বগুড়ার সারিয়াকান্দি হাটের জৌলুশ নেই, কোটি টাকার কৃষি ফসল বিক্রি হয় অন্য হাটে
সারিয়াকান্দি (বগুড়া) প্রতিনিধি: নানা জটিলতায় আগের জৌলুস হারিয়েছে বগুড়া সারিয়াকান্দির হাট। মূল হাটের ভেতরে উপজেলা ভূমি অফিস ভবন এবং অপরিকল্পিত হাটশেড নির্মানে জায়গার অভাবে ঘাস, কৃষিপণ্য, দুধ এবং হাঁস মুরগী বিক্রি হচ্ছে রাস্তার পাশে। এতে উপজেলার উৎপাদিত কোটি কোটি টাকার কৃষিপণ্য বিক্রি হচ্ছে সিরাজগঞ্জের লাঠুয়াপাড়া হাটসহ বিভিন্ন জেলার হাটে। হাটের আগের জৌলুস ফেরানো এবং রাস্তার পাশের পরিবর্তে নির্দিষ্ট বিক্রয়কেন্দ্র চান এলাকাবাসী।
বগুড়া জেলার অন্যতম প্রাচীন হাট সারিয়াকান্দি হাট বসে শনিবার এবং মঙ্গলবার। প্রাচীনকাল থেকেই হাটবারে সারিয়াকান্দি পৌর এলাকার হাটুরেদের সরগরমে মুখরিত হয়ে থাকতো। কোটি কোটি টাকার কৃষিপণ্যসহ নানা ধরনের পণ্য প্রতিদিন হাটে বেচাকেনা হতো। কিন্তু বিভিন্ন সময়ে নানা ধরনের ভুল সিদ্ধান্ত এবং উন্নয়নের নামে জটিলতায় হাটটি তার আগের জৌলুস হারিয়ে ফেলেছে।
গত কয়েকবছর আগে হাটের দক্ষিণ পাশে একেবারে হাটের মাঝে স্থাপন করা হয়েছে উপজেলা ভূমি অফিস ভবন। অফিসটি স্থাপন করার পর একদিকে যেমন হাটটি সংকুচিত হয়েছে এবং অপরদিকে এখানে বসে ব্যবসা করা ব্যবসায়ীরাও তাদের দোকানপাট হারিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে এলাকা ছাড়া হয়েছেন।
এদিকে হাটের মাঝখানে ভবনটি হওয়ায় হাটুরেদের ভীড়ে কর্মরত কর্মকর্তাগণ অনেক কষ্টে ভীড় ঠেলে ভবনে যাতায়াত করেন। হাটের উন্নয়নের নামে গত ২০২২ সালে উত্তর পাশের বিশাল এলাকাজুড়ে নির্মাণ করা হয়েছে দ্বিতল সারিয়াকান্দি বাজার মার্কেট ভবন। যার নীচতলা উন্মুক্ত করা হলেও ২য় তলা সবসময় তালাবদ্ধ অবস্থায় থাকে।
নীচতলার বিশাল এলাকাজুড়ে মাত্র ৩ টি মিষ্টির দোকান এবং ২ টি পানের দোকানের সংস্থান হয়েছে। যেখানে বেচাকেনার হার একেবারেই কম। তাই এলাকাবাসী বলছেন হাটের অর্ধেক জায়গা দখলকারী এ বাজার মার্কেট ভবন শুধুমাত্র সরকারের অর্থ অপচয় করেছে এবং হাটের জায়গা গিলে খেয়ে হাটটিকে দখল করে নষ্ট করে দিয়েছে।
এদিকে হাটের পূর্ব পাশে পাবলিক মাঠের পাশে বেশকিছু দোকানপাট গড়ে উঠেছিল আগেই। সেখানে প্রায় ২০ জন দোকানি তাদের ব্যবসা পরিচালনা করে আসছিলেন। কিন্তু হাটশেড নির্মাণের নামে গত কয়েকবছর আগে জোরপূর্বক দোকানিদের উচ্ছেদ করে সেখানে একতলা ভবন নির্মাণের কাজ শুরু হলেও তা শেষ হয়নি। এ নিয়ে আদালতে মামলা চলমান রয়েছে।
