ভোটের আগে যত মিষ্টিকথা, ভোটের পরে নীরবতা!
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘনিয়ে এসেছে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ভোটগ্রহণ, আর সেই লক্ষ্যেই ২২ জানুয়ারি থেকে শুরু হয়েছে আনুষ্ঠানিক নির্বাচনি প্রচারণা। প্রার্থীরা মাঠে নেমেছেন বেশ উচ্ছ্বাসের সঙ্গে; কেউ গণসংযোগে, কেউ সমাবেশে, আবার কেউ ঘরে ঘরে গিয়ে ভোট চাইছেন। নিজেদের উন্নয়ন পরিকল্পনা, জনকল্যাণমূলক প্রতিশ্রুতি এবং ব্যক্তিগত সমর্থনের আবেদন দিয়ে তারা ভোটারদের মন জয় করার চেষ্টা করছেন। তবে নির্বাচনি সময়ে রাজনীতির যেন রূপ বদলায়। ক্ষমতার ভাষা তখন নরম হয়, মুখে থাকে হাসি আর আচরণে দেখা যায় বেশ বিনয়। অনেক রাজনৈতিক নেতা হঠাৎ করেই সাধারণ মানুষের আপনজন মনে হয়। তবে ভোট শেষ হলে এই আন্তরিকতা এবং ঘনিষ্ঠতা প্রায় একপ্রকার অদৃশ্য-ই হয়ে যায়।
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ইলেক্টোরাল পারসুয়েশন (Electoral Persuasion) নামে একটি টার্ম রয়েছে। এর অর্থ হলো ভোটারকে প্রভাবিত করার জন্য আচরণ, ভাষা ও প্রতিশ্রুতির সচেতন ব্যবহার। গবেষণায় দেখা গেছে, উন্নয়ন প্রতিশ্রুতি যতটা না ভোটারকে প্রভাবিত করে, তার চেয়ে বেশি কাজ করে সহানুভূতি প্রদর্শন। মার্কিন রাজনৈতিক গবেষক ডেভিড ইস্টনের মতে, রাজনৈতিক ব্যবস্থা টিকে থাকে মূলত ‘ডিফিউজ সাপোর্ট’ অর্থাৎ ভোটারের আবেগগত সমর্থনের ওপর। এই সমর্থন আদায় করতেই ভোটের আগে রাজনীতিবিদরা বিনয়, নম্রতা ও ঘনিষ্ঠতার প্রদর্শন করেন। কিন্তু ভোট শেষ হলে বাস্তবতা বদলে যায়। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি সংসদ, দলীয় শৃঙ্খলা, প্রশাসনিক কাঠামো ও রাষ্ট্রীয় সীমাবদ্ধতার অংশ হয়ে ওঠেন। ব্যক্তিগত যোগাযোগের জায়গা সংকুচিত হয়, অগ্রাধিকার তালিকায় উঠে আসে দলীয় স্বার্থ ও ক্ষমতার ভারসাম্য। ফলত ভোটারের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে। সময়ের পরিক্রমায় ভোটারদের সমস্যাগুলোও দলীয় এজেন্ডার কাছে গৌণ হয়ে যায়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় জবাবদিহির ঘাটতি। আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে নির্বাচনের পর প্রতিনিধির কাজের মূল্যায়ন বা প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের বাধ্যতামূলক কাঠামো দুর্বল। বিশ্বের বিভিন্ন গণতান্ত্রিক দেশে নির্বাচিত প্রতিনিধির কর্মকান্ড নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হয়। উদাহরণস্বরূপ: ভারতে PRS Legislative Research I Association for Democratic Reforms সংসদ সদস্য ও প্রার্থীর পারফরম্যান্স, ভোটিং রেকর্ড এবং প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণ করে। যুক্তরাষ্ট্রে GovTrack এবং Congressional Research Service এমপিদের কার্যক্রম ও বিল প্রস্তাব বিশ্লেষণ করে। যুক্তরাজ্যে TheyWorkForYou এমপিদের ভোট, ভাষণ ও প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন দেখায়। অস্ট্রেলিয়া, কানাডা এবং ইউরোপের কিছু দেশে OpenAustralia Foundation, OpenParliament.ca এবং অন্যান্য স্বাধীন সংস্থা সংসদ সদস্যদের কার্যক্রম নিয়মিত রিপোর্ট করে। এই উদ্যোগগুলো জনগণকে তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধির দায়িত্বপরায়ণতা ও স্বচ্ছতা সম্পর্কে সচেতন হওয়ার সুযোগ দেয়। কিন্তু আমাদের দেশে পাঁচ বছরের ভোটই প্রায় একমাত্র মূল্যায়ন ব্যবস্থা। বড় পরিসরে এই ধরনের তেমন কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ে না। ফলত দীর্ঘ ব্যবধান রাজনৈতিক দায়হীনতা তৈরি করে, যেখানে ভোটারের খোঁজখবর নেওয়া রাজনৈতিক প্রয়োজন হিসেবে বিবেচিত হয় না বললেই চলে। প্রতিনিধির কাছে ভোটার হয়ে ওঠে এক ধরনের পর্বকালীন প্রয়োজন, স্থায়ী দায় নয়।
