গ্যাস সিন্ডিকেটে বন্ধ রান্নাঘর

গ্যাস সিন্ডিকেটে বন্ধ রান্নাঘর

দেশজুড়ে আজ একটাই প্রশ্ন রাষ্ট্র কি জানে, নাকি জেনেও চুপ আছে? ‎লাখো ঘরে চুলা নিভে গেছে। কোথাও গ্যাস সিলিন্ডার নেই, কোথাও আবার আছে কিন্তু দামের আগুনে নাগালের বাইরে। যে দেশে প্রতিদিন উন্নয়নের জয়গান শোনা যায়, সেই দেশেই আজ রান্না বন্ধ হয়ে যাচ্ছে হাজার হাজার ঘরে। এটা আর সাময়িক সংকট নয়; এটা রাষ্ট্রীয় অবহেলার নির্মম দলিল। ‎এই সংকট কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফল নয়। যুদ্ধ হয়নি, আমদানি বন্ধ হয়নি, বৈশ্বিক বাজারেও বড় কোনো অস্থিরতা নেই। তবুও সারা দেশে একসঙ্গে এলপি গ্যাস উধাও। এই বাস্তবতায় প্রশ্ন উঠবেই এটা কি কাকতালীয় সংকট, নাকি পরিকল্পিত অপরাধ? ‎পাইপ লাইনের গ্যাস সীমিত হওয়ার পর এলপি গ্যাস হয়ে উঠেছিল মানুষের শেষ ভরসা। কিন্তু সেই নির্ভরশীলতাকেই পুঁজি করে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট আজ বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। অভিযোগ নতুন নয়, কিন্তু এবারের সংকটের বিস্তার ও গভীরতা আগের সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। ‎ভোক্তারা বলছেন, হঠাৎ করেই গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। ডিলাররা বলছেন, কোম্পানি থেকে গাড়ি আসছে না। কোম্পানিগুলো মুখ খুলছে না। আর এই নীরবতার ফাঁকে ফাঁকে বাড়ছে দাম, বাড়ছে অসহায়তা। বাজারে পণ্য থাকলেও তা মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে না- এটাই কৃত্রিম সংকটের সবচেয়ে বড় প্রমাণ। 


গ্যাস শুধু রান্নার জ্বালানি নয়, এটি খাদ্যনিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। একজন গৃহিণীর কাছে গ্যাস মানে পরিবারের প্রতিদিনের খাবার নিশ্চিত করা। একজন দিনমজুরের কাছে গ্যাস না থাকা মানে হোটেল থেকে বাড়তি খরচে খাবার কেনা। একজন ক্ষুদ্র হোটেল মালিকের কাছে এর মানে ব্যবসা বন্ধ, কর্মচারীদের বেকার হয়ে পড়া। এই সংকট তাই কেবল ভোক্তার নয় এ এক সামাজিক বিপর্যয়। ‎সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো এই সংকট পুরোপুরি কৃত্রিম। বাজারে গ্যাস আছে, কিন্তু ছাড়ছে না। মজুত আছে, কিন্তু সরবরাহ বন্ধ। কারণ একটাই দাম বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করা। এটাই সিন্ডিকেটের মূল কৌশল। ‎বারবার দেখা যাচ্ছে, শীতকাল, উৎসব বা বিশেষ সময় এলেই এলপি গ্যাসের বাজার অস্থির হয়ে ওঠে। কিছুদিন সাপ্লাই সংকট, তারপর দাম বাড়িয়ে বাজার ‘স্বাভাবিক’। এই চক্র কি স্বাভাবিক বাজার ব্যবস্থার অংশ, নাকি সুপরিকল্পিত মুনাফালোভী ষড়যন্ত্র? ‎প্রশাসনের ভূমিকা এখানে সবচেয়ে বেশি প্রশ্নবিদ্ধ। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর আছে, জ্বালানি বিভাগ আছে, প্রতিযোগিতা কমিশন আছে কিন্তু সিন্ডিকেট ভাঙার মতো দৃশ্যমান পদক্ষেপ কোথায়? অভিযান হয়, জরিমানা হয়, সংবাদ হয় কিন্তু সিন্ডিকেট থেকে যায় বহাল তবিয়তে। জরিমানাই যেন তাদের ব্যবসার নিয়মিত খরচ। ‎আরও উদ্বেগজনক অভিযোগ হলো এই সিন্ডিকেটের সঙ্গে প্রভাবশালী মহলের যোগসাজশ। তা না থাকলে কীভাবে কয়েকটি কোম্পানি পুরো দেশের রান্নাঘর জিম্মি করে রাখতে পারে? কার সাহসে কোটি মানুষের নিত্যপ্রয়োজন নিয়ে এমন ছিনিমিনি খেলা চলে? এই সংকট নারীদের ওপর সবচেয়ে বেশি চাপ সৃষ্টি করছে। রান্নাঘরের দায়িত্ব যাদের কাঁধে, তারাই প্রথম এই অভাবের শিকার। বিকল্প হিসেবে কাঠ, কয়লা বা বাইরে থেকে খাবার সবই বাড়তি খরচ, বাড়তি কষ্ট ও স্বাস্থ্যঝুঁকি। অথচ এই সংকটের দায় তাদের নয়। ‎শিশুরাও এর বাইরে নয়। গ্যাস না থাকলে স্কুলে যাওয়ার আগে গরম খাবার নেই। অসুস্থ হলে পথ্য রান্না করা যাচ্ছে না। কিন্তু এসব বাস্তবতা কোনো নীতিনির্ধারকের বক্তব্যে গুরুত্ব পাচ্ছে না। ‎এখন প্রশ্ন হলো রাষ্ট্র কি সত্যিই নিরুপায়? নাকি নিয়ন্ত্রণহীনতা সুবিধাজনক? যদি নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো সক্রিয় হতো, তাহলে কি এত সহজে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা যেত? ‎এই মুহূর্তে প্রয়োজন কঠোর ও দৃশ্যমান সিদ্ধান্ত। গ্যাস সিলিন্ডার কোম্পানিগুলোর মজুত, সরবরাহ ও মূল্য নির্ধারণের তথ্য জনসমক্ষে আনতে হবে। কেন সাপ্লাই বন্ধ তার ব্যাখ্যা দিতে হবে মালিকপক্ষকে। সিন্ডিকেট প্রমাণ হলে লাইসেন্স বাতিলসহ দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

