মাস বদলায়, কিন্তু কৃষকের ঋণ বদলায় না

মাস বদলায়, কিন্তু কৃষকের ঋণ বদলায় না

কৃষকের জীবনটা যেন কাঁধে ঝোলানো এক অদৃশ্য বোঝা। বাইরে থেকে দেখা যায় শুধু মাঠে কাজ করা এক মানুষ, কিন্তু ভেতরে জমে থাকে হিসাবের খাতা, সুদের অঙ্ক আর না শোধ হওয়া ঋণের দীর্ঘশ্বাস। ঋণ এখানে কেবল টাকা নয়, এটা ঘুমহীন রাত, অনিশ্চিত আগামী আর ভেঙে পড়া স্বপ্নের নাম। যে ঋণ একদিন সহায়তার আশ্বাস নিয়ে এসেছিল, ধীরে ধীরে তা শেকলের রূপ নিয়েছে। কৃষক যখন মাঠে বীজ বোনে, তখন শুধু ফসল নয়, সে বোনে আশার সঙ্গে ভয়ও। ফসল ঘরে উঠলেও নিশ্চয়তা আসে না, কারণ লাভের আগেই দাঁড়িয়ে থাকে ঋণের দাবি। এই ঋণ কৃষকের পায়ে এমনভাবে জড়িয়ে গেছে যে সে হাঁটে ঠিকই, কিন্তু এগোতে পারে না। জীবনের প্রতিটি সিদ্ধান্ত, প্রতিটি পরিশ্রম শেষ পর্যন্ত গিয়ে আটকে যায় এক নির্মম বাস্তবতায়, ঋণ আছে, ঋণ ছিল, আর ঋণ থাকবেই।

কৃষক বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল স্তম্ভ। তারা আমাদের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করে, আমাদের প্রতিদিনের ভাতের ব্যবস্থা করে। তবু, তাদের জীবনে আর্থিক স্থিতিশীলতা খুব কমই দেখা যায়। সরকার বা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান শুরুতে ঋণের ব্যবস্থা কৃষকদের সহায়তার জন্য করে থাকে। শস্য বপন, সেচ ব্যবস্থা, সার-বীজ ক্রয় সবকিছুই সহজভাবে করার জন্য ঋণ ব্যবস্থাকে হাতিয়ার করা হয়। কিন্তু বাস্তবতা অন্যরকম। ঋণ প্রথা এমনভাবে গড়ে ওঠেছে, যেখানে কৃষক তার কাজ শেষ করে দিলেও ঋণ পুরোপুরি শোধ করতে পারছে না। বরং মাসে মাসে সুদ এবং অন্যান্য চার্জের বোঝা তাদেরকে আরও দিশাহীন করে তোলে। একজন কৃষক নিরলস পরিশ্রম করে ফসল ফলানোর পর একটি দেশের জনগণের মুখে খাবার ওঠে। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় ঋণের বোঝা বইতে না পেরে সে কৃষক আত্মহত্যা করে। গ্রামীণ অঞ্চলে দেখা যায়, একটি কৃষক ধান বপন করতে ৫০ হাজার টাকা ঋণ নিলেন। মাসের শেষে ধান বিক্রি করে তিনি মূল ঋণের অল্প অংশ শোধ করতে পারলেন। কিন্তু সুদের কারণে ঋণ আগের চেয়ে বেড়ে গেছে। এই ঋণ যেমন বাড়ছে, তেমনই তার জীবনের দৈনন্দিন খরচের জন্যও অর্থ কমছে। কিছু কৃষক বাধ্য হয়ে আবার নতুন ঋণ নিচ্ছেন পুরানো ঋণ মেটানোর জন্য। এক পর্যায়ে দেখা যায়, ঋণের পরিমাণ তাদের উৎপাদনের চেয়ে অনেক বেশি হয়ে গেছে। এমনকি বন্যা, খরা বা অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে তাদের আর্থিক পরিস্থিতি আরও দুর্বল হয়ে পড়ে।

