পল্লীর পুষ্টিহীন মা: ভবিষ্যতের অসুস্থ প্রজন্ম

পল্লীর পুষ্টিহীন মা: ভবিষ্যতের অসুস্থ প্রজন্ম

বাংলাদেশের পল্লি অঞ্চল এখনো শ্রমনির্ভর জীবিকার প্রধান কেন্দ্র। এই পরিশ্রমনির্ভর জীবনের কেন্দ্রে যিনি আছেন, তিনি একজন নারী একজন মা। ভোর থেকে রাত পর্যন্ত যাঁর শ্রমে সচল থাকে ঘর, উঠোন, ক্ষেত, পরিবার তাঁর নিজের শরীরের দিকে তাকালে স্পষ্ট হয় অবহেলা আর অপুষ্টির ছাপ। গ্রামীণ নারীদের পুষ্টিহীনতা এখন আর শুধুমাত্র একটি স্বাস্থ্য ইস্যু নয়, বরং তা হয়ে দাঁড়িয়েছে একটি জাতির ভবিষ্যৎ উৎপাদনশীলতার মৌলিক হুমকি।

বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভে  ২০২২-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশের ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে প্রায় ৪২ শতাংশ কোনো না কোনো ধরনের অপুষ্টিতে ভোগেন। বিশেষ করে গ্রামীণ নারীদের মধ্যে রক্তশূন্যতা, আয়রনের ঘাটতি, ক্যালসিয়ামের অভাব, ওজনজনিত দুর্বলতা এবং গর্ভকালীন জটিলতা প্রকট আকারে বিদ্যমান। ইউনিসেফ ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর এক যৌথ জরিপে বলা হয়, প্রতি চারজন গর্ভবতী নারীর মধ্যে একজন রক্তস্বল্পতায় আক্রান্ত। এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ে তাঁদের গর্ভস্থ সন্তানদের ওপর যাদের জন্মের সময় ওজন কম থাকে, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয় এবং মানসিক বিকাশে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়। একজন মা যখন অপুষ্টির শিকার হন, তখন তা শুধু একটি জীবনের নয়, একটি প্রজন্মের শারীরিক, মানসিক ও আর্থসামাজিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে। লেনসেন্ট চাইল্ড এন্ড এডলেসসেন্ট হেল্ড জার্নালের ২০২১ সালের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, অপুষ্টির শিকার শিশুরা পরবর্তীতে স্কুলে পিছিয়ে পড়ে, কর্মজীবনে কম দক্ষ হয় এবং আর্থিকভাবে স্বাধীনতা অর্জনে বিঘ্ন ঘটে। অর্থাৎ অপুষ্ট মায়ের কোলে বেড়ে ওঠা শিশুর ভবিষ্যৎ জন্মের আগেই সংকুচিত হয়ে পড়ে। 

পল্লির নারীদের খাদ্যাভ্যাস অত্যন্ত সীমিত ও অসম। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তিন বেলার খাবার মানে ভাত, ডাল আর কোনো শাকপাতা। মাছ, মাংস, ডিম, দুধ কিংবা ফলমূল -এই খাবারগুলো হয়ত মাসে এক-দুবার কারও ভাগ্যে জোটে, সেটাও কখনো অতিথির জন্য। অথচ চিকিৎসা বিজ্ঞান বলছে, একজন গর্ভবতী নারীর দৈনিক প্রয়োজন প্রায় ২২০০–-২৮০০ কিলোক্যালোরি ক্যালরি, সঙ্গে আয়রন, ক্যালসিয়াম, ফোলেট, ভিটামিন বি১২ ও অন্যান্য সুষম উপাদান (সূত্র: WHO, National Institute of Nutrition, India)। এসব না পেলে দেখা দেয় গর্ভপাত, অকাল প্রসব, রক্তস্বল্পতা, হাড় ক্ষয়, দুর্বল শিশু জন্ম এবং প্রসব-পরবর্তী দীর্ঘমেয়াদি দুর্বলতা। 

