নদীমাতৃক বাংলাদেশের নদী-বিনাশের ইতিহাস
বাংলাদেশের ভূগোল, অর্থনীতি, সংস্কৃতি সব কিছুর শেকড়েই নদীর উপস্থিতি এতটাই গভীর যে আমাদের দেশকে বিশ্বজুড়ে পরিচিত করেছে নদীমাতৃক দেশ নামে। ইতিহাস জুড়ে নদী এই ভূখন্ডকে গড়ে তুলেছে, আবার বহুবার ভেঙেও দিয়েছে। নদীর গতিপথ, চর গঠন, ভাঙন, পলি সব মিলিয়ে বাংলাদেশের নদীপথের গল্পটি এক জটিল কিন্তু জীবনমুখী ইতিহাস। কিন্তু এই নদীমাতৃক পরিচয়ের ভিতরেই লুকিয়ে আছে এক ভয়ংকর বাস্তবতা আমাদের নদীগুলো ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। নদী-বিনাশ কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়; বরং দীর্ঘ সময় ধরে চলা মানবসৃষ্ট অব্যবস্থাপনা, নীতি-ভুল, শোষণ এবং পরিবেশ-অবজ্ঞার ফল। নদী-বিনাশের এই ইতিহাসকে বোঝার জন্য আমাদের কয়েকটি ধাপকে দেখতে হয় ঔপনিবেশিক সময়ের শাসননীতি, স্বাধীনতার পর নদী ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, শিল্পায়ন ও নগরায়ণের চাপ, এবং সাম্প্রতিক সময়ে নদী দখল-দূষণের অমানবিক মাত্রা। নদী ব্যবস্থাপনায় প্রথম ক্ষত বাংলার নদীগুলো একসময় ছিল যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম। নৌপথই ছিল বাণিজ্যের ভিত্তি। কিন্তু ব্রিটিশ শাসনের পর থেকেই নদীকে কেন্দ্র করে তৈরি হয় নতুন ধরনের অর্থনীতি নদীকে আর জীবন্ত সম্পদ হিসেবে দেখা হয়নি, বরং রাজস্ব ও জমিদারি কাঠামোর এক উপাদানে পরিণত করা হয়। নদীর চর ও তীরভূমি দখল নিয়ে গড়ে ওঠে জমিদারদের নিয়ন্ত্রণ, যা ভবিষ্যতের দখল সংস্কৃতির ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়।
আরেকটি বড় সমস্যা ছিল নদী-শাসন নিয়ে সরকারের উদাসীনতা। নদীর পলি জমে নাব্যতা কমে গেলেও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হতে থাকে। স্বাধীনতার পর নদী-ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা ১৯৭১ সালের পর নতুন রাষ্ট্রের সীমিত সম্পদ, পুনর্গঠন আর রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে নদী নিয়ে কার্যকর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা তৈরি হয়নি। বাংলাদেশ ওয়াটার ডেভেলপমেন্ট বোর্ড (ইডউই) থাকলেও তা সময়ের সাথে দুর্বল ব্যবস্থাপনা, অনিয়ম, অপর্যাপ্ত খনন নীতি এবং প্রকল্প-নির্ভর উন্নয়নের কারণে নদী রক্ষার ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণের ক্ষেত্রে বহু ভুল পরিকল্পনা বাংলাদেশের নদীপ্রবাহকে বহু জায়গায় পরিবর্তন করে দিয়েছে। যেসব নদী স্বাভাবিকভাবে ভাঙন ও পলির মাধ্যমে নিজের গতি বজায় রাখত, সেই নদীর সামনে কৃত্রিম বাঁধ তৈরি করায় নদীর স্বাভাবিক আচরণ ব্যাহত হয়। ফলে অনেক নদীর দ্বিতীয়ধারাগুলো শুকিয়ে যেতে শুরু করে।
নগরায়ণ, শিল্পায়ন ও নদীর ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ বাংলাদেশের দ্রুত নগরায়ণ নদী-বিনাশ ত্বরান্বিত করেছে। বিশেষ করে ঢাকার চারপাশের নদীগুলো বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, শীতলক্ষ্যা, বালু আজ দূষণের আধার। শিল্পবর্জ্য, ট্যানারির বর্জ্য, প্লাস্টিক, রাসায়নিক ও বর্জ্য পানি প্রতিদিন নদীতে ফেলা হয়। শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর অধিকাংশ এখনো কার্যকর ইটিপি চালায় না। নদীর পানি কালো হয়ে গন্ধ ছড়ায়, জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হয়ে যায়। বিশেষ করে বুড়িগঙ্গার গল্প আজ বাংলাদেশের নদী-বিনাশের প্রতীক। যেখানে একসময় মাঝিরা নৌকা বেয়ে চলত, সেখানে আজ পানির নিচে বিষের স্তর। নদীর ঢেউয়ের জায়গায় জমে আছে কচুরিপানা আর বর্জ্যের স্তূপ।