কৃষকের ঋণ শোধ করতে না পারার মূল কারণ হলো এই ঋণ প্রথার নির্মম বাস্তবতা। প্রথমত, কৃষকের আয়ের উৎস মৌসুম নির্ভর। তারা বছরজুড়ে একটি বা দুইটি ফসলের ওপর নির্ভরশীল। যদি সেই ফসল ভালো না হয়, তৎক্ষণাৎ ঋণ শোধের সমস্যা দেখা দেয়। দ্বিতীয়ত, ঋণের সুদের হার অনেক সময় অত্যন্ত বেশি হয়। ঋণ প্রদানের উদ্দেশ্য সহায়তা হলেও সুদ প্রক্রিয়ায় এটি চাপের মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায়। তৃতীয়ত, কৃষকের কাছে আর্থিক শিক্ষা ও তথ্যের অভাব। অনেক কৃষক জানেন না কীভাবে ঋণ গ্রহণ ও শোধের পরিকল্পনা করতে হবে। ফলে ঋণ বৃদ্ধি পেয়ে যায়। চতুর্থত, প্রশাসনিক জটিলতা ও দুর্নীতি অনেক ক্ষেত্রে কৃষকের ক্ষতি করে। ঋণ প্রক্রিয়া দীর্ঘ ও জটিল, এবং মাঝে মাঝে মধ্যস্থতাকারীরা কৃষকের জন্য আরও বোঝা তৈরি করে। সবশেষে, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও বাজারের অস্থিরতা কৃষকের উপার্জনকে অনিশ্চিত করে, ফলে ঋণ শোধের সম্ভাবনা আরও কমে যায়। 

কৃষকের ঋণের সমস্যা সমাধানের জন্য একাধিক দিক থেকে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। প্রথমত, সরকারকে কৃষকের ঋণের সুদের হার যথাসম্ভব কমাতে হবে। এই সুদকে এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে যাতে ঋণ তাদের জন্য বোঝা না হয়ে দাঁড়ায়। দ্বিতীয়ত, কৃষকের জন্য সহজ ও দ্রুত ঋণ শোধের প্রক্রিয়া তৈরি করা উচিত। মোবাইল ব্যাংকিং ও ডিজিটাল লেনদেনের মাধ্যমে তারা সহজেই ঋণ শোধ করতে পারবে এবং অতিরিক্ত চার্জ কমে যাবে। তৃতীয়ত, কৃষকদের আর্থিক শিক্ষা দেওয়া জরুরি। ঋণ গ্রহণ ও শোধের পরিকল্পনা, বাজেট তৈরি এবং সঞ্চয়ের কৌশল সম্পর্কে সচেতনতা তাদেরকে ঋণমুক্ত করতে সাহায্য করবে। চতুর্থত, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা বাজারের অস্থিরতা থেকে কৃষককে সুরক্ষা দিতে সরকারি বিমা বা প্রণোদনা ব্যবস্থা প্রয়োজন। যেমন বন্যা, খরা বা ফসলের বাজারদরের পতন হলে কৃষককে অল্প সুদে ঋণ পরিশোধের সুযোগ দেওয়া। পঞ্চমত, স্থানীয় প্রশাসন ও মধ্যস্থতাকারীদের নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ ভূমিকা নিশ্চিত করতে হবে। এটি কৃষকের প্রতি প্রতারণা ও অতিরিক্ত বোঝা কমাবে। এছাড়া, সমবায় বা কৃষক সংগঠনের মাধ্যমে ঋণ ও উপার্জন সংক্রান্ত সমাধান করা যেতে পারে। সমবায়ের মাধ্যমে কৃষক একে অপরকে সমর্থন দিতে পারে এবং ঋণ শোধের চাপ কমাতে পারে। 

কৃষক সমাজের এই ঋণজনিত সমস্যা শুধু তাদের ব্যক্তিগত নয়, এটি জাতীয় অর্থনীতিরও সমস্যা। যদি কৃষক ঋণমুক্ত ও আর্থিকভাবে স্বাধীন হতে পারে, তাহলে তাদের উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে এবং দেশের খাদ্য নিরাপত্তা আরও মজবুত হবে। ঋণ প্রদানের প্রাথমিক উদ্দেশ্য ছিল কৃষককে সহায়তা করা, কিন্তু আজকের বাস্তবতায় এটি তাদের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারের উচিত কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করে কৃষককে ঋণমুক্ত করা এবং তাদের উৎপাদনের স্বাভাবিক ধারাকে পুনঃস্থাপন করা।  

 

লেখক

নুসরাত জাহান (স্মরনীকা)

শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।

পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/154849