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও জাতীয় পুষ্টি কর্মসূচির তথ্যানুযায়ী, দেশের গ্রামীণ প্রসূতি মায়েদের মধ্যে মাত্র ৩৫ শতাংশ নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা পান এবং প্রায় ৬৫ শতাংশ নারী আয়রন-ফলিক অ্যাসিড ট্যাবলেট সঠিকভাবে গ্রহণ করেন না। ইউনিয়ন পর্যায়ের স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোয় পর্যাপ্ত সেবা ও ওষুধ নেই, নেই নারীর জন্য আলাদা কাউন্সেলিং বা পুষ্টি পরামর্শ। পরিবারকল্যাণ সহকারী পদের ঘাটতি, এলাকাভিত্তিক মনিটরিংয়ের অভাব এবং সামাজিক সচেতনতার নিম্নমান এসব সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলেছে। অনেক সময় দেখা যায়, নারীরা নিজেরা জানেনই না, গর্ভবতী অবস্থায় কী কী খাওয়া উচিত, বা কখন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যেতে হয়। উপরন্তু, নারীর পুষ্টিকে পরিবারে এখনও তেমন গুরুত্ব দেওয়া হয় না। সন্তান, স্বামী, শ্বশুরবাড়ির লোকজন খেয়ে নিলে তাঁর খাবার শুরু হয় এই সামাজিক সংস্কারই নারীর অপুষ্টির প্রাথমিক কারণগুলোর একটি। সরকার প্রতি বছর শত শত কোটি টাকা ব্যয়ে পুষ্টি কর্মসূচি পরিচালনা করছে, কিন্তু এর কার্যকর প্রয়োগ গ্রামীণ দরজায় পৌঁছায় না। একদিকে দুর্বল তদারকি, অন্যদিকে কেন্দ্রিকরণ ও রাজনৈতিক অনীহা সব মিলিয়ে এই সংকট আরও দীর্ঘায়িত হচ্ছে। পল্লির মা এখনও অপুষ্টি, কুসংস্কার ও স্বাস্থ্যসেবার অনুপস্থিতির মাঝে পড়ে ধুঁকে ধুঁকে দিন পার করেন। পুষ্টি বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টির কোনো জাতীয় মিডিয়া কভারেজ নেই, নেই পাঠ্যবইয়ে পর্যাপ্ত আলোচনা, নেই স্থানীয় পর্যায়ে ‘মা-সন্তান পুষ্টি ক্লিনিক’ যা বাস্তবিক প্রয়োজন ছিল বহু আগেই। 

এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার জন্য প্রয়োজন একটি কার্যকর ও জনমুখী পরিকল্পনা। ইউনিয়ন পর্যায়ের পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রগুলোকে ‘মাতৃত্ব ও পুষ্টি কেন্দ্র’ হিসেবে রূপান্তর করতে হবে, যেখানে গর্ভবতী নারীদের জন্য নিয়মিত খাদ্য সহায়তা, স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও পুষ্টি কাউন্সেলিং চালু থাকবে। ‘মাতৃত্বকালীন পুষ্টি ভাতা’কে ডিজিটাল পদ্ধতিতে নারীদের হাতে পৌঁছে দিতে হবে, যাতে তিনি নিজের পুষ্টির বিষয়ে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। স্থানীয় বিদ্যালয়, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনগুলোকে যুক্ত করে পুষ্টি বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে। গর্ভকালীন পুষ্টি, স্তন্যদান, প্রসূতিসেবা ইত্যাদি বিষয়ে ইউনিয়ন তথ্যসেবা কেন্দ্র, মোবাইল অ্যাপ ও পোস্টার-প্রচারপত্রের মাধ্যমে নিয়মিত বার্তা পৌঁছানো জরুরি। সরকার, এনজিও ও কমিউনিটি একত্রে কাজ না করলে এই সংকট থেকে মুক্তি আসবে না। একজন মা শুধু একটি জীবনের জন্মদাত্রী নন; তিনি একটি ভবিষ্যতের জন্মদাত্রী। আর সেই ভবিষ্যৎ যদি জন্ম থেকেই অপুষ্টিতে গড়া হয়, তাহলে একটি দেশের প্রজন্মই ভেঙে পড়বে। সুতরাং পল্লির মায়ের পুষ্টিকে গুরুত্ব দেওয়া মানে শুধু একটি মায়ের শরীর বাঁচানো নয়, বরং একটি জাতির প্রাণশক্তি রক্ষা করা। পুষ্টিহীন মায়েদের পেছনে রাখা মানেই আগামী দিনের জন্য একটি দুর্বল ও অক্ষম সমাজ প্রস্তুত করা। 

লেখক

রোকেয়া সুলতানা

শিক্ষার্থী, ইতিহাস বিভাগ  
রাজশাহী কলেজ 

পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/154851