দারিদ্র্য ও বেকারত্ব নিরসনে মহানবী (সা.) এর নির্দেশনা
দারিদ্র্য ও বেকারত্বের সমস্যা শুধু আধুনিক বিশ্বের নয়, অতীতেও মানবসমাজে এ সংকট বিদ্যমান ছিল। মানবজাতির মুক্তির পথপ্রদর্শক রসুলুল্লাহ (সা.) এই সমস্যার বাস্তবসম্মত ও কার্যকর সমাধান দিয়ে গেছেন। এ ক্ষেত্রে তাঁর প্রথম ও প্রধান নির্দেশনা ছিল—বেকার হয়ে বসে না থেকে যেকোনো বৈধ কাজ ও পেশায় নিজেকে নিয়োজিত করা।
নবী ও রসুলগণ নিজেরাই বিভিন্ন পেশায় সম্পৃক্ত ছিলেন। তাঁরা মানুষের সামনে কর্মের মর্যাদা ও হালাল উপার্জনের অনুপম দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন। এ প্রসঙ্গে রসুলুল্লাহ (সা.) হজরত দাউদ (আ.) সম্পর্কে বলেন, নিজের হাতে উপার্জিত খাদ্যের চেয়ে উত্তম খাদ্য আর কেউ কখনো খায়নি। আল্লাহর নবী দাউদ (আ.) নিজ হাতে উপার্জন করে খেতেন। এই হাদিসের মাধ্যমে শ্রমের মর্যাদা ও আত্মনির্ভরতার গুরুত্ব সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
রসুলুল্লাহ (সা.) সব ধরনের বৈধ কাজকে সম্মান ও গুরুত্বের চোখে দেখতেন। তাঁর দৃষ্টিতে কোনো বৈধ পেশাই তুচ্ছ নয়। মানুষের কাছে হাত পেতে লাঞ্ছিত হওয়ার চেয়ে নিজে পরিশ্রম করে উপার্জন করা অনেক উত্তম—এ বিষয়টি তিনি বিভিন্ন হাদিসে স্পষ্ট করে বলেছেন। তিনি বলেন, তোমাদের কেউ যদি নিজের পিঠে কাঠের বোঝা বহন করে এনে তা বিক্রি করে এবং এর মাধ্যমে আল্লাহ তাকে ভিক্ষার লাঞ্ছনা থেকে রক্ষা করেন, তবে সেটাই তার জন্য উত্তম—মানুষের কাছে হাত পেতে বেড়ানোর চেয়ে। কারণ হাত পাতলে কেউ দিতে পারে, আবার নাও দিতে পারে।
অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা গড়ে তুলতে রসুলুল্লাহ (সা.) বিভিন্ন প্রকল্প ও উদ্যোগ গ্রহণে মানুষকে উৎসাহিত করেছেন। বর্গা চাষ ও পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তিনি। মদিনায় আগত দরিদ্র মুহাজিরদের সঙ্গে আনসার সাহাবিদের যে ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সহযোগিতা, তা ছিল ইসলামের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, আনসার সাহাবিরা নবীজি (সা.)-এর কাছে এসে প্রস্তাব করেছিলেন যে, তাদের খেজুর বাগান মুহাজিরদের সঙ্গে ভাগ করে দেওয়া হোক। নবীজি (সা.) এতে সম্মতি দেননি। তবে আনসাররা মুহাজিরদের প্রস্তাব দেন—তারা বাগানে কাজ করবেন এবং ফলনের অংশ পাবেন। মুহাজিররা আনন্দের সঙ্গে এ প্রস্তাব গ্রহণ করেন।
দারিদ্র্য দূরীকরণে রসুলুল্লাহ (সা.)-এর বাস্তবমুখী শিক্ষার একটি চমৎকার ও শিক্ষণীয় ঘটনা ইতিহাসে সংরক্ষিত আছে। হজরত আনাস (রা.) বর্ণনা করেন, এক ব্যক্তি নবীজি (সা.)-এর কাছে এসে ভিক্ষা চাইলে তিনি তাকে জিজ্ঞাসা করেন, তার ঘরে কি কিছু আছে। লোকটি জানায়, একটি গালিচা ও একটি পানির পাত্র ছাড়া আর কিছু নেই। নবীজি (সা.) সেগুলো আনতে বললেন এবং উপস্থিত লোকদের কাছে নিলামে বিক্রি করালেন। দুই দিরহামে বিক্রির পর নবীজি (সা.) সেই টাকা তাকে দিয়ে নির্দেশ দিলেন—এক দিরহাম দিয়ে খাদ্য কিনতে এবং আরেক দিরহাম দিয়ে একটি কুঠারের ফলা কিনতে।
নবীজি (সা.) নিজ হাতে কুঠারে হাতল লাগিয়ে দিয়ে তাকে কাঠ কাটার কাজে নিয়োজিত হতে বললেন এবং পনেরো দিনের আগে ফিরে আসতে নিষেধ করলেন। পনেরো দিন পর লোকটি ফিরে এসে জানায়, সে দশ দিরহাম উপার্জন করেছে। এই অর্থ দিয়ে সে কাপড় ও খাদ্য কিনেছে। তখন নবীজি (সা.) বলেন, ভিক্ষার কারণে কেয়ামতের দিন মুখে লাঞ্ছনার দাগ নিয়ে ওঠার চেয়ে এ জীবনই তোমার জন্য উত্তম।
এরপর তিনি স্পষ্ট করে বলেন, তিন শ্রেণির মানুষ ছাড়া অন্য কারও জন্য ভিক্ষা করা বৈধ নয়—যারা চরম দরিদ্র, যারা ঋণের বোঝায় জর্জরিত এবং যারা রক্তপণের দায়ে আবদ্ধ অথচ পরিশোধে অক্ষম।
এই শিক্ষা থেকে স্পষ্ট হয়, ইসলাম দারিদ্র্য বিমোচনে ভিক্ষানির্ভরতা নয়, বরং আত্মসম্মান, পরিশ্রম ও স্বনির্ভরতার পথকে উৎসাহিত করে।
পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/153331