ইরানে সংকট : অপশক্তি অপ্রতিরোধ্য

ইরানে সংকট : অপশক্তি অপ্রতিরোধ্য

ইরান সংকট ঘনীভূত হয়ে আছে। বিগত দুই সপ্তাহের তীব্র বিক্ষোভ দমনে কঠোরতর অবস্থান নিয়েছে ইরানের ক্ষমতাসীন সরকার। গ্রেফতার হয়েছেন লক্ষাধিক, মৃত্যুবরণ করেছেন প্রায় ২ হাজারের বেশি বিক্ষোভকারী। ইন্টারনেট পরিসেবা বন্ধ বা নিয়ন্ত্রিত হবার কারণে গণমাধ্যমে প্রকৃত অবস্থা কতখানি উঠে আসছে তা নিয়েও সংশয় রয়েছে? কী ঘটতে যাচ্ছে ইরানে? সারা বিশ্বের নিরাপত্তা কী তাহলে খাদের কিনারে এসে দাঁড়িয়েছে? তবে আপাত দৃষ্টিতে মনে হচ্ছে ইরান সরকারের কঠোর দমন-পীড়নের কারণে স্তিমিত হয়ে আসছে আন্দোলন। ইন্টারনেট ব্যবস্থাও আংশিক চালু হয়েছে। 

ইরানে আন্দোলনের শুরুটা হয়েছিল জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে অতিষ্ঠ জনগণের অসন্তোষের বারুদ থেকে। ধীরে ধীরে সেই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে প্রায় সারাদেশে এবং রূপ নিয়েছে সরকার পতনের আন্দোলনে। আমি যখন লিখছি তখনও আন্দোলন চলছে কিন্তু সরকার পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ নিতে পেরেছে বলেই মনে হচ্ছে। গণমাধ্যমের প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী ইরানেও পশ্চিমাদের মেটিকুলাস ডিজাইনে একটি অভ্যুত্থান ঘটানোর চেষ্টা হচ্ছে। কেউ এটাকে দেখছেন আমেরিকান ডিপ ষ্টেট এর উৎকর্ষতা হিসেবে আবার কেউ কেউ বলছেন এটা আমেরিকার নির্লজ্জ দাদাগিরি! আপনি কিভাবে দেখেন? ভেনিজুয়েলায় আমেরিকা যে নগ্নতা দেখিয়েছে এবং এখন আবার গ্রীণল্যান্ডে হামলার যে হুমকি দেয়া হচ্ছে তাতে পছন্দ না হলেও মানতে হচ্ছে আমেরিকা বিশ্ব মোড়ল, অপ্রতিরোধ্য এক অপশক্তি। মুখে যতই গণতন্ত্রের ফেনা উঠুক, তারা আসলে ধনকুবের, ধন (ডলার) বৃদ্ধি ও কর্তৃত্ব ধরে রাখার স্বার্থে আমেরিকা যখন যেখানে খুশী সরকার ফেলে দেবে, অথবা তুলে নিয়ে গিয়ে বিচার বসাবে নিজের দেশে। বৈশ্বিক নীতি, আইন, শিষ্টাচার, ইত্যাদি সবই কেবল অন্যদের জন্য, আমেরিকান সরকারের জন্য নয়। বুঝিনা, কিভাবে এসব মেনে নিচ্ছেন আমেরিকার সভ্য ও সুশীল সমাজ?

 আমেরিকার রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প যে বিশ্বের প্রচলিত গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা ধ্বংস করছেন সে সমালোচনা করেছেন জার্মানির প্রেসিডেন্ট ওয়াল্টার ষ্টেইনমার। ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্যতম প্রভাবশালী এই নেতা সকলকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, বিশ্ব যেন লুটেরাদের আস্তানায় পরিণত না হয়, আন্তর্জাতিক বিধিব্যবস্থা যেন ভেঙে না পড়ে তা লক্ষ্য রাখতে হবে। অন্যথায় নীতিহীন ক্ষমতাশালীরা যা মনে হবে সেটিকেই দখল করে নেবেন। মনে হচ্ছে, আমেরিকা এখন আর বিশ্বে গণতন্ত্রের রক্ষক নয়, বরং তাদের কারণেই বিশ্বে গণতান্ত্রিক পরিবেশ সংকুচিত হচ্ছে। বিশ্ব ক্রমশ: অস্থিতিশীল হয়ে পড়ছে এই সম্পদলোভীদের জন্যই। উল্লেখ্য, নিউইয়র্ক টাইমসকে দেয়া এক সাক্ষাতকারে ট্রাম্প দম্ভ ভরে বলেছেন, তিনি তাঁর নিজস্ব মন ও নীতি ছাড়া আর কোন কিছুরই তোয়াক্কা করেন না। শুধু ট্রাম্প একা নন, আমেরিকার প্রায় সকল সরকারই আসলে ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের ভারে অন্ধ। তাদের অহঙ্কার আকাশচুম্বী। ইরানের পরমাণুকেন্দ্রে হামলা, ইসরায়েলকে প্রশ্রয় দেয়া, সোভিয়েত ইউনিয়ন ধ্বংস করে দেয়া, ইরাক, লিবিয়া, আফগানিস্তান থেকে বাংলাদেশ, কোথায় নেই তাদের মেটিকুলাস পরিকল্পনার থাবা? সেনা অভিযান চালিয়ে সার্বভৌম দেশ ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে সস্ত্রীক অপহরণের ঘটনাটি যেন হলিউড এর কোন ফিল্মকেও হার মানিয়েছে। কোথায় নেই এই অন্ধ মোড়ল!  

