ভোটের মাঠে ফ্যামিলি কার্ড

ভোটের মাঠে ফ্যামিলি কার্ড

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উন্নয়ন মানে এতদিন ছিল উঁচু ভবন, ফ্লাইওভার, মেট্রোরেলসহ মেগা প্রকল্পের উদ্বোধনী ফলক। মানুষের পেটে ভাত আছে কি না, সংসারের মাস শেষ হয় কীভাবে- এই প্রশ্নগুলোকে নীতির কেন্দ্রবিন্দুতে খুব কমই আনা হয়েছে। নির্বাচনের আগে সাধারণ মানুষকে রাজনীতিবিদেরা বহু প্রস্তাব, প্রতিশ্রুতি দেন। তবে কিছু প্রস্তাব সময়ের বাস্তবতা, অর্থনীতির কাঠামো এবং সমাজের গভীর সংকেতকে ধারণ করে সামনে আসে। সেই বাস্তবতায় বিএনপি ঘোষিত ফ্যামিলি কার্ড কেবল একটি নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি নয়; এটি রাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে সরাসরি রাজনৈতিক প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়। রাষ্ট্র কি কেবল বড় প্রকল্পের মালিক হবে, নাকি নাগরিকের ন্যূনতম চাহিদার দায়ও নেবে? বাংলাদেশের দারিদ্র্য কোনো একক ব্যক্তির সমস্যা নয়; এটি একটি সামাজিক ও পারিবারিক বাস্তবতা। আয় কমলে তার অভিঘাত প্রথম পড়ে পরিবারের খাবারের টেবিলে, এরপর শিশুর পড়াশোনায়, চিকিৎসায় এবং শেষ পর্যন্ত সামাজিক মর্যাদায়। রাষ্ট্র এতদিন ধরে বলেছে প্রবৃদ্ধি হলেই রাষ্ট্রের উন্নতি হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, প্রবৃদ্ধির ফল ভোগ করেছে একটি সীমিত শ্রেণি। আর সংখ্যাগরিষ্ঠ পরিবার রয়ে গেছে অনিশ্চয়তার ভেতর। বিএনপির প্রস্তাবিত ফ্যামিলি কার্ড এই প্রবৃদ্ধি-কেন্দ্রিক রাজনীতিকে প্রশ্ন করে বলছে, যদি প্রবৃদ্ধি মানুষের ঘরে নিরাপত্তা না আনে, তাহলে সেই প্রবৃদ্ধির অর্থ কী? রাষ্ট্রের সাফল্য কি জিডিপির সংখ্যায়, নাকি পরিবারের মাসের শেষটা কেমন কাটে- সেই বাস্তবতায়?

‘ফ্যামিলি কার্ড’ উদ্যোগের মূল রাজনৈতিক তাৎপর্য সম্ভবত এখানেই। বাজারের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি, অনানুষ্ঠানিক শ্রমের অনিশ্চয়তা, আয় ও ব্যয়ের ভয়াবহ বৈষম্য- এসবের দায় ব্যক্তির ওপর চাপিয়ে দিয়ে, রাষ্ট্র সেই দায় এড়াতে পারে না। পরিবারকে কেন্দ্র করে ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় সহায়তার প্রস্তাব দিয়ে বিএনপি সম্ভবত বোঝাতে চাইছে, উন্নয়নের গল্পের আড়ালে চাপা পড়া দুর্বিষহ জীবনের বাস্তবতাকে আর অস্বীকার করা যাবে না।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দিক হলো- এই সামাজিক সহায়তাকে লজ্জার বিষয় হিসেবে নয়, অধিকার হিসেবে উপস্থাপন করছে বিএনপি। দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলোকে দয়ার দান হিসেবে দেখানো হয়েছে সরকারিদলের পক্ষ থেকে। যার ফলে সুবিধাভোগীদের সামাজিক মর্যাদা ক্ষুন্ন হয়েছে। ফ্যামিলি কার্ড সেই সংস্কৃতি ভাঙতে চায়। এটি পরিবারকে বলছে- তুমি সাহায্য নিচ্ছো না, তুমি রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে তোমার ন্যূনতম অধিকার পাচ্ছো। 

