেও বাস্তবে অনেক জায়গায় নিয়োগ প্রক্রিয়া থমকে গেছে শুধু জেলার পরিচয়ের কারণে।

পদোন্নতির ক্ষেত্রেও চিত্র ভিন্ন নয়। বছরের পর বছর দায়িত্ব পালনের পরও বহু কর্মকর্তা-কর্মচারী কাক্সিক্ষত পদোন্নতি পাননি। রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা জেলার নাম তাদের সামনে অদৃশ্য দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছে, এই ক্ষোভ আজও দগদগে। এই বৈষম্য শুধু ব্যক্তিকে নয়, পুরো সমাজকে ক্ষতবিক্ষত করেছে। এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে তরুণ সমাজে। মেধাবীরা রাজধানী কিংবা বিদেশমুখী হয়েছেন। পরিবার ভেঙেছে, সামাজিক বন্ধন দুর্বল হয়েছে। একটি প্রজন্ম বেড়ে উঠেছে হতাশা আর অনিশ্চয়তার ভেতর দিয়ে। রাষ্ট্রের প্রতি বিশ্বাস ক্ষয়ে গেছে।

উন্নয়ন বঞ্চনার প্রতিচ্ছবি সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে অবকাঠামো, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে। সড়ক যোগাযোগের আধুনিকায়ন হয়নি কাক্সিক্ষত মাত্রায়, শিল্পায়নের গতি ছিল মন্থর, আধুনিক হাসপাতালের অভাব দীর্ঘদিনের। যে হাসপাতাল তিনি বগুড়ায় তৈরি করেছিলেন, সেগুলোও চালু করা হয়নি রাজনৈতিক বিবেচনায়। ১০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত নন্দীগ্রাম, শিবগঞ্জ ও আদমদিঘীতে তিন হাসপাতালের ঘরগুলো এখন কঙ্কালের মতো দাঁড়িয়ে আছে।  সবচেয়ে বঞ্চনা হয়ে দাঁড়িয়েছে বগুড়ার বিশ্ববিদ্যালয়। বছরের পর বছর ধরে ঘোষণা এসেছে, আশ্বাস দেওয়া হয়েছে, কিন্তু বাস্তবে কিছুই হয়নি। একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় এই অঞ্চলের চিন্তা, সংস্কৃতি ও অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র। সেই প্রাণকেন্দ্রের স্বপ্ন আজও ঝুলে আছে। এই বাস্তবতার ভেতরেই তারেক রহমানের রাজনীতি বগুড়াবাসীর কাছে নতুন করে অর্থবহ হয়ে ওঠে। বিএনপির রাজনীতিতে তার উত্থান, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং তৃণমূলভিত্তিক রাজনৈতিক দর্শনের সঙ্গে বগুড়ার মানুষের দীর্ঘদিনের এক ধরনের আবেগী সম্পর্ক রয়েছে। বগুড়া বরাবরই বিএনপির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত হলেও দীর্ঘ ১৯ বছর ধরে দলের শীর্ষ নেতৃত্বের সরাসরি উপস্থিতি থেকে বঞ্চিত ছিল এই জেলা। তাই তারেক রহমানের আগমন বগুড়াবাসীর কাছে রাজনৈতিক ঘটনার চেয়েও বেশি কিছু এটি মানসিক মুক্তির বার্তা। সাধারণ মানুষ মনে করে, এই আগমন মানে তাদের কষ্ট, ক্ষোভ আর প্রত্যাশাকে সরাসরি স্বীকৃতি দেওয়া।

মানুষের প্রত্যাশা খুব জটিল নয়। তারা চায় ন্যায্যতা। তারা চায় চাকরিতে জেলার নাম দিয়ে বৈষম্য বন্ধ হোক, পদোন্নতিতে রাজনৈতিক পরিচয় বাধা না হোক। তারা চায় শিল্পকারখানা গড়ে উঠুক, কর্মসংস্থান তৈরি হোক, একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় ও আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থা নিশ্চিত হোক। তারা চায় বগুড়া যেন আর অবহেলিত জনপদ হিসেবে পরিচিত না হয়। বগুড়ার মানুষ বিশ্বাস করে, ভোটের মাধ্যমে যদি বিএনপি রাষ্ট্রক্ষমতায় আসে এবং তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হন, তাহলে এই জেলার জন্য একটি নতুন অধ্যায় শুরু হবে। তাদের চোখে তারেক রহমান একজন পরিকল্পনাবিদ, যিনি উন্নয়ন, প্রশাসন ও অর্থনীতিকে সমন্বিতভাবে দেখতে জানেন। নেতাকর্মীদের মাঝেও রয়েছে ভিন্ন এক উত্তেজনা। মামলা, হামলা, গ্রেপ্তার আর দমন-পীড়নের দীর্ঘ সময় পার করা বিএনপি নেতারা মনে করেন, এই সময়টাই রাজনীতির মোড় ঘোরানোর মুহূর্ত। তারেক রহমানের নেতৃত্বে দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাও নতুন করে শক্ত ভিত্তি পাবে, এই বিশ্বাসই তাদের প্রেরণা। সব মিলে বগুড়ার আকাশে এখন অপেক্ষার রোদ। দীর্ঘ অন্ধকারের পর মানুষ আলো দেখতে চায়। সেই আলোর প্রতীক হিসেবেই অনেকের চোখে তারেক রহমান। তিনি যদি বগুড়ার মাটিতে দাঁড়িয়ে এই জনপদের বঞ্চনার কথা স্বীকার করেন এবং সমাধানের পথে হাঁটার দৃঢ় অঙ্গীকার করেন, তাহলে এই এলাকার মানুষ নতুন করে স্বপ্ন দেখতে সাহস পাবে।

এটি কেবল একজন নেতার আগমন নয়। এটি একটি অঞ্চলের দীর্ঘ অপেক্ষার গল্প। সেই গল্পের পরবর্তী অধ্যায় কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, তা নির্ভর করছে রাজনীতির সিদ্ধান্ত, মানুষের ভোট এবং আগামী দিনের নেতৃত্বের ওপর। তবে এটুকু নিশ্চিত আকাশসম প্রত্যাশা নিয়ে আজ বগুড়া তাকিয়ে আছে তারেক রহমানের দিকেই।

আমরা বিশ্বাস করতে চাই, আজ বগুড়ার আলতাফুন্নেছা খেলার মাঠের জনসভা থেকে তারেক রহমান দেশের আলোকরশ্মির গতিপথ নির্ধারণ করে দিবে। যে আলোতে বিকরিত হবে সাম্যের বাংলাদেশ। নতুনভাবে যাত্রা শুরু হবে গণতন্ত্রের; যে গণতন্ত্র, বাকস্বাধীনতা, ন্যায্যতার হিস্যা স্বৈরাচার শেখ হাসিনাকে বিতাড়িত করে দেখতে চেয়েছিল দেশের আপামর জনগণ।

লেখক

কালাম আজাদ

সাধারণ সম্পাদক, বগুড়া প্রেসক্লাব।

 

পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/155771