নদীর সবচেয়ে বড় শত্রু : নদী-বিনাশের ইতিহাসের সবচেয়ে নির্মম অধ্যায় হলো দখল। বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি নদীর পাশে ছোট-বড় দখলদার গড়ে উঠেছে ব্যক্তি, শিল্প প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক প্রভাবশালী, এমনকি সরকারি সংস্থাও এর বাইরে নয়। নদীর জায়গায় গড়ে উঠেছে ঘর, দোকান, ফ্যাক্টরি, বালু ঘাট, ইটভাটা, রিসোর্ট, ওয়্যারহাউস যা নদীর স্বাভাবিক প্রবাহকে সংকুচিত করেছে। দখল শুধু নদীর জায়গা কমায় না, নদীর চরিত্রই বদলে দেয়। নদী সংকুচিত হলে তার গতি কমে, পলি জমে, নাব্যতা হ্রাস পায় শেষ পর্যন্ত নদী মরেও যায়।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব : বাংলাদেশের নদী-পদ্ধতিতে জলবায়ু পরিবর্তন একটি বড় প্রভাবক। উত্তরাঞ্চলে খরা ও নদীর পানিপ্রবাহ কমে যাওয়া, দক্ষিণাঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাস নদী-ব্যবস্থাকে আরও দুর্বল করেছে। পদ্মা, মেঘনা, যমুনা এই তিন প্রধান নদী এখনো জীবন্ত, তবে তাদের গতিপথ ও চর গঠন আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। ছোট নদীগুলো যেমন ইছামতি, ধলেশ্বরী, করতোয়া, কপোতাক্ষ অনেকটাই বিপন্ন অবস্থায়। নদী হারালে কী হারায় বাংলাদেশ? নদীর সঙ্গে যুক্ত প্রতিটি বিষয়েরই দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব রয়েছে।
কৃষি: নদী না থাকলে সেচ ব্যবস্থা দুর্বল হয়।
মৎস্যসম্পদ: নদীর মাছ কমে গেলে লক্ষ মানুষের জীবিকা হুমকির মুখে পড়ে।
জীববৈচিত্র্য: নদী-নির্ভর জীবের বাস্তুতন্ত্র ধ্বংস হয়।
অর্থনীতি ও বাণিজ্য: নৌপথ কমে গেলে পরিবহন ব্যয় বাড়ে।
সংস্কৃতি: নদীমাতৃক সভ্যতার শিকড় দুর্বল হয়ে যায়। বাংলাদেশের নদী মানে শুধু পানি প্রবাহ নয়; এগুলো আমাদের অস্তিত্বের অংশ। নদী হারালে আমরা কেবল ভৌগোলিক সম্পদ হারায় না, হারায় আমাদের ইতিহাস, পরিচয় আর ভবিষ্যৎ। নদী রক্ষার লড়াই এখনই শুরু করতে হবে নদী পুনরুদ্ধার কোনো সহজ কাজ নয়, কিন্তু অসম্ভবও নয়। দখল উচ্ছেদ, নিয়মিত খনন, সঠিক নদী-ব্যবস্থাপনা, দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করা এগুলো করলে নদীগুলো আবার জীবন্ত হয়ে উঠতে পারে। নদীকে ‘জীবন্ত সত্তা’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার যে দাবি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উঠছে, তা অমূলক নয়। নদী বাঁচলে দেশ বাঁচবে এটি শুধু স্লোগান নয়, বাংলাদেশের বাস্তবতা। আজ যে নদী-বিনাশের ইতিহাস আমরা লিখে চলেছি, সেটি যেন ভবিষ্যতের প্রজন্মের কাছে একটি দুঃখজনক স্মৃতি হয়ে না থাকে। নদীর কাছে আমাদের যে ঋণ, তা শোধ করতে হবে এখনই সচেতনতা, নীতি, দায়িত্ববোধ এবং বাস্তব পদক্ষেপ দিয়ে।
লেখক
আরশী আক্তার সানী
শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা