শিল্প ও স্বনির্ভরতা বনাম আমদানি নির্ভরতা
বাংলাদেশের অর্থনীতি আজ দ্বিমুখী বাস্তবতার মুখোমুখি। বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলো যেখানে নিজস্ব পণ্য রপ্তানির মাধ্যমে সাড়া বিশ্বে রাজত্ব করে বেরাচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশ নিজস্ব পণ্য রপ্তানিতে অনেক গুণ পিছিয়ে আছে, বরং দিনদিন বেড়ে চলেছে তাঁর আমদানি পণ্যের তালিকা। সময়ের সাথে সাথে বাংলাদেশে জিডিপি বৃদ্ধি পাচ্ছে, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, রপ্তানি আয় এবং ডিজিটাল রুপান্তরের আশাবাদী চিত্র ফুটে উঠছে। কিন্তু বৈদেশিক মুদ্রার সংকট, মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা এবং ক্রমবর্ধমান আমদানি নির্ভরতা অর্থনীতির অবস্থা নিম্নগামী। এই অবস্থা থেকে উত্তরণের একমাত্র টেকসই পথ হল দেশীয় শিল্পের সম্প্রসারণ ও রপ্তানিমুখি অর্থনীতি ব্যবস্থা তৈরি।
দেশীয় শিল্প ও আমদানি নির্ভরতার এই দ্বন্দ্ব কেবল অর্থনীতিবিদদের আলোচনার বিষয় নয়; এটি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা, কর্মসংস্থান, বাজারমূল্য এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। যখন একটি দেশে আমদানি নির্ভরতা তৈরি হয়, তখন মূল্যস্ফীতি তৈরি হয়। ফলে সাধারণ মানুষের ব্যয় ক্ষমতা কমে যায়, জিবন্মান কমে যায়। একইসাথে নিম্নবিত্ত পরিবারে শিক্ষার প্রতি অবহেলা বৃদ্ধি পায়, মেয়েদের বাল্যবিবাহ বেড়ে যায়। সমাজে অনৈতিকতা বৃদ্ধি পায়। আমদানিকৃত পণ্যের পুরো প্রক্রিয়াই ঘটে দেশের বাইরে, ফলে দেশের শ্রমিকদের কর্মসংস্থান হ্রাস পায়। দেশের ভেতরে কারখানা, উৎপাদন ইউনিট, সরবরাহ চেইন বা সহায়ক খাত গড়ে ওঠে না। এর অর্থ হলো কম চাকরি, কম আয় এবং কম দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ। অথচ, দেশীয় শিল্প বিকশিত হলে উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত হয় হাজার হাজার শ্রমিক, টেকনিশিয়ান, পরিবহন কর্মী ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা। এটি সামগ্রিকভাবে কর্মসংস্থান বাড়ায় এবং অর্থনীতিতে অর্থের প্রবাহ সৃষ্টি করে।
আমদানি নির্ভর বাজার খুব সহজেই নানাবিধ সংকটে পড়ে। উদাহরণস্বরূপ, ডলার সংকট, এলসি (ব্যাংকের দেওয়া একটি লিখিত নিশ্চয়তা) বন্ধ হওয়া বা বৈশ্বিক রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে আমদানি বাধাগ্রস্ত হলে বাজারে পণ্যের ঘাটতি তৈরি হয়, কৃত্রিম সংকট দেখা দেয় এবং দাম হঠাৎ বেড়ে যায়। দেশীয় উৎপাদন শক্তিশালী হলে এই ধরনের উঠানামা অনেকাংশে সামাল দেওয়া সম্ভব হয়। বর্তমানে বাংলাদেশের মোট আমদানির একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে শিল্পের কাঁচামাল, মূলধনী যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তি, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের উপকরণ, পোশাক ও কসমেটিক্স। তৈরি পোশাক শিল্প দেশের রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশের বেশি যোগান দেয়, সেই শিল্পও সুতা, কাপড়, রাসায়নিক, রং, যন্ত্রাংশ ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্যভাবে আমদানির ওপর নির্ভরশীল। অর্থাৎ আমরা যে পণ্য রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করি, তার বড় একটি অংশ আবার উৎপাদনের প্রক্রিয়াতেই বিদেশে ফিরে যাচ্ছে। বাংলাদেশে দেশীয় শিল্পের সম্ভাবনা অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। কৃষিভিত্তিক শিল্প, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, ওষুধ শিল্প, হালকা প্রকৌশল, প্লাস্টিক, সিরামিক, চামড়া ও আইটি খাতে উল্লেখযোগ্য সক্ষমতা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ওষুধ শিল্প দেশের প্রায় ৯৮% চাহিদা পূরণ করছে, কৃষিভিত্তিক শিল্প অভ্যন্তরীণ বাজারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে, কিছু হালকা প্রকৌশল পণ্য বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে। কিন্তু এই সম্ভাবনাময় শিল্পগুলো প্রয়োজনীয় পরিসরে বিস্তৃত হচ্ছ না।