পৃথিবীর কোন সভ্য মানুষই স্বৈরশাসন পছন্দ করেন না। অনেক ত্যাগ ও সংগ্রামের মধ্যো দিয়ে বিশ্বব্যাপী গণতান্ত্রিক অর্থাৎ নিজেদের শাসনভার নিজেরাই ঠিক করার যে দর্শন বেছে নিয়েছেন, সেই মন্ত্র যেন আমেরিকার জন্য প্রযোজ্য নয়। অহঙ্কারী শাসকেরা সব সময় ভুলে যায় যে, ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না। আজ যারা ক্ষমতার দম্ভে বিশ্বকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছেন, একদিন তাদের দেশেই যে বিক্ষোভের আগুন ছড়িয়ে পড়বে না সেই নিশ্চয়তা কোথায়? নোবেল শান্তি পুরস্কার প্রাপ্ত ব্যক্তিটিও যদি স্বৈরশাসকের পদলেহী হোন, যেমনটি আমরা ভেনিজুয়েলায় দেখছি, তিনিও একসময় ইতিহাসের কঠিন বিচারের মুখোমুখি হবেন, সেটা মনে রাখা দরকার। সাধারণ মানুষকে বোকা ও দুর্বল ভেবে যারা তাদের দিয়ে কাঁঠালের আমসত্ব তৈরির চেষ্টা করেন, তারা আজ কোথায়, কতটা জনবিচ্ছিন্ন সেটা ভুলে যাওয়াটা কখনই কাম্য নয়। 

প্রত্যেক দেশেই সরকারবিরোধিতা হয়, হবেই। কিন্তু এই বিরোধিতার আড়ালে একটি কুচক্রী মহল থাকে যারা বিদেশী শক্তির মদদপুষ্ট হয়। নিজেরা ক্ষমতায় যাওয়ার লোভে কিংবা অর্থলাভের আশায় তারা বিদেশী শক্তির সাথে হাত মিলিয়ে নিজের দেশে বিক্ষোভের আগুনে ঘি ঢেলে দেয়। বিক্ষোভ দমনে প্রাণ কেড়ে নেয়াটা আমরা সমর্থন করি না। আমরা সবসময়ই আলোচনা ও সমঝোতার মাধ্যমে সমাধান খোঁজার পক্ষে। সেটা সম্ভব না হলে ভোট দিয়ে জনরায় গ্রহণ করাটাই উত্তম পন্থা বলে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বলা হয়। ইরানেও সেটা হোক, যেমনটি হতে যাচ্ছে আমাদের দেশে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি। বাংলাদেশের ত্রয়োদশ নির্বাচন কেবলমাত্র কাউকে ক্ষমতায় বসানোর নির্বাচন নয়। এর তাৎপর্য আরও গভীরে। বিশেষ করে, বৈশ্বিক রাজনৈতিক শক্তি বলয়ে বাংলাদেশ কিভাবে, কার সাথে বন্ধুত্ব বাড়িয়ে নিজের স্বার্থ হাসিল করবে সেটাও নির্ধারিত হবে।

 বাংলাদেশ সবসময় শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান বজায় রাখার নীতি মেনে চলেছে। আগামীতে সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে বৈরিতা নয়-এই নীতি মেনে চলা এবং বাংলাদেশের মানুষের স্বার্থকে সর্বাগ্রে স্থান দিবে যে দল বা জোট তাদের পক্ষে জনতার রায় যাবে বলে আমার প্রত্যাশা। যদিও দেশের সাধারণ মানুষের কাছে বিশ্ব রাজনীতির চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো নিজেদের জীবন-জীবিকা ও নিরাপত্তার প্রশ্নটি। বাংলাদেশের মানুষ শান্তিতে ঘুমাতে চায়। পেট ভরে খেতে চায়, দেখতে চায় সন্তানের হাসিভরা মুখ। দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতি ও দাতাগোষ্ঠীর ঋণ নির্ভর উন্নয়ন কর্মসূচিগুলো আগামীতে দেশের মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে ধরতে পারবে কিনা তা নিয়ে সকলেই চিন্তিত। ব্যাংকে টাকা নেই। কোম্পানীগুলো প্রায় বন্ধ হতে বসেছে। বেকারত্ব বাড়ছে। এরই মধ্যে নতুন করে সরকারী কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধির উদ্যোগ জনমনে হতাশা বৃদ্ধি করবে। দেশের প্রান্তজনের কথা ভাবুন। বলুন আপনারা ক্ষমতায় গিয়ে কিভাবে সাধারণ মানুষকে স্বস্তিতে রাখবেন। তারপর জনতা ভাববে আপনাদের ভোট দিবে কি না? 

 

লেখক

আতাউর রহমান মিটন 

প্রাবন্ধিক ও গবেষক 

পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/154310