এটিও হাট ধ্বংসের কারণ হিসেবে মনে করছেন এলাকাবাসী। উপজেলার পাবলিক লাইব্রেরি অ্যান্ড ক্লাবের মাঠে ধান, পাট, মরিচসহ নানা ধরণের কৃষি ফসলের জমজমাট হাট বসতো। কিন্তু পাবলিক মাঠে খেলাধুলার জন্য কৃষি ফসল বেচাকেনা বন্ধ করে দেয়া হলেও অন্য কোনও নির্দিষ্ট বিক্রয়কেন্দ্র নির্ণয় করেনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
ফলে একেবারে বাধ্য হয়েই কতিপয় কৃষক থানা সড়কের দুইপাশে কৃষি ফসল বিক্রি করেন। কিন্তু সেখানেও স্থান সংকুলানের অভাবে বেশিরভাগ কৃষক তাদের কৃষি ফসল হাটে না এনে তাদের উৎপাদিত হাজার কোটি টাকার কৃষি ফসল পাশের সিরাজগঞ্জ জেলার লাঠুয়াপাড়া হাটসহ বিভিন্ন হাটে নিয়ে যাচ্ছেন।
ফলে সারিয়াকান্দি উপজেলার কৃষকেরা একদিকে যেমন বেশি ভাড়া দিয়ে কৃষি ফসল বাজারজাত করছেন, অপরদিকে সারিয়াকান্দি পৌরসভা হারাচ্ছে রাজস্ব। এদিকে হাটের ভেতরে জায়গা না হওয়ায় হাঁস, মুরগী এবং কবুতর বিক্রয় হচ্ছে পানি উন্নয়ন বোর্ডের সামনের সড়কের দুইপাশে।
প্রতিদিন সকাল এবং বিকালে দুধের বাজারও বসছে উপজেলা ভূমি অফিস সংলগ্ন সড়কের দুইপাশে। ঘাস বেচাকেনাও গত কয়েকবছর মাদ্রাসার একটি পতিত চললেও কিন্তু মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ সম্প্রতি জায়গাটিতে কাটাতারের বেড়া দিয়ে গাছ রোপণ করেছে। ফলে সরকারি স্কুলের একটি পতিত জায়গায় এখন ঘাস বেচাকেনা হচ্ছে।
সারিয়াকান্দি বণিক সমিতির সভাপতি সিরাজুল ইসলাম ফুল বলেন, সারাদেশের মত গত সরকারের সময় উন্নয়নের নামে হরিলুট হয়েছে। গত পৌরসভার মেয়রও এমপির সাথে যোগসাজশে হাটের উন্নয়নের নামে হাটের ভেতরে অপরিকল্পিত বিভিন্ন ধরনের পাকা স্থাপনা নির্মাণ করেছে এবং নিজেরা লাভবান হয়েছে। হাটটি আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে এবং কৃষিফসলসহ বিভিন্ন ধরনের পণ্যের নির্দিষ্ট বিক্রয়কেন্দ্র চালু করতে পৌর কর্তৃপক্ষের দাবি জানাচ্ছি।
সারিয়াকান্দি উপজেলা সহকারী কমিশনার ভূমি ও পৌর প্রশাসক আতিকুর রহমান বলেন, ইতিপূর্বে সারিয়াকান্দি হাটের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে পৌরসভার বিভিন্ন সভায় আলোচনা করা হয়েছে। হাটটিকে ঢেলে সাজাতে এবং বিভিন্ন পণ্যের নির্দিষ্ট বিক্রয়কেন্দ্র চালু করতে আমাদের প্রচেষ্টা চলমান রয়েছে।
পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/154632