বৈশ্বিক সাইবার যুদ্ধ: নতুন প্রজন্মের ঠান্ডা যুদ্ধ

বৈশ্বিক সাইবার যুদ্ধ: নতুন প্রজন্মের ঠান্ডা যুদ্ধ

একবিংশ শতাব্দীর রণাঙ্গন কামানের গোলায় বা ট্যাংকের গর্জনে মুখরিত নয়। এখানকার যুদ্ধক্ষেত্র অদৃশ্য, সীমানাবিহীন এবং এর অস্ত্র হলো কোড, অ্যালগরিদম ও ডেটা। এই নতুন যুদ্ধক্ষেত্রের নাম সাইবারস্পেস, আর এখানে চলমান সংঘাতই হলো বৈশ্বিক সাইবার যুদ্ধ। এটিকে নিছক হ্যাকিং বা তথ্য চুরি ভাবলে ভুল হবে; এটি আসলে এক নতুন প্রজন্মের ঠান্ডা যুদ্ধ, যেখানে রাষ্ট্রগুলো একে অপরের বিরুদ্ধে নিজেদের শক্তি, প্রভাব ও আধিপত্য বিস্তারের জন্য ডিজিটাল প্রযুক্তিকে ব্যবহার করছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে যে স্নায়ুযুদ্ধ চলেছিল, তার মূল ভিত্তি ছিল আদর্শগত দ্বন্দ্ব এবং পারমাণবিক অস্ত্রের প্রতিযোগিতা। সরাসরি সামরিক সংঘাতে না গিয়েও তারা একে অপরকে চাপে রাখতে প্রক্সি যুদ্ধ, গুপ্তচরবৃত্তি এবং রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব বিস্তারের লড়াইয়ে লিপ্ত ছিল। আজকের সাইবার যুদ্ধের প্রেক্ষাপটও অনেকটা একই রকম, তবে এর রূপ ও কৌশল সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্রচলিত যুদ্ধের মতো এখানে কোনো নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানা নেই। একজন হ্যাকার পৃথিবীর এক প্রান্তে বসে অন্য প্রান্তের কোনো দেশের বিদ্যুৎ গ্রিড, পারমাণবিক স্থাপনা, ব্যাংক কিংবা সরকারি ওয়েবসাইটে হামলা চালাতে পারে।

এই যুদ্ধের মূল লক্ষ্যগুলো হলো:

রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা চুরি: প্রতিরক্ষা, অর্থনীতি এবং কূটনীতি বিষয়ক সংবেদনশীল তথ্য হাতিয়ে নেওয়া।

অবকাঠামো বিকল করা: বিদ্যুৎ, পানি, স্বাস্থ্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থার মতো গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় পরিকাঠামো (Critical Infrastructure) অচল করে দিয়ে জনজীবনে বিপর্যয় সৃষ্টি করা।

অর্থনৈতিক ক্ষতিসাধন: ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে অর্থ চুরি, শেয়ার বাজারে কৃত্রিম ধস নামানো এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের তথ্য চুরি করে প্রতিপক্ষকে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল করা।

মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ: সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে ভুয়া তথ্য ও প্রোপাগান্ডা ছড়িয়ে দিয়ে একটি দেশের জনগণের মধ্যে বিভেদ, অবিশ্বাস ও সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করা। নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করাও এর একটি অংশ। সাইবার যুদ্ধকে কেন নতুন ঠান্ডা যুদ্ধ বলা হচ্ছে, তার কয়েকটি কারণ স্পষ্ট। সরাসরি সংঘাতের অনুপস্থিতি: ঠান্ডা যুদ্ধের মতোই প্রধান শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো সরাসরি সামরিক সংঘাতে জড়াচ্ছে না। এর পরিবর্তে তারা সাইবার হামলাকে একে অপরের বিরুদ্ধে শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছে। যেহেতু এই হামলার উৎস শনাক্ত করা কঠিন, তাই সরাসরি দায় স্বীকার বা প্রতিশোধের ঝুঁকি কম থাকে।