নাগরিক প্রত্যাশা ও রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার ফারাকও সমস্যার অন্য একটি মাত্রা। ভোটাররা সাধারণত আশা করেন দ্রুত অবকাঠামোগত উন্নয়ন, শিক্ষার মানোন্নয়ন, তাৎক্ষণিক স্বাস্থ্যসেবা এবং প্রশাসনের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ। তারা চায় সরকারি প্রকল্প ও পরিকল্পনা যেন তাদের জীবনে দৃশ্যমান প্রভাব ফেলে। কিন্তু বাস্তবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও প্রক্রিয়া এই প্রত্যাশার সঙ্গে খাপ খায় না। নীতিমালা প্রণয়ন, বাজেট অনুমোদন এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের ধারা দীর্ঘমেয়াদি ও জটিল। এই বাস্তবতার ফারাক ভোটের আগে সচরাচর জানানো হয় না। নির্বাচনি প্রচারণার সময়ে প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি এবং দ্রুত পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোটারদের মন জয় করার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু ভোটের পরে, যখন বাস্তবতা ধীরে ধীরে প্রকাশ পায়, তখন জন্ম নেয় হতাশা, ক্ষোভ এবং রাজনৈতিক অবিশ্বাস। অতীতেও দেখা গেছে, ভোটে জয়ের পর অনেক নেতা জনগণের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন না, উন্নয়নে ভাটা পড়ে এবং জনদরদী নেতৃত্বের জায়গা দখল করে নেয় আত্মস্বার্থ ও দলীয় রাজনীতি। তবে এটিও সত্য, অনেক জনপ্রতিনিধি এখনো আন্তরিকভাবে জনগণের কল্যাণে কাজ করছেন। কিন্তু সামগ্রিক চিত্রে দলীয় আনুগত্য ও ব্যক্তিস্বার্থের প্রবণতা বেশি দৃশ্যমান।
তবে দায় শুধু রাজনীতিবিদদের নয়। নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম এবং ভোটারদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া জবাবদিহিমূলক রাজনীতি সম্ভব নয়। প্রশ্ন করা, প্রতিশ্রুতির হিসাব চাওয়া এবং নির্বাচনের মধ্যবর্তী সময়েও প্রতিনিধির সঙ্গে সংযোগ বজায় রাখা দূরত্ব কমাতে পারে। নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে জনপ্রতিনিধিদেরও প্রতিশ্রুতি দায়িত্বে অবহেলা করা যাবে না। সাম্প্রতিক ছাত্র-জনতার আন্দোলন মানুষের মনোজগতে যে পরিবর্তন এনেছে, রাজনৈতিক দলগুলোকে সেটি উপলব্ধি করতে হবে। তাদের নীতি-পরিকল্পনায় পরিবর্তন ধারণ করতে হবে। বুঝতে হবে যে, যেনতেন ভাবে একটি নির্বাচন-ই শেষ কথা নয়। অতএব প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন ও সংস্কারের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। জনগণকেও প্রশ্ন তুলতে হবে নির্বাচিত প্রতিনিধি তার প্রতিশ্রুতি কতটা রক্ষা করেছেন? উন্নয়নের সুবিধা কারা পাচ্ছে? দুর্নীতি, বেকারত্ব কিংবা দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির মত সংকটগুলো কেন থামছে না? একটি সচেতন জনগোষ্ঠীই পারে সুযোগসন্ধানী রাজনীতিকে প্রতিহত করতে, ভোটের আগে দেওয়া মিষ্টিকথাকে বাস্তব দায়বদ্ধতায় রূপান্তরিত করতে।
লেখক
মো. শাহিন আলম
শিক্ষার্থী, স্নাতক ও স্নাতকোত্তর, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি,
সলিমুল্লাহ মুসলিম হল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।