 
একই সঙ্গে দরকার দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা। এলপি গ্যাস বাজারকে পুরোপুরি বেসরকারি মুনাফার হাতে ছেড়ে দিলে ভবিষ্যতে এই সংকট আরও ভয়াবহ হবে। রাষ্ট্রীয় তদারকি, স্বচ্ছ মূল্য নির্ধারণ এবং বিকল্প জ্বালানির প্রসার এখন সময়ের দাবি। ‎একজন দিনমজুরের ঘরে গ্যাস না থাকা মানে শুধু রান্না বন্ধ নয় মানে সন্তানকে না খাইয়ে ঘুম পাড়ানো। একজন গৃহিণীর কাছে এর মানে প্রতিদিনের লজ্জা আর অসহায়তা। একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর কাছে এর মানে বন্ধ দোকান আর কর্মচারীদের হতাশ মুখ। ‎এই মানুষগুলো কি রাষ্ট্রের হিসাবের বাইরে? ‎সবচেয়ে বিপজ্জনক বিষয় হলো রাষ্ট্রের নীরবতা। কারণ নীরবতা মানেই অনুমোদন। আজ যদি গ্যাস নিয়ে সিন্ডিকেট নির্বিঘ্নে চলে, কাল পানি, বিদ্যুৎ, খাবার সবকিছুই একই পথে যাবে। ‎এখন আর বিবৃতির সময় নেই। গ্যাস সিলিন্ডার কারা মজুত করে রেখেছে, কারা সরবরাহ বন্ধ রেখেছে নাম প্রকাশ করে জানাতে হবে। যারা মানুষকে জিম্মি করেছে, তাদের লাইসেন্স বাতিল করতে হবে। ‎উন্নয়ন তখনই অর্থবহ, যখন মানুষের দৈনন্দিন জীবন স্বস্তির হয়। চুলা নিভিয়ে রেখে উন্নয়নের গল্প মানুষ আর শুনতে চায় না। ‎আজ চুলায় আগুন নিভে আছে। কাল সেই আগুন জ্বলতে পারে মানুষের ক্ষোভে। সেই আগুন নেভাতে হলে এখনই সিন্ডিকেট ভাঙতে হবে। সিদ্ধান্ত নিতে হবে রাষ্ট্র থাকবে মানুষের পাশে, না সিন্ডিকেটের পেছনে?

এই সিদ্ধান্ত আর পিছানোর সুযোগ নেই। 


‎লেখক :

বুশরা আজমী 

সমাজকর্ম বিভাগ, ৩য় বর্ষ, রাজশাহী কলেজ 

পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/154189