প্রক্সি শক্তির ব্যবহার: সোভিয়েত ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্র যেমন বিভিন্ন দেশে নিজেদের সমর্থিত গোষ্ঠী দিয়ে প্রক্সি যুদ্ধ চালিয়েছিল, তেমনি আজকের দিনেও বিভিন্ন রাষ্ট্র রাষ্ট্র-সমর্থিত হ্যাকার গ্রুপ (State-sponsored Hacker Groups) ব্যবহার করে হামলা পরিচালনা করে। এতে তারা নিজেরা পর্দার আড়ালে থাকতে পারে।

সাইবার অস্ত্রের প্রতিযোগিতা: ঠান্ডা যুদ্ধের পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতার মতোই বর্তমানে চলছে সাইবার অস্ত্রের প্রতিযোগিতা। প্রতিটি দেশ আগের চেয়ে শক্তিশালী ম্যালওয়্যার, ভাইরাস, জিরো-ডে এক্সপ্লয়েট (Zero-day Exploit) এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) চালিত সাইবার অস্ত্র তৈরি করতে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে। 

গুপ্তচরবৃত্তির নতুন রূপ: কেজিবি  বা সিআইএ এর গুপ্তচরদের স্থান নিয়েছে ডিজিটাল গুপ্তচরেরা। তারা এখন আর গোপন নথি বা মাইক্রোফিল্মের জন্য নয়, বরং সার্ভার ও ডেটাবেস থেকে টেরাবাইট পরিমাণ তথ্য এক মুহূর্তে হাতিয়ে নিতে সক্ষম। এই অদৃশ্য যুদ্ধে প্রধানত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া, ইরান এবং উত্তর কোরিয়ার মতো দেশগুলোকে প্রধান ক্রীড়ানক হিসেবে দেখা যায়। তাদের মধ্যেকার ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এখন সাইবার জগতেও প্রতিফলিত হচ্ছে। বাংলাদেশের জন্য এই বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। “স্মার্ট বাংলাদেশ” বিনির্মাণের পথে দেশ যখন দ্রুত ডিজিটালকরণের দিকে এগোচ্ছে, তখন আমাদের সাইবার নিরাপত্তার ঝুঁকিও বাড়ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক রিজার্ভ চুরির মতো ঘটনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে, এই যুদ্ধে আমরাও অন্যতম লক্ষ্যবস্তু। আমাদের আর্থিক প্রতিষ্ঠান, সরকারি ওয়েবসাইট, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতসহ গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামোগুলো ক্রমাগত সাইবার হামলার ঝুঁকিতে রয়েছে। দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করতে এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা নষ্ট করতে ভুয়া তথ্যের প্রচারও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এই নতুন প্রজন্মের যুদ্ধ মোকাবিলায় প্রচলিত সামরিক শক্তি যথেষ্ট নয়। এর জন্য প্রয়োজন একদল দক্ষ সাইবার যোদ্ধা, শক্তিশালী ডিজিটাল অবকাঠামো এবং নিশ্চিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা। বাংলাদেশকে এই খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় সাধন, সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করা এখন সময়ের দাবি।

 দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্ব যেমন পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের দিকে ঝুঁকেছিল, তেমনি আজ সাইবার জগতের জন্য একটি আন্তর্জাতিক নীতিমালা বা আচরণবিধি (Code of Conduct) তৈরি করা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। নতুবা এই অদৃশ্য যুদ্ধ যেকোনো মুহূর্তে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়ে বাস্তব পৃথিবীতে বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। এই নতুন ঠান্ডা যুদ্ধে বিজয়ী তারাই হবে, যারা নিজেদের ডিজিটাল সীমানাকে সুরক্ষিত রাখতে সবচেয়ে বেশি পারদর্শী। কারণ আজকের বিশ্বে একটি দেশের সার্বভৌমত্ব তার ভৌগোলিক সীমানার পাশাপাশি ডিজিটাল জগতেও বিস্তৃত। 

লেখক

হেনা শিকদার

শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, দর্শন বিভাগ

পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/155466