আগামীর যোগাযোগ ব্যবস্থা ইলেকট্রিক ভেহিকেল

আগামীর যোগাযোগ ব্যবস্থা ইলেকট্রিক ভেহিকেল

মোঃ রেজাউল করিম রাজু :  একবিংশ শতাব্দীর পৃথিবীতে প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের মানদণ্ড এখন আর কেবল স্মার্টফোন বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি ছড়িয়ে পড়েছে আমাদের যাতায়াত ব্যবস্থায়। জীবাশ্ম জ্বালানির ভান্ডার ফুরিয়ে আসা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াল থাবাকে রুখে দিতে বিশ্বজুড়ে এখন চলছে ‘ইলেকট্রিক ভেহিকেল’ বা ইভি বিপ্লব। টেসলা, বিওয়াইডি, কিংবা ভক্সওয়াগনের মতো জায়ান্ট কোম্পানিগুলো যখন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে তেলের গাড়িকে জাদুঘরে পাঠানোর আয়োজন করছে, তখন বাংলাদেশও এই দৌড়ে পিছিয়ে নেই। তবে উন্নত বিশ্বের সাথে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট মেলানোটা হবে বোকামি। আমাদের রয়েছে নিজস্ব সম্ভাবনা, আর তার সাথে জড়িয়ে আছে বিদ্যুতের মতো এক জটিল ও বিশাল চ্যালেঞ্জ।

জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে মুক্তির পথ ইভি

বহির্বিশ্বে ইলেকট্রিক গাড়ি এখন আর বিলাসিতা নয়, বরং প্রয়োজনে পরিণত হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ঘোষণা দিয়েছে ২০৩৫ সালের পর তারা আর পেট্রোল বা ডিজেল চালিত গাড়ি বিক্রি হতে দেবে না। চীন বর্তমানে বিশ্বের বৃহত্তম ইভি বাজার। নরওয়ের মতো দেশে নতুন বিক্রি হওয়া গাড়ির ৮০ শতাংশই এখন ইলেকট্রিক। এই পরিবর্তনের মূল কারণ দুটি: পরিবেশ রক্ষা এবং দীর্ঘমেয়াদে খরচ কমানো। প্রযুক্তির উন্নয়নের ফলে এখন লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির দাম কমছে এবং গাড়ির রেঞ্জ (এক চার্জে অতিক্রান্ত দূরত্ব) বাড়ছে। ফাস্ট চার্জিং স্টেশনের বদৌলতে এখন ২০ মিনিটেই ৮০ শতাংশ চার্জ করা সম্ভব হচ্ছে, যা কয়েক বছর আগেও ছিল কল্পনাতীত।

 

বাংলাদেশের ইভি যাত্রা

বাংলাদেশের অটোমোবাইল খাত ধীরে ধীরে আমদানী নির্ভরতা কমিয়ে উৎপাদনের দিকে ঝুঁকছে। সরকার ‘অটোমোবাইল শিল্প উন্নয়ন নীতিমালা’ প্রণয়ন করেছে, যেখানে ২০৩০ সালের মধ্যে অন্তত ৩০ শতাংশ যানবাহন বিদ্যুচ্চালিত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে নীতিনির্র্ধারণী পর্যায় এবং বাস্তব প্রয়োগের মধ্যে বড় ফারাক রয়েছে। বাংলাদেশে ইভি গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রধান বাধাগুলো হলো চার্জিং স্টেশনের অপ্রতুলতা, উচ্চ শুল্কহার (যদিও ইভি আমদানিতে শুল্ক ছাড় রয়েছে, তবুও তা সাধারণের নাগালের বাইরে), এবং দক্ষ মেকানিকের অভাব। কিন্তু আশার আলো দেখাচ্ছে আমাদের দেশীয় কিছু শিল্পগোষ্ঠী। তারা শুধু গাড়ি আমদানীই করছে না, বরং দেশেই সংযোজন এবং ভবিষ্যতে উৎপাদনের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। এটি সফল হলে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের পাশাপাশি প্রযুক্তিবান্ধব কর্মসংস্থান তৈরি হবে।

 

 

দেশীয় শিল্পে ইলেকট্রিক ভেহিকেল উত্থান 

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ইলেকট্রিক গাড়ির কথা উঠলেই আকিজ গ্রুপের নাম প্রথম সারিতে চলে আসে। আকিজ মটরস দীর্ঘদিন ধরেই কমার্শিয়াল এবং ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য ইলেকট্রিক যানবাহন নিয়ে কাজ করছে। তবে এবারের ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় তাদের উপস্থাপন বাংলাদেশের অটোমোবাইল ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় যোগ করেছে।

আকিজ মটরস বাজারে এনেছে তাদের ফ্ল্যাগশিপ ইলেকট্রিক প্রাইভেট কার ‘আকিজ ARRA’ । প্রযুক্তিবিদ এবং অটোমোবাইল বিশ্লেষকদের মতে, এই গাড়িটি বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত এবং উচ্চ-মধ্যবিত্ত শ্রেণীর জন্য গেম চেঞ্জার হতে পারে।

কেন আকিজ ARRA বিশেষ?