নারীদের নামে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার প্রস্তাবটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। বাংলাদেশের বাস্তবতায় নারীই পরিবারের দৈনন্দিন অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার নীরব চালিকাশক্তি। খাদ্য, সন্তানের শিক্ষা, স্বাস্থ্য এই তিনটি খাতেই নারীর সিদ্ধান্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। যখন রাষ্ট্রীয় সহায়তা সরাসরি নারীর হাতে যায়, তখন তার সামাজিক প্রভাব বহুগুণ বেড়ে যায়। এটি শুধু নারীর ক্ষমতায়নের পাশাপাশি ভবিষ্যতে শিশুদের পুষ্টি সূচক, স্কুলে উপস্থিতি এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। যা কোনো অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের চেয়েও রাষ্ট্রের জন্য বেশি ফলফসু হতে পারে। অনেকে প্রশ্ন তুলছেন- বাংলাদেশের বাজেট কি এই উদ্যোগ বহনে সক্ষম? প্রশ্নটি যৌক্তিক, তবে এর যথার্থ উত্তরও আছে। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে সামাজিক সুরক্ষা খাতে উল্লেখযোগ্য ব্যয় করছে। ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে যদি বিদ্যমান সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলোকে সমন্বিত করে একটি একীভূত কাঠামো গড়ে তোলা যায়, তাহলে এই উদ্যোগ অবশ্যই বাস্তবসম্মত।

সমালোচকেরা আশঙ্কা করছেন, এটি মানুষকে ভাতা নির্ভর করে তুলবে। কিন্তু আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ভিন্ন কথা বলে। নিয়মিত, কিন্তু সীমিত নগদ সহায়তা মানুষকে অলস করে না; বরং ঝুঁকি নেওয়ার সাহস জোগায়। পরিবার যখন জানে যে তার ন্যূনতম খাবারের নিশ্চয়তা আছে, তখন তারা সন্তানকে কাজে না পাঠিয়ে স্কুলে পাঠায়, ছোট ছোট উদ্যোগে তারা বিনিয়োগ করতে সাহসী হয়। এই সামাজিক নিরাপত্তাই দীর্ঘমেয়াদে দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসার পথ তৈরি করে। আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই ধরনের পরিবারভিত্তিক নগদ সহায়তা অর্থনীতিকে স্থবির করে না, বরং বাজারে চাহিদা বৃদ্ধি করে। নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবার যে টাকা পায়, তা ব্যাংকে জমা থাকে না; স্থানীয় বাজারে খরচ হয়। চাল, ডাল, সবজি, পরিবহন, চিকিৎসা, শিক্ষা- সবখানেই সেই অর্থ প্রবাহিত হয়। এর ফলে গ্রাম ও শহরের ক্ষুদ্র ব্যবসা চাঙা হয়, কর্মসংস্থান তৈরি হয় এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির গতি বাড়ে।

বিএনপি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দল হওয়ায় সাধারণ মানুষের পাল্স বুঝতে পেরে,  দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান তাঁর “আই হ্যাভ অ্যা প্ল্যান” এর অংশ হিসেবে সময়মতোই এই ট্রাম্পকার্ডটি ভোটারদের সামনে এনেছেন। ইতোমধ্যে গ্রামে-গঞ্জে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে প্রস্তাবিত এই ফ্যামিলি কার্ড। রাজনীতি যদি সহজ কাজের জন্যই হয়, তাহলে রাষ্ট্রের প্রয়োজনই বা কী? বড় রাজনৈতিক প্রস্তাব মানেই চ্যালেঞ্জ। ধাপে-ধাপে বাস্তবায়ন করা গেলে আগামীতে বাংলাদেশের সামাজিক সুরক্ষায় এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে একটা বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে।


লেখক

সেলিম সরকার

কলামিস্ট ও সদস্য, জিয়া পরিষদ, বগুড়া। 

পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/155463