দেশীয় শিল্প পিছিয়ে পড়ার বহুল কারণ রয়েছে। সরকার একদিকে দেশীয় শিল্পের কথা বলছে, অন্যদিকে অনেক ক্ষেত্রে আমদানিকৃত পণ্যে শুল্ক ছাড় বা কম কর আরোপ করা হচ্ছে। ফলে দেশীয় উৎপাদক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে। দেশীয় শিল্পে গবেষণা ও উন্নয়ন (জ্উ) খাতে বিনিয়োগ অত্যন্ত কম। ফলে নতুন পণ্য উদ্ভাবন, মান উন্নয়ন এবং উৎপাদন দক্ষতা বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। এছাড়া ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা সহজ শর্তে ঋণ পাচ্ছেন না। ব্যাংকিং খাতের জটিলতা ও খেলাপি ঋণের চাপ প্রকৃত উদ্যোক্তাদের নিরুৎসাহিত করছে। আমাদের নিজস্ব শিল্পের সীমাবদ্ধতার কারণে বৈদেশিক চাহিদার পরিমাণও কম। উচ্চ প্রযুক্তির পণ্য যেমন ইলেকট্রনিক্স বা জটিল যন্ত্রাংশে দক্ষতা কম থাকা, দক্ষ কারিগরের অভাবে সুচারু ও বিচিত্র কাজের অভাব, নতুন শিল্পে বিনিয়োগ কম হওয়ায় প্রযুক্তিগত অগ্রগতি সীমাবদ্ধ থাকায় দেশীয় শিল্প বিকশিত হতে পারছে না। দেশীয় শিল্পকে শক্তিশালী করতে হলে কয়েকটি কৌশলগত পদক্ষেপ অপরিহার্য শিল্পবান্ধব শুল্ক ও কর কাঠামো, গবেষণা ও প্রযুক্তি উন্নয়নে রাষ্ট্রীয় সহায়তা, ঝগঊ (ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প) খাতে সহজ ঋণ ও প্রণোদনা, শিক্ষা ব্যবস্থাকে শিল্পের প্রয়োজন অনুযায়ী সাজানো, আমদানি নীতিতে স্বচ্ছতা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। এরপর শুল্ক ও কর নীতিতে সমন্বয় সাধন করতে হবে। কারণ বিদেশি পণ্যে অত্যধিক শুল্ক বসালে ভোক্তা পণ্যের দাম বাড়বে। কিন্তু স্থানীয় শিল্পে সহায়তা করতে হলে প্রয়োজন পরিকল্পিত শুল্ক ও ট্যাক্স নীতি, যাতে উৎপাদন আকর্ষণীয় হয়। এর ফলে শিল্পখাত প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে টিকে থাকার সক্ষমতা অর্জন করবে। প্রযুক্তি বিনিময় ও আরডিতে বিনিয়োগ আরেকটি আশাবাদি পদক্ষেপ হতে পারে। তাই দেশীয় প্রযুক্তি চাহিদা মেটাতে উন্নয়ন গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। সরকার ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে যৌথভাবে উদ্যোগ নিতে হবে নতুন পণ্য তৈরিতে। বিশেষত, এসএমইগুলোর জন্য প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ ও অর্থায়ন সুবিধা দিলে নতুন শিল্পে দক্ষতা বাড়বে।
দেশীয় পুরাতন ও নতুন সমস্ত শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে তৎপর হতে হবে। তদারকি করতে হবে দেশের উৎপাদন খাতে। শিল্পের উন্নয়নে রপ্তানি বাড়ে, সুনাম বাড়ে। দেশের অর্থনীতি উন্নত হয় এবং নাগরিকের জীবনমান বৃদ্ধি পায়। তাই এখনই সময়, প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ ও সচেতনতার মাধ্যমে দেশীয় উপারজনে মনোনিবেশ করা। সবশেষে বলা যায়, দেশীয় শিল্পকে শক্তিশালী করা ও আমদানি নির্ভরতা কমানো কেবল অর্থনৈতিক কৌশল নয়, এটি একটি সময়োপযোগী জাতীয় দায়িত্ব। টেকসই রপ্তানি প্রবৃদ্ধি, উৎপাদনমুখী নীতি এবং স্থানীয় উদ্যোগকে উৎসাহিত করতে পারলেই বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদে একটি স্বনির্ভর ও স্থিতিশীল অর্থনীতির পথে এগিয়ে যেতে পারবে। দেশ, অর্থনীতি ও শিল্প তিনের একতাই হোক আমাদের জয়গান।
লেখক
লাবনী আক্তার শিমলা
শিক্ষার্থী, গণিত বিভাগ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়