গাড়িটির দিকে তাকালে প্রথমেই চোখে পড়ে এর আধুনিক অ্যারোডাইনামিক ডিজাইন, যা বাতাসের বাধা কমিয়ে গাড়ির গতি ও দক্ষতা বাড়াতে সাহায্য করে। তবে এর মূল শক্তি লুকিয়ে আছে এর প্রযুক্তিতে।

রেঞ্জ বা মাইলেজ: বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ইভি কেনার ক্ষেত্রে গ্রাহকের সবচেয়ে বড় ভয় হলো—রাস্তায় চার্জ শেষ হয়ে গেলে কী হবে? আকিজ ARRA এই ভয়কে জয় করেছে। কোম্পানিটির দাবি অনুযায়ী, একবার ফুল চার্জে গাড়িটি প্রায় ৪১০ থেকে ৪২০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে সক্ষম। অর্থাৎ, ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম গিয়েও ব্যাটারিতে যথেষ্ট চার্জ অবশিষ্ট থাকবে। পরিবেশবান্ধব ও সাশ্রয়ী: এটি সম্পূর্ণ শব্দহীন এবং কার্বন নিঃসরণমুক্ত। তেলের গাড়ির তুলনায় এর রক্ষণাবেক্ষণ খরচ প্রায় ৭০ শতাংশ কম। কারণ এতে ইঞ্জিন অয়েল, ফিল্টার বা স্পার্ক প্লাগ পরিবর্তনের ঝামেলা নেই। স্মার্ট ফিচার: আধুনিক ড্যাশবোর্ড, ইনফোটেইনমেন্ট সিস্টেম এবং সেফটি সেন্সর একে সমসাময়িক যেকোনো জাপানি রিকন্ডিশন্ড গাড়ির চেয়ে এগিয়ে রেখেছে।

অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা

শুধু আকিজ নয়, বাংলাদেশ অটো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিশাল কারখানা স্থাপন করছে যেখানে তারা নিজস্ব ব্র্যান্ডের ইভি তৈরি করবে। এছাড়া ওয়ালটন এবং রানার-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলোও দুই চাকার এবং তিন চাকার ইলেকট্রিক যানে বড় বিনিয়োগ করছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলো এমন প্রযুক্তির গাড়ি আনছে যা ‘এনার্জি এফিশিয়েন্ট’ বা কম বিদ্যুতে বেশি পথ চলতে সক্ষম।

বিদ্যুতের চ্যালেঞ্জ এক মহাগুরুত্বপূর্ণ সমীকরণ

ইলেকট্রিক গাড়ির স্বপ্ন দেখতে ভালো লাগে, কিন্তু এই গাড়িগুলো চলবে কী দিয়ে? বিদ্যুৎ দিয়ে। আর এখানেই বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে। আমাদের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বেড়েছে সত্য, কিন্তু সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থায় এখনো ঘাটতি রয়েছে।

একটি সাধারণ হিসাব কষা যাক। যদি আগামী ৫ বছরে রাস্তায় ১ লাখ ইলেকট্রিক প্রাইভেট কার এবং ৫ লাখ নতুন ইলেকট্রিক বাইক নামে, তবে জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন কয়েক হাজার মেগাওয়াট অতিরিক্ত লোড যুক্ত হবে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে, যেখানে গ্রীষ্মকালে লোডশেডিং মোকাবিলা করতে হিমশিম খেতে হয়, সেখানে এই বাড়তি চাপ সামাল দেওয়া অত্যন্ত কঠিন।

সমাধান কোন পথে?

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইভি বিপ্লব সফল করতে হলে আমাদের বেইস লোড পাওয়ার প্ল্যান্টের ওপর জোর দিতে হবে। এখানেই রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো মেগা প্রজেক্টগুলোর প্রাসঙ্গিকতা চলে আসে। রূপপুরের মতো আরও একটি বা দুটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র অথবা বড় আকারের নবায়নযোগ্য শক্তির উৎস নিশ্চিত করা না গেলে, ইভি চার্জিং দেশের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়াবে।

তবে আশার কথা হলো, আকিজ ARRA-র মতো আধুনিক গাড়িগুলো ‘রিজেনারেটিভ ব্রেকিং’ প্রযুক্তি ব্যবহার করে, যা ব্রেক করার সময় উৎপন্ন শক্তি পুনরায় ব্যাটারিতে ফিরিয়ে দেয়। ফলে বিদ্যুতের অপচয় কমে। বড় কোম্পানিগুলোর ফোকাস এখন এখানেই কীভাবে কম বিদ্যুতে বেশি মাইলেজ দেওয়া যায়।

মুদ্রার উল্টো পিঠ ব্যাটারি চালিত রিকশা

এবার দৃষ্টি দেওয়া যাক রাস্তার বাস্তব চিত্রের দিকে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। একদিকে যখন আকিজ বা অন্যান্য কর্পোরেটরা অত্যাধুনিক প্রযুক্তির গাড়ি আনছে, তখন অন্যদিকে আমাদের অলিগলি সয়লাব হয়ে গেছে অনিরাপদ, অবৈধ এবং প্রযুক্তিগতভাবে ত্রুটিপূর্ণ ব্যাটারি চালিত রিকশায়।

প্রযুক্তিগত দেউলিয়াত্ব ও নিরাপত্তার ঝুঁকি : বর্তমানে রাস্তায় যে লাখ লাখ ব্যাটারি চালিত রিকশা চলছে, সেগুলোর কোনোটিই অটোমোবাইল ইঞ্জিনিয়ারদের নকশা করা নয়। এগুলো তৈরি হচ্ছে স্থানীয় গ্যারেজে, যেখানে হাতুড়ি-বাটাল ছাড়া আধুনিক কোনো যন্ত্রপাতি নেই। যারা একসময় সাধারণ রিকশা মেরামত করত, তারাই এখন নিজেদের ‘ইঞ্জিনিয়ার’ দাবি করে মোটর ও ব্যাটারি ফিটিং করছে।

ফলাফল?

১. ভঙ্গুর চ্যাসিস: সাধারণ রিকশার বডিতে শক্তিশালী মোটর বসানোর ফলে ব্রেকিং সিস্টেম কাজ করে না, যা প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা ঘটাচ্ছে।

২. অদক্ষ ব্যাটারি ব্যবস্থাপনা: এই রিকশাগুলোতে ব্যবহার করা হয় নিম্নমানের লিড-এসিড ব্যাটারি। একটি আধুনিক ইভি যেখানে ১ ইউনিট বিদ্যুতে ১০ কিলোমিটার যেতে পারে, এই রিকশাগুলো সেখানে ২ কিলোমিটারও যেতে পারে না। অর্থাৎ, এরা বিদ্যুতের ভয়ানক অপচয়কারী।

জাতীয় গ্রিডে ‘লিকেজ’ ও অর্থনৈতিক ক্ষতি

সবচেয়ে ভয়াবহ দিকটি হলো এদের চার্জিং প্রক্রিয়া। রাজধানীসহ সারাদেশে হাজার হাজার অবৈধ গ্যারেজে এই রিকশাগুলো চার্জ দেওয়া হয়। এর সিংহভাগই হয় বিদ্যুৎ চুরি করে বা ‘হুকিং’ পদ্ধতির মাধ্যমে। ডাইরেক্ট লাইন থেকে বিদ্যুৎ নেওয়ার ফলে মিটারে কোনো রিডিং ওঠে না, ফলে রাষ্ট্র হাজার হাজার কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে।

তাছাড়া, এই রিকশাগুলোর মোটর এবং কন্ট্রোলার অত্যন্ত নিম্নমানের হওয়ায় এগুলো প্রচুর তাপ উৎপন্ন করে এবং বিদ্যুতের সিস্টেম লস বাড়ায়। একটি আকিজ ARRA বা মানসম্মত ইভি চার্জ দিলে যে আউটপুট পাওয়া যায়, এই রিকশাগুলো তার ৫০ ভাগও দিতে পারে না। অথচ গ্রিডের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে তার চেয়ে দ্বিগুণ। দিনে দুইবার চার্জ দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা বিদ্যুতের চাহিদাকে কৃত্রিমভাবে বাড়িয়ে দিচ্ছে।

আমাদের করণীয়

বাংলাদেশের ইভি ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল, তবে তা হতে হবে পরিকল্পিত। আমাদের সামনে এখন দুটি রাস্তা: একটি হলো অপরিকল্পিত রিকশার মতো প্রযুক্তির ব্যবহার যা বিদ্যুতের ব্ল্যাকহোল তৈরি করবে, অন্যটি হলো মানসম্মত ও বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী যানবাহনের ব্যবহার।

১. কঠোর নীতিমালা: ব্যাটারি চালিত রিকশাগুলোকে একটি নিয়মতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে আনতে হবে। তাদের প্রযুক্তিগত মানোন্নয়ন বাধ্যতামূলক করতে হবে। লিড এসিড ব্যাটারি নিষিদ্ধ করে লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি ব্যবহারে বাধ্য করতে হবে।

২. স্মার্ট চার্জিং গ্রিড: বিদ্যুতের ওপর চাপ কমাতে ‘অফ-পিক আওয়ার’ (যেমন গভীর রাতে) চার্জিংয়ে উৎসাহিত করতে হবে। এর জন্য স্মার্ট মিটারিং ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন।

৩. টেকসই বিদ্যুৎ উৎপাদন: রূপপুর প্রকল্পের দ্রুত বাস্তবায়ন এবং নবায়নযোগ্য শক্তির উৎস বৃদ্ধি করা ছাড়া ইভি বিপ্লব সফল করা অসম্ভব।

৪. দেশীয় শিল্পের প্রণোদনা: যারা মতো গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগ করছে এবং এনার্জি-এফিশিয়েন্ট গাড়ি আনছে, তাদের কর ছাড়সহ বিশেষ সুবিধা দিতে হবে।

যে কোনো মতামত, তথ্য বা প্রতিক্রিয়ার জন্য যোগাযোগ করতে পারেন :  rajuitnews@gmail.com



পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/153333